মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

৯ বছরের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা চলছে

এইচ এম আকতার : আগামী বাজেটে ভোটারদের মন জয় করতে নেয়া হচ্ছে বেশকিছু প্রকল্প। এ বাজেটে সরকার বিগত ৯ বছরের ব্যর্থতা ঢাকতে চায়। এ কারণেই বাজেটে রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রধান্য দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারের সকল উন্নয়ন দৃশ্যমান করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এ সব উন্নয়ন দেখিয়ে জনসাধারণকে খুশি করার চেষ্টা থাকবে। এজন্য প্রতি নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন মেলা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক এ প্রকল্পের কারণেই বাজেটে আকার এবং ব্যয় বাড়ছে। এতে করে জনগণের ওপর করের বোঝা আরও বাড়ছে।
জানা গেছে, সরকার উন্নয়নের নামে সারা দেশে জেলা-উপজেলায় মেলা করলেও জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। তাই আগামী বাজেটে সরকারের সকল খাতের ব্যর্থতা ঢাকতে নানা উদ্যোগ থাকবে। সরকার উন্নয়নের জোয়ার দেখলেও সারা দেশের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বিশেষ করে যোগাযোগ, শিক্ষা, খাদ্য, ব্যাংকিং খাত। এসব খাতে উন্নয়নের নানা প্রকল্প বাজেটে আগ্রাধিকার থাকবে। এতে করে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উন্নয়ন প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রতিবছর এডিপির আকার ছোট করা হয়। এটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। এবার তা করা হলেও কৌশল করা হচ্ছে। সংশোধিত এডিপির আকার ‘লোক দেখানো’ কমানো হয়েছে। সংশোধিত এডিপি পাসের পর মন্ত্রণালয়গুলোর বাড়তি বরাদ্দ দেওয়ার চাপও সামলাতে হচ্ছে। এখন মন্ত্রণালয়গুলোর বাড়তি বরাদ্দের দাবি যাচাই করে বরাদ্দ দেয়া হবে। পরে তা সংশোধিত বাজেট পাসের সময় সমন্বয় করা হবে। এই কৌশলের কারণে সরকারের খরচ আরও বাড়বে।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে আপাতত ৬ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি সহায়তার ৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা আর স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের খরচ কমানো হয়েছে ১ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। তবে দেশজ উৎসের টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলোর নতুন বরাদ্দ সবই দেওয়া হবে দেশজ উৎসের টাকায়।
চলতি অর্থবছরের প্রায় সাড়ে সাত মাসে ১৮টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা হয়েছে। সভাগুলোতে দেড় শর মতো প্রকল্প পাস হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি ছিল নতুন প্রকল্প। বেশির ভাগ প্রকল্প রাস্তাঘাট নির্মাণের। চলতি এডিপিতে এর জন্য বরাদ্দ ছিল না। এখন নতুন করে বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়গুলোকে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত পাস হওয়া নতুন প্রকল্পগুলোর জন্য ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে।
তবে সরকার বাধ্য হয়েও কিছু প্রকল্প নিয়েছে। যেমন মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত নবেম্বর মাসে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করা হয়েছে। পুরোটাই দেশজ টাকায় হবে।
এত দিন রাস্তাঘাট নির্মাণেই এমপিরা বিশেষ বরাদ্দ পেতেন। এবার স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ-মন্দির নির্মাণের জন্য তাঁরা বরাদ্দ পাচ্ছেন। একটু ভিন্ন কৌশলে তা করা হচ্ছে। রাস্তাঘাট নির্মাণের প্রকল্পে আট বছর ধরে সরাসরি প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এবার স্কুল, মসজিদ-মন্দির নির্মাণের জন্য পৃথক তিনটি প্রকল্প পাস করা হয়েছে। নতুন কৌশল হলো প্রকল্পের সারসংক্ষেপে এমপিদের ইচ্ছায় এগুলো তৈরি করা হবে, তা বলা নেই। কিন্তু শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রত্যেক এমপির ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় ১০টি নতুন বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল ভবন নির্মাণ, ১০টি পুরোনো স্কুল ভবনগুলোর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা এবং এক কোটি টাকার মসজিদ মন্দির নির্মাণ করে দেবে। ইতোমধ্যে এমপিরা তাঁদের চাহিদাপত্র দেওয়া শুরু করেছেন। মূলত নির্বাচনের বছরে ভোটারদের তুষ্ট করতেই প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
এমপিদের ইচ্ছা অনুযায়ী মাদরাসা, গণশৌচাগার, হাটবাজার নির্মাণের জন্য আরও তিনটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা আছে। এই তিনটি প্রকল্পে প্রস্তাবিত খরচ ধরা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
আবার অর্থমন্ত্রী নতুন করে ১ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে আগামী বাজেটে ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলেছেন। এর পেছনেও নির্বাচন ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনের বছরে বড় প্রকল্পগুলো আরও বেশি দৃশ্যমান করতে চায় সরকার। তাই পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, মেট্রোরেল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলসংযোগ প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের মতো বড় প্রকল্পে বরাদ্দ তেমন কমানো হচ্ছে না। এই পাঁচটি প্রকল্পে মূল এডিপিতে মোট ১৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে।
এছাড়াও সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া বৃহৎ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ করে রামপাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট, পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
উপসচিবেরা গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে ৩০ লাখ টাকা পাবেন। আর চালকের বেতন ও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। গত অক্টোবর মাসে এই গাড়ি ব্যবহারে প্রাধিকারে উপসচিবদের আনা হয়। কেবল প্রশাসন ক্যাডার এই সুবিধা পাবে। এর আগে যুগ্ম সচিবেরা কেবল এই সুবিধা পেতেন। বর্তমানে ১ হাজার ৫৫২ জন উপসচিব আছেন। সবাইকে একযোগে গাড়ি কেনার ঋণ দিলে সরকারের লাগবে ৪৬৫ কোটি টাকা। চালকের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খরচ হবে বছরে ৯৩ কোটি টাকা। নতুন এই নীতি করায় সরকারকে সংশোধিত বাজেটে অবশ্যই বাড়তি বরাদ্দ রাখতে হবে।
সরকারের খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, বাড়তি খরচের জোগান দিতে হলেও তা বাজেট শৃঙ্খলায় ব্যত্যয় হবে না। নির্বাচনের বছরে এসে রাজনৈতিক সরকারের খরচ বাড়বেই। তবে বাজেটে যে খরচ ধরা হয়েছে, তা মানসম্পন্নভাবে বাস্তবায়ন করাই জরুরি। মূল এডিপি পুরোটাই বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, বাজেটের জন্য সম্পদ চাইলে বৃদ্ধি করা যাবে না। সম্পদ বৃদ্ধির জন্য সক্ষমতাও দরকার। তাঁর মতে, নির্বাচনের বছরে এসে বড় প্রকল্পগুলো যদি দৃশ্যমান হয়, সেটা তো দেশের জন্য কল্যাণকর।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলামের মতে, সরকার নির্বাচনের বছরে খরচ বাড়াচ্ছে। ভোটারদের ভোট কিনতেই পরোক্ষভাবে এসব করা হচ্ছে।তিনি বলেন, সরকার খরচ বাড়ালেও আয় খুব বেশি বাড়াতে পারছে না। এডিপির খরচ কমানো হলেও বছর শেষে দেখা যাবে, তা-ও বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
 উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার কোনো মানে নেই। এতে সরকারের খরচই বাড়বে। মূলত খুশি করার জন্য এটি করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী বছরে সরকারের ব্যয়ে চাপ কেবলই বাড়ছে। তবে আয় না বাড়লে এতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাড়বে বাজেট ঘাটতি।
সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমপিদের জন্য বিশেষ প্রকল্প নিয়েছে সরকার। এটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এসব প্রকল্পে যাঁরা ঠিকাদারি কাজ করবেন, তাঁরা প্রবলভাবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় থাকেন। প্রকল্পের কাজে মনোযোগ থাকে না তাঁদের।
সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, যেভাবে খরচ বাড়ানো হচ্ছে, সেভাবে আয়ের সংস্থান করা হচ্ছে না। সার্বিকভাবে এটি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এত দিনের অর্জনগুলোকে টেনে ধরছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করেই নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। গুণগত মান রেখে প্রকল্প শেষ করাও হচ্ছে না। এতে সম্পদের অপচয় হচ্ছে। এক টাকার কাজ চার টাকায় করতে হচ্ছে। অন্যদিকে এই অর্থের জোগান দিতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এনবিআর।
 এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে অবশ্যই আগামী বাজেটে বেশ কিছু নতুন দিক থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। জনসাধারণের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই প্রণীত হবে আগামী বাজেট। জনগণ সম্পৃক্ত কর্মসূচিগুলোয় বরাদ্দ বাড়বে। নতুন কোনও কর্মসূচিও চালূ করা হতে পারে।
 মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে অপ্রয়োজনীয় শুল্ক ও কর বাদ দেওয়া হতে পারে। আয়কর পরিশোধের ক্ষেত্রে হয়রানি কমাতে ই-পেমেন্ট ও ই-ফিলিং চালু করার ঘোষণা থাকতে পারে।
 রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিটিআরসির আইন সংশোধন করা হতে পারে। রাজস্ব ব্যয়ের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ১৩ ডিজিটের পরিবর্তে ৩৭ ডিজিটের বাজেট ও একাউন্টিং ক্ল্যাসিফিকেশন পদ্ধতি চালু করা হতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীদের ভাতা জিটুপি (গভর্মেন্ট টু পাবলিক) পদ্ধতিতে সরাসরি প্রদান পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ থাকতে পারে এবারের বাজেট ঘোষণায়।
 পেনশন ডাটাবেজ প্রণয়ন, ই-চালান ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সরকারের অর্থ অপচয় রোধ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা গতিশীল করার সিদ্ধান্ত থাকবে এবারের বাজেটে। আসন্ন বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে। মোট জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে পারে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে। এই ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, আগামী অর্থবছর দেশের জিডিপির আকার টাকার অঙ্কে দাঁড়াবে ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ১০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে জিডিপির আকার ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ