বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ঈদ আনন্দে খেটে খাওয়া মানুষে শেষ ভরসা মহল্লার দর্জির দোকান

ঈদের প্রস্তুতির জন্য পোশাক তৈরির কারখানাগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের ব্যাপক তৎপরতা, গতকাল রোববার রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার একটি পাঞ্জাবি তৈরি কারখানার দৃশ্য -সংগ্রাম

মুহাম্মদ নূরে আলম : নিজস্ব ডিজাইন ও পছন্দের কাপড়ে পোশাক তৈরি করতে ভালোবাসেন অনেকেই। তাই ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়তে শুরু করেছে দর্জির দোকানে। ঈদ আনন্দে খেটে খাওয়া মানুষে শেষ ভরসা রাজধানী ঢাকার পাড়া মহল্লার দর্জির দোকানগুলো। কারণ দেশে এখনও সামান্তবাদি সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান। কাগজে কলমে আর সরকারের বানানো পরিসংখ্যানে যতই বলা হোক, বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ কিন্তু বাস্তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান ভিন্ন। রাজধানীতে বসবাস করেও একশ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাহিরে ঢাকার অভিজাত এলাকার রঙিন আলোয় চোখ ধাঁধাঁনো সপিংমলে গিয়ে কেনাকাটা করা। তাদের ভরসা সস্তার থান কাপড় ও পড়া মহল্লার দর্জির দোকান গুলো। তারপরেও এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের চোখে মুখে হাসি আর আনন্দের কমতি নেই, মুসলমানদের পবিত্র ঈদ উৎসব বলে কথা। 
ঈদ উপলক্ষে হাজারো দর্জি কারিগর ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। সকাল থেকে দিনে রাতে চলছে সেলাই ও কাপড় কাটিং এর কাজ। তাদের যেন দম ফেলার সময় নেই। দর্জি পাড়ার কারিগররা কেউ কাপড় কাটিং, কেউ সেলাই কেউবা মাপ ও বোতাম এবং কেউ প্যাকেট আয়রন নিয়ে ব্যস্ত। তারপরও কারিগররা হিমশিম খাচ্ছে এজন্য অতিরিক্ত শতাধিক শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে দোকানগুলোতে। দোকানগুলোতে তরুণ-তরুণী শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষের পদচারণায় মুখোরিত হয়ে ওঠেছে। যেন তিল ধরনের ঠাঁই নেই। কারণ কেনা পোশাক থেকে বানানো পোশাক অনেক ভালো। কেউ ব্যস্ত ক্রেতাদের কাছ থেকে কাপড় বুঝে নিয়ে পোশাকের মাপ ও ডিজাইন জানতে। পাশেই কেউ আবার ব্যস্ত ডিজাইন অনুযায়ী কাপড় কাটায়। রমযান মাসের শুরুতেই রাজধানীতে দর্জির দোকান গুলোতে অবসর সময় কাটানোর ফুসরত নেই। এসব দোকানে ব্যস্ততা দেখে বোঝা যায়, বাজারে তৈরি পোশাকের দোকান বাড়লেও কমেনি দর্জির কদর। ক্রেতারাও বলছেন, পছন্দমত কাপড় কিনে মানানসই পোশাক বানাতেই এসব কারিগরের দ্বারস্থ হওয়া । ক্রেতারা জানান, পোশাকের ফিটিংয়ের জন্য এখানে আসা হয়। আমি রেডিমেড পোশাক ক্রয় করলেও আমাকে ফিটিংয়ের জন্য দর্জির কাছে আসা লাগে। যেকোনো ডিজাইন দিলে সেই অনুযায়ী দিতে পারে। এই জন্য আমি সেলাই করা জামা বেশি পড়ি। রেডিমেড পোশাক কম পরি।
দর্জিরা বলছেন, আসলে শবেবরাতের পর থেকেই শুরু হয়েছে ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের আনোগোনা। দিন গড়াতেই তাদের চাপ আরো বাড়বে । ডিজাইনের ওপর নির্ভর করে ৫শ' থেকে ৮ শ' টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে থ্রি-পিসের মজুরি। আর শার্ট ৪০০ টাকা, প্যান্ট ৩০০ টাকা, পাঞ্জাবি ৩০০ থেকে ডিজাইন অনুযায়ী ৫০০ টাকা, পায়জামা ২০০ টাকা, ব্লাউজ ১০০ টাকা, মেক্সি ১০০ টাকা, শর্ট পাঞ্জাবি ৩০০ টাকা, ফোতুয়া ২০০ টাকা, মেয়েদের জামা ৩০০ টাকা, পায়জামা ২০০ টাকা, মেয়েদের ব্লাউজ ২০০ টাকা করে মজুরি নিচ্ছে।
দর্জিরা জানান, ১৩ থেকে ১৫ রোজা পর্যন্ত আমরা অর্ডার নিবো। যেহেতু চাঁদ রাতে আগে পোশাক দিতে হয়। এই জন্য যা দিতে পারবো। সেই অনুযায়ী অর্ডার নিচ্ছি। অন্য আরেক জন জানান, ক্রেতারা আগের মত ক্যাটালগ চাচ্ছে না। বরং তারা নিজেরাই ইন্টারনেট নামিয়ে আমাদেরকে দেখায়, ওই হিসেবে আমরা তৈরি করে দেই।
 ছেলেদের পোশাক তৈরির দোকানগুলোতে মেয়েদের মত ততোটা ভিড় না থাকলেও শার্ট,প্যান্ট ও পাঞ্জাবি তৈরির সংখ্যা অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেড়েছে। গরমের কারণে এবার ব্লেজার, স্যুটের চাহিদা কম। দোকানের কর্মচারীরা জানান, আগের বছরের তুলনায় এ বছরে অনেক কাস্টমার। তবে, এই বছর পাঞ্জাবি এবং শার্ট প্যান্টের চাহিদা বেশি।
 দোকান থেকে কাপড় কাটার পর তা সেলাইয়ের জন্য চলে যায় কারখানায় । চাঁদরাত পর্যন্ত দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করবেন এসব সেলাই শ্রমিকরা। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, বিভিন্ন বিদেশী ব্র্যান্ড ও ভারতীয় হিন্দি সিরিয়ালের নামে এবারও জায়গা দখল করে নিয়েছে ঈদের নতুন পোশাক। কদর বাড়ছে দেশী পোশাকেরও। শবেবরাতের পর থেকেই সরব রাজধানীর দর্জির দোকানগুলো। শুধু পোশাক নয়, কিছুটা বাড়তি আয়ের আশায় নিম্ন আয়ের মানুষগুলোও ছুটছেন নগরীতে।
রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট, বিপণীবিতান, ফ্যাশনহাউস ও শপিংমল ঘুরে দেখা যায়, প্রতিবারের ন্যায় এবারও রোজা আসার আগে থেকেই ঈদ কেনাকাটা শুরু হয়ে গেছে। তাই ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। দোকানে দোকানে নতুন পোশাক সাজাতে ব্যস্ত কর্মীরা। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, নামকরা ব্র্যান্ড কিংবা ভারতীয় হিন্দি সিরিয়ালের নামে এবারও জায়গা দখল করছে ঈদের নতুন পোশাক। কেউ আত্মীয়-স্বজনদের উপহারের জন্য কেনাকাটা করছেন। কেউবা  গ্রামে কিংবা বিদেশে দেশী পোশাক পাঠানোর জন্য আগেভাগে পোশাক কিনছেন। আবার অনেকেই নগরীর বিপণীবিতান বা দোকানগুলোতে ঘুরে বেড়ান- এবার ঈদে নতুন পোশাক বা জামা-কাপড় কী এলো তা দেখতে। বিশেষ করে তরুণী বা ধনিক শ্রেণীর গৃহিনীদের বেলায়ই এ রকম প্রবণতা বেশি দেখা যায় বেশি। কিন্তু এবার অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা আগেভাগেই ঈদ কেনাকাটা সারছেন। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে এবারও কদর বাড়ছে দেশী পোশাকের। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার আমদানি করা পোশাক ও জুতার পরিবর্তে দেশী ব্র্যান্ডের চাহিদা বাড়বে। দেশী ফ্যাশন হাউসগুলোতে ঈদের নতুন পোশাক উঠতে শুরু করেছে।
 রোজার অনেক আগেই রাজধানীর দর্জির দোকানগুলোতে শুরু হয়ে গেছে ঈদের বেচাকেনা। সঠিক মাপে পছন্দের পোশাক বানাতে অনেকেই ভিড় করছেন এসব দোকানে। অন্যদিকে সময়মত কাজ বুঝে দিতে রাতভোর কাজ করছেন কারিগররা। ১৫ রমযানের পর কোন অর্ডার বুকিং নেয়া হবে না বলেও জানান তারা। নিউমার্কেটের ফয়সাল টেক্সটাইলের বিক্রয়কর্মী বলেন, সকাল থেকে ভালই বিক্রি হয়েছে, মূলত দামি পোশাকই বেশি। কারণ টেইলার্স অর্ডার নেয়া বন্ধ করার আগেই সবাই ঈদের পোশাক বানিয়ে নিতে চায়। এছাড়াও ম্যাচিং করে গহনা কেনেন মেয়েরা। সে কারণে বেশ আগে থেকেই তারা কেনাকাটা শুরু করেছেন। একই প্রশ্নের জবাবে স্কুলশিক্ষিকা ফেরদৌসি খাতুন বলেন, রমযানের মাঝামাঝিতে মানুষের এত ভিড় হয় যে পা ফেলার জায়গা থাকে না, তাই একটু তাড়াতাড়িই এসেছি। আবার কিছুদিন পর থেকে টেইলার্সে পোশাক তৈরির অর্ডার নেয়া বন্ধ করে দেবে, তাই তাড়াতাড়ি কিনে ওইগুলো বানিয়ে নিতে চাই।
আসন্ন ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজধানীর দর্জি কারিগররা। ঈদ-উল-ফিতরের নতুন জামা কাপড় তৈরী করতে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন তারা। বর্তমানে তাদের রাতে ঘুম নেই। দিনে রাতে চলছে পোশাক তৈরীর কাজ। ঈদের আগের রাতে তাদের এসব কাপড় সরবরাহ করতে হবে। তাই দর্জির দোকানগুলোতে ভিড়। লিটন টেইলার্স আলামিন এর দোকানে কথা হয় তরুণী প্রিয়ার সাথে। তিনি থ্রী পিস সেলাই করতে এসেছেন বলে জানান।
ওই দোকানে আসা শামছুল জানান, তিনি শার্ট ও প্যান্ট সেলাই করার জন্য এসেছেন। পরে তারা বলেন, দর্জি দোকান থেকে কাপড় সেলাই করলেই সেই কাপড় ফিটিং হয় এবং বানানও ভালো হয়। তাছাড়া রেডিমেট দোকানে একই নকশার অনেক কাপড় থাকে। তাই নিজের ইচ্ছামত বানাতে দর্জির দোকানে দেই। তবে গত বছরের থেকে এবার কাপড় প্রতি সেলাই ১শ থেকে ১৫০ টাকা বেশি। লিটন টেইলার্স এর মালিক আলামিন জানান, গত বছরের চেয়ে এবার অর্ডার ভালোই এসেছে।
অতিরিক্ত কারিগর নিয়োগ করে গ্রাহকের চাহিদা মত কাপড় তৈরী করা হচ্ছে। তারপরও গ্রাহকের চাহিদা মত কাপড় তৈরী করে সরবরাহ করে গ্রাহকের মন জয় করার চেষ্টা করছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ