বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি বিদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে দেশে ফেরা নারীরা

ইবরাহীম খলিল : ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন হবিগঞ্জের সালমা। মাত্র ১৫ দিনেই ভেঙে যায় তার সুখস্বপ্ন। গৃহকর্তার নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে চলে এসেছেন দেশে। কিন্তু দেশে এসে আরেক বিরূপ অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় এই নারীকে। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছে আগেই, সন্তানদেরও কাছে পাচ্ছেন না জায়গা। নিজের জন্মদাতাও তাকে ফিরিয়ে নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অনিশ্চয়তায় তাই সালমার দিন কাটছে নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে। নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে সালমা বলেন, খানা দেয় না, মারপিট করে। চামুক (চামচ) আছে না? চামুক দিয়ে মারে। অনেক ধরনের কথা বলত। খারাপ কথাও বলত। আমি ওর খতা (কথা) শুনি নাই দেইখ্যা আমারে মারছে। বাঙালিদের বলছি, আমি দেশে যাইয়াম। কয় দেশে যাওয়ার দরহার (দরকার) নাই, অ্যাম্বাসিতে লও বাদে আমরাও যায়াম অ্যাম্বাসিতে। অনেক ধরনের মেয়েরা আছে অ্যাম্বাসিতে। অনেকে দেখছি কেউর পাউ বাঙ্গা (পা ভাঙা), কেউর আত বাঙ্গ (হাত ভাঙ্গা), অনেক মেয়েরে ইস্তারি (ইস্ত্রি) লাগায়া দেয় শইল্য (শরীরে)।
শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, সৌদি আরব থেকেই সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিক ফেরত আসছে গত কয়েক মাসে। এই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। ফেরত আসা নারীদের অনেকেই জানিয়েছেন, গৃহশ্রমিক হিসেবে যাওয়ার পর অনেকেই গৃহকর্তা ও পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া কাজ না পারার অজুহাতে অনেক নারী শ্রমিককে চুক্তি মোতাবেক বেতন দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজের কোনও কর্মঘণ্টা না মানার পাশাপাশি বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেওয়া, অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। এমনকি যেসব এজেন্সির মাধ্যমে তারা বিদেশ যান তাদের বিদেশের অফিসে নিয়ে এসেও তাদের নির্যাতন করার ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশী অভিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরীফুল হাসান। তিনি জানান, দেশে ফেরত গৃহকর্মীদের তাদের পরিবারের কাছে তুলে দিতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন অনেক বার। নির্যাতনের শিকার নারীদের পরিবার ফেরত নিতে না চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, পরিবারগুলোর সাথে কথা বলে দেখেছি, আমাদের সোসাইটি মনে করে সৌদি আরব থেকে কিংবা মধ্যপ্রাচ্য থেকে একটা মেয়ে টর্চারড হয়ে এসেছে, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছে, এক অর্থে তারা মনে করে অচ্ছুত, খারাপ। সমস্ত দায়টা যেন মেয়ের। সমাজ তাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে না।
শরিফুল হাসান বলেন, প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে মেয়েটা ফেরত আসছে তাকে নিতে প্রস্তুত থাকে না তার বাবা, স্বামী বা পরিবারের লোকজন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা বুঝিয়ে পরিবারকে রাজি করালেও মেয়েটা একঘরে হয়ে থাকে। এই সংখ্যাটা আমাদের ক্ষেত্রে শতভাগ মেয়েই কোনো না কোনোভাবে সঙ্কটে পড়ছে।
একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গড়ে দু’শ’ মেয়ে প্রতি মাসে ফেরত আসছে। অন্ততপক্ষে ৭/৮ শ’ মেয়ে গত চার মাসে ফেরত এসেছে। ব্র্যাক গত কয়েক মাসে ১১৮ জন মেয়েকে দেশে ফেরত আনতে দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। তাদের মধ্যে ৮০ জনকে ব্র্যাক ফেরত আনতে পেরেছে। এর বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে আসে এই সংখ্যাটা একদম কম হবে না। গত দুই বছরে অন্তত হাজারখানেক মেয়ে ফিরে এসেছে, যাদের অধিকাংশই যৌন নির্যাতন বা অন্যান্য নির্যাতনের শিকার।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি নারী শ্রমিক যায়। আবার নানা কারণে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে সেখান থেকেই সবচেয়ে বেশি নারী ফেরত আসে। তবে কোনও সংস্থা কিংবা মন্ত্রণালয়, কারও কাছে এই ফেরত আসা শ্রমিকের বিষয়ে সঠিক কোনও তথ্য নেই।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, লেবাননসহ বিশ্বের ১৮টি দেশে জনশক্তি রফতানি করা হয়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, যা মোট অভিবাসীর সংখ্যার ১৩ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বেশি নারী বিদেশে যাওয়ার রেকর্ড।
১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিকদের একা বিদেশে যেতে দেওয়া হতো না। ২০০৩ ও ২০০৬ সালে সেই নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকদের অভিবাসন হার বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে। ২০১৬ সালে অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা নেমে আসে ১৬ শতাংশে এবং ২০১৭ সালে হয় ১২ শতাংশ।
২০১১ সালের এপ্রিলে সৌদি ন্যাশনাল রিক্রুটমেন্ট কমিটি বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মী নিতে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। তবে সৌদি আরবে কর্মরত ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার ১৫০ জন গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকারে ‘শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনা উঠে আসে ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে। ফলে সমঝোতা স্মারক সই হলেও কোনো নারী কর্মী সৌদি আরবে যাননি। এরপর গৃহকর্মী নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৫ সালে চুক্তি করে সৌদি আরব। সেই চুক্তিতে নারী গৃহকর্মীর ওপর জোর দিয়ে একজন নারীর বিপরীতে ২/৩ জন পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় দেশটি। এরপরই শুরু হয় নারী গৃহকর্মী পাঠানো। গত বছর ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন নারী কর্মী পাঠানো হয়। এ বছর এপ্রিল পর্যন্ত পাঠানো হয় প্রায় ৩০ হাজার নারী। সব মিলিয়ে গত চার বছরে প্রায় পৌনে দুই লাখ নারী গৃহকর্মী পাঠানো হয় মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল মুসলিম দেশ সৌদি আরবে।
এদিকে সৌদি ফেরত নারীরা নির্যাতনের কথা বললেও তা নাকচ করে আসছেন বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা। অভিযোগ ওঠার পর সৌদি আরব ঘুরে এসে সংসদীয় একটি কমিটির সদস্যরা বলেছেন, ভাষা না জানা, খাবার ভালো না লাগা এবং ঘরের প্রতি অতি টানের কারণে বাংলাদেশী গৃহকর্মীরা দেশে ফিরতে চান।
শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০১৭ সালে তারা ১৭ জন নারী শ্রমিককে ফেরত এনেছেন। এসব নারীর সবাই প্রবাসে বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ