সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস বর্জন প্রশ্নে যুক্তরাজ্যের দ্বিমুখিতা?

২২ মে, মিডল ইস্ট আই : জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নিন্দা জানানো হলেও তা পুরোপুরি বর্জন করা হচ্ছে না। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে নতুন ওই দূতাবাসটিতে আয়োজিত বৈঠকে অংশ নেবেন। নতুন মার্কিন দূতাবাসটি বর্জন করতে ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনিয়ান পলিসি কাউন্সিলের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী আলিস্তাইর বুর্ত এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ ব্যাপারে জানাশোনা রয়েছে এমন এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খবরটি জানিয়েছে। ব্রিটিশ প্যালেস্টিনিয়ান পলিসি কাউন্সিলের সহ সভাপতি কামেল হাওয়াশ আলিস্তাইরের সঙ্গে বৈঠকের খবর নিশ্চিত করেছেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দফতরও এখন বলছে, ব্রিটিশ কূটনীতিক ও অন্য প্রতিনিধিরা ওই মার্কিন দূতাবাসের বৈঠকগুলোতে যাবেন। যুক্তরাজ্যের এমন সিদ্ধান্তকে দ্বিমুখী আচরণ হিসেবে দেখছে ফিলিস্তিনীদের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার থাকা সংগঠনগুলো।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল হয়ে যাওয়া পূর্ব জেরুসালেমকে নিজেদের দেশের রাজধানী করতে চায় ফিলিস্তিনীরা।  কিন্তু ইসরায়েল পুরো জেরুসালেমকেই তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী  হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নেওয়ারও ঘোষণা দেন তিনি। ফিলিস্তিনীদের ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেই ১৪ মে জেরুসালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনায় নতুন করে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।  

১৪ মে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের একটা বিশাল অংশ জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বর্জন করেছিল। কিন্তু তার তিন দিন পর ব্রিটিশ প্যালেস্টিনিয়ান পলিসি কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী আলিস্তাইর বুর্ত। ওই বৈঠকে উপস্থিতি থাকা এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে মিডল ইস্ট আই জানায়, সংগঠনটির পক্ষ থেকে আলিস্তাইরকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, যেন যুক্তরাজ্য জেরুসালেমে স্থাপনকৃত মার্কিন দূতাবাসটি ধারাবাহিকভাবে বর্জন করে। নতুন ওই দূতাবাসে যুক্তরাজ্য যেন কোনও কার্যক্রম না চালায়।ওই সূত্র বলেন, ‘আমরা যখন তাকে (আলিস্তাইর)নিশ্চিত করতে বললাম যে যুক্তরাজ্য যখন দূতাবাসটিকে স্বীকৃতি দেয়নি তখন সামনে ওই দূতাবাসে আয়োজিত কোনও বৈঠকেও যোগ না দেয়। তিনি স্পষ্ট করেই বোঝালেন, তারা অংশ নেবেন।’ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে, এ পদক্ষেপের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের অসম্মতি বজায় আছে এবং কূটনীতিক ও অন্য প্রতিনিধিরা ভবিষ্যতে ওই মার্কিন দূতাবাসে আয়োজিত বৈঠকে যোগ দেবেন।ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করার প্রস্তাবে শুক্রবার (১৮ মে) জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিরত ছিল যুক্তরাজ্য। আর এর পরই জেরুসালেমে স্থানান্তরকৃত নতুন মার্কিন দূতাবাসে আয়োজিত বৈঠকে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের খবরটি সামনে এসেছে। ফিলিস্তিনীদের সদ্য সমাপ্ত ভূমি দিবসের ৬ সপ্তাহের গ্রেট রিটার্ন মার্চ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে শতাধিক ফিলিস্তিনী। আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। শুধু ১৪ মে’র বিক্ষোভেই ৬০ ফিলিস্তিনী নিহত ও দুই হাজারেরও বেশি আহত হন। এই দিনের হত্যাযজ্ঞের তদন্তের জন্যই কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন। গত ১৮ মে মানবাধিকার কমিশনে গাজায় তদন্ত দল পাঠানোর এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। ভোটে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া। তবে কাউন্সিলের ৪৭ সদস্যের মধ্যে ২৯ সদস্যই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। যুক্তরাজ্য,জার্মানি ও জাপানসহ ১৪টি দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে।গত ডিসেম্বরে ইসরায়েলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জেরুসালেম প্রশ্নে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার এবং দীর্ঘস্থায়ী। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনীদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এটি ঠিক করা প্রয়োজন। জেরুসালেমকে হতে হবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের অংশীদারত্বভিত্তিক রাজধানী।’ তবে এখন মার্কিন দূতাবাস বর্জনের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে হতাশ ফিলিস্তিনীদের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকা সংগঠনগুলো। একে যুক্তরাজ্যের দ্বিমুখিতা মনে করছে তারা।ব্রিটিশ প্যালেস্টিনিয়ান পলিসি কাউন্সিলের সহ সভাপতি কামেল হাওয়াশ মিডল ইস্ট আইকে জানান, জেরুসালেমে স্থানান্তরকৃত মার্কিন দূতাবাসের বৈঠকে যুক্তরাজ্যের অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি ‘হতবাক এবং মর্মাহত’ হয়েছেন। কামেল হাওয়াশ বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যের দ্বিচারিতা প্রকাশ পাচ্ছে। তারা কথা বলার সময় নীতিগত পথ অবলম্বন করছে ঠিকই কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তা আর কাজ করছে না।’  প্যালেস্টিনিয়ান সলিডারিটি ক্যাম্পেইনের পরিচালক বেন জামালও মনে করছেন, যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে এ পরিস্থিতি অন্য সময়ের মতোই স্বাভাবিক ঘটনা। আর যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের বৈঠকে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে তাকে স্বাভাবিক করারই চেষ্টা মাত্র।’যুক্তরাজ সরকারের এমন আচরণে বিস্মিত নন কাউন্সিল ফর আরব-ব্রিটিশ আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর পরিচালক ক্রিস ডোয়েল। তিনি বলেন, ‘ব্রিটেন যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দূতাবাস একেবারে বর্জন করবে না তা অবধারিত ছিল।’এক কূটনৈতিক সূত্র জানান, ‘খুব স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আওতায় বৈঠকগুলো অন্যান্য জায়গার পাশাপাশি দূতাবাসগুলোতে হয়ে থাকে। স্বাভাবিক কূটনৈতিক মাধ্যমে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাব।’জতিসংঘের সাবেক ব্রিটিশ দূত স্যার জেরেমি গ্রিনস্টক বলেন, যুক্তরাজ্য কখনওই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে না। নতুন দূতাবাসে বৈঠক মোটামুটি দ্রুতই হওয়ার কথা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ