বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রমযানে অপরিকল্পিত জাকাত বিতরণ বাড়ছে জীবনহানির ঝুঁকি

ইবরাহীম খলিল : পবিত্র রমযান মাস এলে বেশি সওয়াব পাওয়ার আশায় জাকাত দিয়ে থাকেন অনেকেই। কিন্তু অপরিকল্পিতবাবে যাকাত বিতরণে বেড়ে যাচ্ছে মানুষের জীবন হানির ঝুঁকি। গত ১৪ মে ট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি ইস্পাত কারখানার পক্ষ থেকে ইফতারসামগ্রী বিতরণের সময় হুড়োহুড়ি শুরু হলে পদপিষ্ট হয়ে ৯ জন নিহত হন। নিহত সবাই নারী ও শিশু। এ ঘটনায় আহত হয় অর্ধশতাধিক। এর আগেও নানা সময় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভিড়ের সময় ঈদের আগে বিতরণ করা কাপড় বা অন্য সামগ্রী আনতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হয় মানুষ। এদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।
১৯৮০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত জাকাত বা অন্য নামে বিতরণ করা কাপড় বা নানা সামগ্রী নিতে গিয়ে অন্তত ১৭০ জনের মৃত্যু তথ্য পাওয়া গেছে। এর সবগুলো ঘটনাই হয়েছে রোজার মাসে ঈদের আগে আগে। আর জাকাতের নামে বিতরণ করা শাড়ি লুঙ্গি বা অন্য কাপড় আনতে গিয়েই ঘটেছে বেশিরভাগ প্রাণহানি। ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন এভাবে কাপড় বিতরণ ইসলাম সমর্থন করে না।
তারা বলছেন, প্রায় সময় ঈদের আগে আগে সহায়তা নিতে গিয়ে প্রাণহানির খবর আসে গণমাধ্যমে। তবে এবার রোজা শুরুর আগেই চট্টগ্রামে কবির স্টিল মিলস লিমিটেডের উদ্যোগ ইফতার সামগ্রী বিতরণের সময় ঘটেছে প্রাণহানি। গত ১৪ মে এই ঘটনায় পদদলিত হয়ে নিহত হয়েছেন নয়জন নারী। আহত হয় অর্ধ শতাধিক। এর আগেও নানা সময় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভিড়ের সময় ঈদের আগে বিতরণ করা কাপড় বা অন্য সামগ্রী আনতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়িতে নিহত হয় মানুষ। এদের বেশিরভাগই আবার নারী ও শিশু।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন ধর্ম বিশারদ জানিয়েছেন, জাকাত বা ঈদের সহায়তার নামে এভাবে কাপড় বা অন্য কিছু বিতরণ ইসলাম সম্মত নয়। এভাবে লোকদের ডেকে এনে সহায়তা দেয়ার পেছনে নাম প্রচারের আকাঙ্খা থাকে বলে মনে করেন তিনি। 
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, পদদলিত হয়ে এসব মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে সাজা পেতে হয়নি। এবার নির্বাচনের বছর বলে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে ঈদে সহায়তা বিতরণের প্রবণতা বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। আর চট্টগ্রাম ট্র্যাজেডির কথা মাথায় রেখে বিতরণকারী এবং প্রশাসনকে আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণমুক্ত সাড়ে ৫৩ তোলা রূপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা তার সমমূল্যের ব্যবসায়ী সম্পদ বা টাকা পয়সা থাকলে তার ওপর জাকাত ফরজ। এর বেশি যত সম্পদ থাকবে তার আড়াই শতাংশ জাকাত হিসেবে বিতরণ করতে হয়।
রোজায় বিতরণ করলে সওয়াব বেশি হয়, এমন বিশ্বাস থেকে ঈদের আগেই জাকাত বিতরণের প্রবণতা আছে। আবার এই জাকাত বিতরণ করতে গিয়েই আবার ঘটেছে প্রাণহানি। ১৯৮০ সালে ঢাকার জুরাইনে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়। তিন বছর পর ১৯৮৩ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জাকাতের টাকা নিতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পড়ে মারা যায় তিন শিশু। ১৯৮৭ সালের ২৩ মে ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায় সরকারিভাবে জাকাত দেয়ার সময় ব্যাপক লোক সমাগম হয়। সেখানে জনগণ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে চার জন মারা যায়। ১৯৮৯ সালের ৫ মে চাঁদপুরে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত মারা যায় ১৪ জন। এসময় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়।
১৯৯০ সালের ২৬ এপ্রিল পাহাড়তলীর আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরিতে জাকাত নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ৩৫ জন নিহত হয়। এসময় আহত হয় দুই শতাধিক। ১৯৯১ সালে ১৩ এপ্রিল ঢাকা নবাবপুর রোডে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে মারা যান দুইজন। ২০০৫ সালে গাইবান্ধা নাহিদ ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানে জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে নিহত হন ৩৭ জন। ২০০৫ সালের অক্টোবর চট্টগ্রামে কেএসআরএম মালিকের বাড়িতেই জাকাত নিতে এসে মৃত্যু হয় আট জনের। ২০১৪ সালের ২৫ জুলাই মানিকগঞ্জে সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ হাসান রুনুর বাসায় তিন জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পরের দিন ২৫ জুলাই বরিশাল খান অ্যান্ড সন্স গ্রুপের মালিকের বাসভবনে জাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে ২২ জনের মৃত্যু হয়। একই দিন বরিশালের কাঠপট্টি এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে জাকাত দেয়ার সময় পদদলিত হয়ে দুই নারীর মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালের ১০ জুলাই ময়মনসিংহে নূরানি জর্দা ফ্যাক্টরিতে জাকাতের কাপড় বিতরণের সময় পদদলিত হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুহাদ্দিস মাওলানা ওয়ালিউর রহমান খান আজহারী বলেন, জাকাতের নামে এভাবে কাপড় বিতরণ কোনোভাবেই ধর্ম অনুমোদন করে না। ইসলামে দুই ভাবে জাকাত প্রদানের কথা বলা হয়েছে। একটি রাষ্ট্র ধনীদের কাছ থেকে জাকাত সামগ্রী সংগ্রহ করে তা বিতরণ করবে। আর দ্বিতীয়টি, ব্যক্তি উদ্যোগে বিতরণ। এ ক্ষেত্রে এমনভাবে জাকাত দিতে হবে যেন একজন মানুষ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তার অভাব অনটন যেন দূর হয়। কিন্তু একটি কাপড় বা লুঙ্গি শতশত মানুষকে দেওয়া সেটা নাম কোড়ানো মাত্র। তাছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। আর সেই জাকাত কতটা বস্তুনিষ্ঠ হবে সেটা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।’
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, জাকাত যেন একটা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দেওয়া হয় এবং পুলিশকে অবহিত করা হয়। আর এটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যিনি জাকাত দিচ্ছেন। তাহলে বিশৃঙ্খল হবার ব্যাপারটা কম থাকে। জাকাত পেতে গিয়ে যেন সহায়তা প্রার্থীরা ধাক্কাধাক্কি না করে এবং মানবিক দিক থেকে তাদের অপমান না করা হয়। তাই যারা জাকাত পাবেন তাদের মানবিক দিকটা খেয়াল রেখে যাকাত দিতে হবে। এছাড়া সরকারের জাকাত বোর্ডের মাধ্যমেও জাকাত দিতে পারেন। তাহলে এসব অঘটন থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ