শনিবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

মালয়েশিয়ার দেনার পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য নাজিব সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার দায়ী

২১ মে, রয়টার্স : মালয়েশিয়ার সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ জানিয়েছেন, দেশটির দেনার পরিমাণ ১ লাখ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়ে গেছে, যা ২৫০ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। মাহাথির ওই পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ঋণের জন্য পরাজিত নাজিব রাজাক সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারকে দায়ী করেছেন। সোমবার মাহাথিরের দেওয়া তথ্যের কথা জানিয়ে বার্তা সংস্থা জানায় বিগত সরকারের প্রধান নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত চলমান। রাষ্ট্রীয় দেনার পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ করলেও মাহাথির ভর্তুকি দেওয়া ও জিএসটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নিজের কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির বলেছেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি রিঙ্গিত ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের আগে কখনও এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়নি। এর আগে ঋণের সীমা কখনও ৩০ হাজার রিঙ্গিত ছাড়ায়নি।’

ঋণের কথা স্বীকার করলেও নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী মাহাথির বিশাল সংখ্যক পণ্যের ওপর থেকে ‘গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স’ (জিএসটি) বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী জুন থেকে অনেকগুলো পণ্য ও সেবার জিএসটি শূন্য করে দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি মাহাথির জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। বার্তাসংস্থা জানায়, নিজের নির্বাচনী জোট ছাড়াও নাগরিকদের মধ্য থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির যে অভিযোগ রয়েছে তার সমাধানে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে মাহাথিরকে।

২২ বছর মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব দেওয়া মাহাথির মোহাম্মদ দেশের ঋণ নিয়ে বিগত সরকারকে দায়ী করলেও, তার বর্তমান অর্থনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে সতর্ক মত দিয়েছে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি’স। তারা মনে করে উপযুক্ত নীতির সঙ্গে সমন্বয় না করলে বরং মাহাথিরের সিদ্ধান্ত রাজস্ব ঘাটতি বাড়াবে। বিগত নাজিব রাজাকের সরকার জিএসটি থেকে ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৩৮০ কোটি রিঙ্গিত (১ হাজার ১০৫ কোটি ডলার) আয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা মোট রাজস্বের ১৮ শতাংশ। মাহাথির সেটা বাতিল করে দিয়েছেন। আবার জীবন যাপনের ব্যয়বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে তেলের ওপর যে ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি তাতেও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চাপ বাড়বে সরকারের ওপর। গত সপ্তাহেই মাহাথির মন্তব্য করেছিলেন, দেশের অর্থনীতির বিষয়ে দেওয়া বহু তথ্যই খুব সম্ভব অসত্য। উল্লেখ্য, নাজিব ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই সরকারের ঋণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তখন নাজিব জানিয়েছিলেন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ঋণের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৫০.৯ শতাংশ, যা সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চসীমা ৫৫ শতাংশের চেয়ে কম। জিএসটি বাতিল করে দিলেও তার স্থানে ‘সেলস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স’ (এসএসটি) পুনর্বহাল করার কথা মাহাথির সরকারের। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইটস টাইমস প্রধানমন্ত্রীর কার্যালায়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মাহাথিরের দেওয়া ভাষণ উদ্ধৃত করেছে, ‘আমরা আত্মবিশ্বাসী, আমরা এই বিপর্যয় মোকাবিলা করতে পারব। কিন্তু সেজন্য দরকার দক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য সরকারি কর্মকর্তা। প্রশাসক হিসেবে আইনের শাসনকে সবার আগে স্থান দিতে হবে এবং যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের অবশ্যই কর্তব্য পালন করতে হবে যাতে মালয়েশিয়া এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে পারে। দেশের সবাই এক সঙ্গে কাজ করলে মালয়েশিয়ার মুক্তি পাওয়া ও আবার সমীহের সঙ্গে গণ্য হওয়ার জন্য খুব বেশি দিন লাগবে না।’

এদিকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহথির মোহাম্মদ খুব শীঘ্রই ১০০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। এজন্যে তিনি ৫ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দিয়েছেন। এদের প্রায় সবাই মাহথিরের সঙ্গে দুই দশক ধরে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এরাই মালয়েশিয়ার আগামী দিনের অর্থনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ, বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শলাপরামর্শ করে সার্বিক নীতিমালা প্রণয়ন করবেন। মাহথির যতক্ষণ না নতুন অর্থমন্ত্রীর নিয়োগ দিচ্ছেন তার অভাব পূরণ করবেন এরা। এরাই মাহথিরের উপদেষ্টা দল।

এদের মধ্যে রয়েছেন, দেশটির সাবেক অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর, কোটিপতি ব্যবসায়ী, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সরকারি তেল কোম্পানির সাবেক নির্বাহী। তারা ইতিমধ্যে সেলস ট্যাক্স আরোপ, জালানি ভতুর্কি চালু, বড় ধরনের সরকারি প্রকল্প পর্যালোচনা ও বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন। এদের একজন হচ্ছেন দাইম জাইনউদ্দিন (৮০) যিনি ব্রিটেন থেকে আইন বিষয়ে লেখাপড়ার পর রিয়েল এস্টেট ও ব্যাংকিং ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালে এশিয়ায় যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয় তা থেকে তিনি তার দেশকে রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ব্যাংকগুলোর সুদের হার হ্রাস, রাস্তাঘাট ও শিক্ষায় বিনিয়োগ করে বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করেন তিনি।

দ্বিতীয় জন হচ্ছে জেইতি আখতার আজিজ (৭০)। একমাত্র ও মালয়েশিয়ার প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর হিসেবে ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতির ওপর ডক্টরেট করেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের শক্তিশালী উদ্যোগে তার ভূমিকা অপরিসীম। ১৯৯৮ সালে তিনিই ঘোষণা দেন পুঁজি নিয়ন্ত্রণের।

তৃতীয় জন হচ্ছেন হাসান ম্যারিকান (৬৫)। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ার জাতীয় জালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোলিয়াম ন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। যার হাতে গড়ে ওঠে পেট্রোনাস যা বিদেশে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। জালানি খাতে তার রয়েছে তিন দশকের কাজের অভিজ্ঞতা। আর এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। টেমাসেক ইন্টারন্যাশনাল এ্যাডভাইসরসের সিনিয়র উপদেষ্টা তিনি।

চতুর্থ জন হচ্ছেন, জোমো কাওয়াম সুন্দরাম (৬৫)। এই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ একসময় জাতিসংঘের মহাসচিবের উন্নয়ন সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ইয়েল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা শেষ করার পর মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর তার বিখ্যাত বই ‘এম ওয়ে: মাহথির’স ইকোনোমি পলিসি লিগ্যাসি’ লেখেন। মালয়েশিয়ায় চীনের বিনিয়োগের ব্যাপারে আগেভাগেই সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, পরাশক্তি একটি দেশকে কখনো উন্নয়নের জন্যে ‘ব্লাঙ্ক চেক’ দেওয়া যায় না।

পঞ্চম জন হচ্ছেন, রবার্ট কুক (৯৪)। বাণিজ্য সম্প্রসারণে যিনি অকাতরে বিনিয়োগ করার জন্যে ‘সুগার কিং’ হিসেবে পরিচিত। হংকং ও সিঙ্গাপুরেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন কুক। বেইজিং-এ সর্বোচ্চ উঁচু ভবনের মালিক ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় পামওয়েল ব্যবসায়ী তিনি। চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখেন কুক। চীনের সঙ্গে মালয়েশিয়ার ৩৪ বিলিয়ন ডলারের গ্যাস পাইপ লাইন ও ১৭ বিলিয়ন ডলারের ইস্ট কোস্ট রেইল লিংক প্রকল্পের অন্যতম রুপকার তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ