মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বিদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরছে বিপুল সংখ্যক নারী

ইবরাহীম খলিল : রঙিন স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যান অনেক নারী। কিন্তু সেখানে গিয়ে নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়ে কিংবা নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে শূন্য হাতে ফিরে আসেন দেশে। বিদেশ থেকে ফিরে আসা অধিকাংশ নারীই শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের কথা বলেন। অথচ নারী কর্মী বিদেশে পাঠানোর সময় নানারকম আশ্বাস দেয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। পরে আর তারা এর দায় নিতে রাজি হন না। বিশেষ করে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারী না থাকায় অনেক এজেন্সির মালিকরা নারী পাচার করে তাদের বিক্রি করে দেন বিভিন্ন দেশে। সেখানে যাওয়ার নারীরা আসল বাস্তবতাটা কি তা অক্ষরে অক্ষরে বোঝেন।
শারীরিক নির্যাতনসহ নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়ে মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে গত কয়েক দিনে দেশে ফিরেছেন অর্ধ শতাধিক নারী। শনিবার একই ফ্লাইটে আসেন আরও ৬৫ জন। এরা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে নারী গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে নিজের আর পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
প্রবাসী শ্রমিক ও নারী অধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, ২০১৫ সালে শ্রমিক পাঠানোর জন্য যে চুক্তি হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়া এবং সরকারের দিক থেকে সতর্কতা অবলম্বন না করায় বিপুল সংখ্যক নারী ভাগ্য ফেরাতে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে শূন্যহাতে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। আর দেশে ফেরা নারীরা বলছেন, এখনও শত শত নারী দেশে ফেরার পথ খুঁজছেন।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বিএমইটির দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন; যা মোট অভিবাসনের ১৩ শতাংশ। ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত একা অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিকদের অভিবাসনে বাধা দেওয়া হলেও পরে ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে তা কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকের অভিবাসন হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে। কিন্তু ২০১৬ সালে অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা নেমে আসে ১৬ শতাংশে এবং ২০১৭ সালে ১৩ শতাংশে। এর বাইরে কত নারী কী উপায়ে বিদেশ গেছেন সে পরিসংখ্যান নেই। প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকা এবং এজেন্টদের ওপর মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকার কারণে বিদেশে ঘটছে দুর্ঘটনা, মেয়েদের জীবন পড়ছে শঙ্কায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে কেবল সৌদি আরব থেকেই গত ৩ বছরে ফিরেছেন চার হাজারের বেশি নারী শ্রমিক। তারা বলছেন, সম্মানজনক কাজ দেওয়ার কথা বলে দেশটিতে নিয়ে গেলেও যাওয়ার পর থেকে তাদের আটকে রেখে মারধর ও যৌন নির্যাতন করা হয়। অকথ্য নির্যাতনে অনেকের হাত-পা ভেঙে গেছে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব বলছেন, যারা ফিরছে তাদের পক্ষ থেকে করা শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ সবক্ষেত্রে সত্য নয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, প্রতিদিনই মেয়েরা ফিরে আসছে। একটু ভালো ভবিষ্যতের জন্য যারা নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে বিদেশ যায়, তারা এমনিতেই ফিরে আসবে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ফেরার কারণ হিসেবে তারা যেমনটা বলছেন, তাদের শরীরে তেমনই ক্ষত আমরা দেখতে পাই। আমরা যেখানে আমাদের নিজেদের মেয়ে পাঠাব না, সেখানে আমরা কেন দেশের মেয়েদের পাঠানোর সাহস করি। বছরের পর বছর এই জিনিস চলে আসছে। এর শেষ হওয়া দরকার। তিনি আরও বলেন, মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি আমাদের সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা নিরাপদ নন এমনটি সবক্ষেত্রে সঠিক নয় উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নমিতা হালদার বলেন, আমরা যে নির্যাতনের অভিযোগগুলো পাই, সেগুলোর ভিত্তিতে সৌদি সরকারকে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে প্রশ্ন করায় তারা আমাদের জানিয়েছে, ৪৫ শতাংশ নারী চুক্তি ভেঙে দেশে ফেরে এবং সেটা ঘটে তিন মাসের ভেতরে। যারা ফিরছে তাদের পক্ষ থেকে করা শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ সবসময় সত্য নয়; আমি নিজে সেটি জানি। অনেক সময় নারীরা বিদেশে যাওয়ার তিন মাস না পেরোতেই ফিরে আসার জন্যও এমন অভিযোগ করে থাকেন বলে জেরায় বেরিয়ে এসেছে বলে জানান তিনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সরকারি-বেসরকারিভাবে যাওয়া শ্রমিকদের দায় নেবেন কিন্তু যে বিশালসংখ্যক নারী অবৈধভাবে যান, তাদের নিয়ে কর্তৃপক্ষ বেকায়দায় পড়ে যায়।
অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বোমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, শুক্রবারই হুট করে পাঁচজন ফিরেছেন, বিষয়টি এমন নয়। প্রতিদিনই অনেকে বাধ্য হচ্ছেন সর্বস্ব খুইয়ে দেশে ফিরতে। আজও আমাকে কল করে নূরজাহান নামের একজন জানালো, সে পালিয়ে রাস্তায় নেমেছে কিন্তু দূতাবাসটাও চেনে না, ওই দেশের ভাষাও ঠিকমতো জানে না। ফলে দূতাবাস তাকে কে চিনিয়ে দেবে, তাও জানে না। এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে স্থানীয় পুলিশ তাকে আটক করে আবারও ওই নির্যাতনকারীদের হাতেই দিয়ে আসবে।
তিনি আরও বলেন,সরকারকে অবশ্যই বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি জিরো টলারেন্স হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। যদি সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে না পারে তাহলে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। সৌদি মালিকরা যদি নিরাপত্তা, সুরক্ষা, মর্যাদা ও অধিকার এ চারটি জিনিস না দিতে পারে তাহলে আমাদের মেয়েদের ওখানে পাঠানোর কোনও প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে যে চুক্তি করেছিল, সেটির ভিত্তিতে গতমাসে আবারও সমঝোতা প্রস্তুত করেছে উল্লেখ করে সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ওই ভায়োলেশনগুলো যেন না ঘটে সেটি বলা হয়েছে সেখানে। ২০১৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী, পর্যালোচনা করে একটি সমঝোতা হয়েছে কিন্তু এটি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না সেই মনিটরিং ব্যবস্থার জন্য কি কেউ আছে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ