বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভনের শেষ বিকেল

নূরনবী সোহাগ : ছোট্ট মশা ‘ভন’। জন্মের মাত্র তিনদিনের মাথায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভনের পায়ের একাংশ প্রায় অচল হয়ে যায়। এই বিষয়টাকে কেউ কেউ ভনের বাবা মায়ের পাপ বলে অপবাদ দিলো।  যাইহোক, সকল বাধা বিপত্তির ভেতর থেকে ভন একটু একটু করে বড় হয়ে উঠতে লাগলো। ভন কিন্তু পরিবারে একদম অবহেলিত নয়। ভনকে পরিবারের সকলে খুব রকম ভালবাসে। ভনের অন্য ভাইবোনেরা যখন মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে মানুষের রক্ত চুষে আনে তখন সে রক্তের ভাগ ভন’ও পায়। ভনের বাবা-মা এঁটোজল থেকে কোন খাবারকণা পেলে তা চুপিপচুপি এনে ভনকে মুখে তুলে খাওয়ায়। এত এত আনন্দ আর ভালোবাসার মাঝেও যেন ভনের মনের মধ্য কোথাও একটু কষ্ট লুকিয়ে থাকে। যে কষ্টটা তাকে ভেতর ভেতর কুড়িয়ে কুড়িয়ে খায়। কষ্টটা হল তাকে সারাদিন ঘরের ভেতর বন্দি থাকতে হয়। বিকেল হলেই ভনের ভাইবোনেরা দল বেঁধে পাশের নর্দমায় বৌ-ছি খেলতে যায় কিন্তু ভন সেটা পারে না। ভন ঠিকঠাক মত উড়তে পারে না বলে তাঁর ঘর থেকেই বের হওয়া বারণ। ভনের মন পড়ে থাকে নর্দমার ভেতর বৌ-ছি খেলার মাঠে। সন্ধ্যার পরে ভন যখন ভাইবোনদের মুখে খেলার মজার অংশ নিয়ে হাসাহাসি শুনে তখন ভনের খুব মন খারাপ হয়। একদিন ভন সাহস করে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে বলল সেও নর্দমায় বৌ-ছি খেলতে যেতে চায়! ভনের বাবা-মা তাতে আপত্তি করলো। কিন্তু ভন নাছোড়বান্দা। আকুতি মিনতির মুখে ভনের বাবা-মা আর অমত করতে পারলো না। নর্দমায় গিয়ে বৌ-ছি খেলার অনুমতি পেল ভন। সেকি আনন্দের ব্যাপার। আনন্দে ভন যেন রাতে ঘুমুতেই পারলো না। পরদিন বিকেলবেলা ভন, ভাইবোনদের সাথে রওনা হল বৌ-ছি খেলার মাঠে। কতটা পথ নিজের চেষ্টায় উড়ে, কতটা পথ ভাইবোনদের পিঠে চড়ে পৌঁছল নর্দমায়। ভন তো থ। এখানে যেন মশার মেলা বসেছে। নানান বয়সী মশা। কেউ এঁটোপচা খাবারের স্তূপ থেকে খাবার খাচ্ছে। কেউ ড্রেনের পানিতে ভেলার মত ভেসে যাচ্ছে অন্যকোথাও। আবার কেউ বৌ-ছি খেলছে তুমুল হৈচৈ করে। ভন আগ্রহ নিয়ে এসবই দেখছিল। এমন সময় একটা বিকট আওয়াজে যেন কানে তালি লেগে গেল ভনের। ধীরে ধীরে আওয়াজটা যেন এদিকেই এগিয়ে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাই দিক্বিদিক ছুটোছুটি করা শুরু করে দিল। এমন সময় শব্দের উৎপত্তিস্থল চোখে পড়ল ভনের। প্রচ- হুড়োহুড়ির মধ্য ভন নির্বাক তাকিয়ে আছে সেদিকে। মস্তবড় একটা মানুষের কাঁধে মস্তবড় একটা কামান। সে কামানটা ভোঁ ভোঁ শব্দ করে অনবরত ধোঁয়ার কু-লী ছাড়ছে। কতগুলো মশা জ্ঞান হারিয়ে পরে যাচ্ছে যত্রতত্র। ভনকে কিছু একটা করতে হবে ভাবতে ভাবতে ভন লাফ দিলো ড্রেনের ভেতর। প্রাণপণ চেষ্টায় একটা দেয়ালের ওপাশে গিয়ে নিজেকে কোনমতে আড়াল করে নিলো। ক্রমশ আওয়াজটা সরে গেল দূরে।ভন জ্ঞান হারায়নি। ভন গুনগুন শব্দ করে নিজেকে পরীক্ষা করে দেখল। ভন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে আসলো বাহিরে। চারদিকে শোকের আর্তনাদ। কতগুলো মৃত মশা পড়ে আছে। মৃত মশাদের ঘিরে আহতরা বিলাপ করছে করুণ সুরে। ভন যেন অন্যকোন পৃথিবীর দৃশ্য দেখছে নিজের চোখে কিংবা কোন  দুঃস্বপ্নে কেটে যাচ্ছে তাঁর পুরোটা বিকেল। ভনের শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। এক পা’ও আর সামনে এগোতে পারছে না ভন। ভনের ভাইবোনের কোন চিহ্ন নেই এখানে। ভন ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ল নর্দমার পাশে। অসংখ্য মৃত মশাদের সাথে সেও যেন সামিল হবে কিছুক্ষণের মধ্য। কারো কিছুই করার নেই। বিষাক্ত গ্যাসে সবাই মরণাপন্ন। ভনের চোখের সামনে যেন একদল মশা বৌ-ছি খেলছে, যে দলে তাঁর ভাইবোনেরাও আছে। তুমুল চিৎকার চেঁচামেচি করে সেও উৎসুক চোখে দেখছে সে খেলা।ভন মরে যাচ্ছে। ব্যথাতুর বুকে ভন আকাশের দিকে তাকায় পৃথিবী এত নিষ্ঠুর কেন তাঁর জানতে ইচ্ছে করে। ভনের চোখের সামনে বারবার ভেসে ওঠে আনন্দ ও ভালোবাসা মিশ্রিত তাঁর পরিবারের দৃশ্য, শৈশবের স্মৃতি। যেখানে ফুলের টবে নিমজ্জিত জলটুকুতে ভেসে ভেসে পরিবারের সাথে কাটিয়েছে প্রত্যেকটা দিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ