বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

জমজমাট বেইলি রোডের ইফতার বাজার

মুহাম্মদ নূরে আলম : এবারও জমজমাট রাজধানীর বেইলি রোডের ইফতার বাজার। পবিত্র মাহে রমযানের দ্বিতীয় দিন শনিবার বিকেলে বেইলি রোড ঘুরে দেখা গেছে ইফতার সামগ্রী নিয়ে ব্যস্ত রেস্তোরাঁগুলো। এখানে পাওয়া যাচ্ছে দেশী ও পাশ্চাত্যের ছোঁয়া মিশানো তৈরি মুখরোচক, সুস্বাদু খাবারের নানা আইটেম। রয়েছে এক রেস্তোরাঁর সঙ্গে অন্য রেস্তোরাঁর প্রতিযোগিতা। ক্রেতা উপস্থিত হওয়ামাত্র বিক্রেতারা তার হাতে তুলে দিচ্ছেন ইফতার মেনু। কেউ কেউ দিচ্ছেন বিশেষ ইফতার প্যাকেজ। পুরান ঢাকার শাহী ইফতার এখন বেইলি রোডেও পাওয়া যাচ্ছে।
তবে পুরান ঢাকার চকবাজরের তুলনায় দাম দ্বিগুণ। দুপুরের পর থেকেই সড়কের দুই পাশ, রেস্তোরাঁগুলোয় ব্যস্ততা রকমারি ইফতারির সওদা তৈরি নিয়ে। পছন্দের ইফতার পণ্য পাওয়ায় সন্তুষ্ট ক্রেতারা। তেমনি বেচা-বিক্রি ভালো হওয়ায় বিক্রেতারাও খুশি। তবে দাম নিয়ে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। অনেক চড়া দামে বেইলি রোডে ইফতার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে।
রমযানের প্রথম দিনও বেইলি রোডে ছিল আশানুরূপ বেচাকেনা। গতকাল তা হয়ে ওঠে আরো জমজমাট সাপ্তাহিক ছুটি থাকার কারণে। দুপুর থেকেই দোকানগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। গত বছরের রমযানের মতো এবারো ফুটপাথের দোকান ছিল তুলনামূলক কম। যানজটও তেমন চোখে পড়েনি। ফলে ক্রেতাদের স্বাচ্ছন্দ্যেই পছন্দের ইফতার সামগ্রী কিনতে দেখা গেছে।
রাজধানীর বেইলি রোডে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের উত্তর পাশে অবস্থিত প্রসিদ্ধ ফখরুদ্দিন রেস্টুরেন্টসহ প্রতিটি দোকানেই ইফতারি বেচাকেনা শুরু হয়ে যায় দুপুরের পর থেকেই। পরিবারের সদস্যদের নিয়েই অনেকেই কিনছেন ইফতার। তারা বলছেন, সুস্বাদু খাবারের ঐতিহ্যের সাথে জড়িয়ে আছে বেইলি রোডের নাম।
নাটকপাড়া হিসেবে পরিচিত বেইলি রোড এখন ভোজন রসিকদের জন্যও প্রসিদ্ধ। পাশাপাশি পোশাকের জন্যও এই এলাকা এখন আলাদাভাবে পরিচিত। এ জন্য অনেকে পোশাক কিনতে এসে খাবারের স্বাদও নেন। এখানে আছে অনেক ফাস্টফুডের দোকান। রোজায় অনেকে ফাস্টফুডের সঙ্গে ইফতারি যুক্ত করে ব্যবসা করছেন। তবে এখানকার ইফতারির দাম অনেক চড়া। রয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়াও। চিকেন চপ, বিফ স্টিক, শামি কাবাব, রেশমি কাবাব, সুতিকাবাব, গরু চাপ, কিমা, কলিজা, মগজ, দই বড়াসহ সবই পাওয়া যায় আধুনিক ইংলিশ ও হিন্দি নামে। আসলে এইগুলো আমাদের দেশী খাবার কিন্তু বিক্রি হচ্ছে বিদেশী নামে।
বেইল রোডে যে সব জিনিস পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপের পাশাপাশি পুরি, ডিমচপ, চিকেনচপ, জালিকাবাব, বিফ স্টিক, শামি কাবাব, স্প্রিংরোল, চিকেন কাটলেট, চিকেন সমুচা, গ্রিল, রেশমি কাবাব, বিফ শিক, মাটন শিক, চিকেন ফ্রাই, চিকেন উইংস, সুতিকাবাব, দেশী টিক্কা, ফার্মের টিক্কা, জাম্বো রোস্ট, দেশী রোস্ট, পিস রোস্ট, খাসির লেগ রোস্ট, ঝালফ্রাই, গরুর কিমা, গরুর কলিজি, মগজ, খাসির চপ, হালিম, ফিরনি, তেহারি, পোলাও, দইবড়া, দই বুন্দিয়া, মিহিদানা, লাড্ডু, বুরিন্দা, মালাইচপ, মালাই সমুচা, খাজলা, ঝাল সিঙ্গারা, নিমকপড়া, বালুসাই, বুন্দিয়া লাড্ডু, নিমকি, সন্দেশ, ডিমের হালুয়া, লাবাং, লাচ্ছি, ফালুদা, মিষ্টি দই, জর্দা, পনির সমুচা, কিমা সমুচা, কিমা পরোটা, পনির রোল, পনির পরোটা, চিকেন শর্মা, পাটিসাপটা, খাসির হালিম, মুরগির হালিম, তালের বড়া, জাফরানি জিলাপি, চিকন জিলাপি, সাসলিক, ড্রামস্টিক, জাফরানি শরবত, ফ্রোনবল, কোপ্তা, জুস, লুচি, ছোলাবুট, ঘুঘনি, ফিশ কোপ্তা, লাচ্ছাসেমাই, গ্রিল স্যান্ডউইচ, বিফবল, বিফ কাটলেট, ইরানি কাবাব, মাটন কাবাব। এছাড়া অভিজাত দোকনগুলোয় রয়েছে পেঁপে, কমলা, মাল্টা, আনারসসহ বিভিন্ন ধরনের জুস ও শরবতের আইটেম ছাড়াও আছে বাহারি ইফতার। 
বেইলি রোডে ৩২ ‘বছরের পুরোনো একটি প্রসিদ্ধ ইফতারির দোকান ক্যাপিটাল ইফতার বাজার। এখানে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বেশ কিছু খাবার বিক্রি হয়। শামি কাবাব, সুতি কাবাব, জাম্বো রোস্ট, ব্রেন মসল্লা, খাসির পা থেকে শুরু করে ইলিশ মাছের পোলাও রয়েছে এই দোকানে। প্রায় ১০০ ধরনের ইফতার আইটেম বিক্রি হয় এখানে।
ক্যাপিটাল ইফতার বাজারের আনিস নামের এক বিক্রেতা বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে আমরা এখানে ইফতারি বেচাকেনা করছি। পাঁচ টাকা দামের পেঁয়াজু থেকে শুরু করে সব ধরনের ইফতারি তৈরি করা হয় এখানে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য নতুন ঢাকায় আনা হয়েছে।’
ফাস্টফুডের দোকানগুলোতেও দেখা গেল ইফতারি বিক্রির আয়োজন। গোল্ডেন ফুড, স্কাইলার্ক, গোল্ডেন ফুড, হক কনফেকশনারি, প্যারাডাইস ফ্রুট অ্যান্ড জুসবার, বেইলি হাই, বেইলি পিঠাঘর, সর, জলি বি, দি বেইলি বিস্ত্রো ভিলেজ। তাদের ইফতারির তালিকায় রয়েছে বার্গার, পিৎজা, স্যান্ডউইচ, চিকেন ফ্রাই, চিকেন ললি, ফালুদা, ফিরনি, কাস্টার্ড, এস বাকের, বেইলি বিআরবিকিউ, নবাবী ভোজ, সুইস, রেড কোর্টসহ কয়েকটি দোকানে ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। বেইলি রোডের পিঠাঘরে হরেক রকম পিঠার পাশাপাশি হালিমসহ বেশ কিছু ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাও অনেক। পিঠার মধ্যে রয়েছে লবঙ্গ লতিকা, মাল পোয়া, রস ফুল, ক্ষীর পুলি, বিবিখানা, সূর্যমুখী ইত্যাদি।
বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত শিহাবুল ইসলাম নামের ক্রেতা জানান, উন্নত পরিবেশ ও সুস্বাদু খাবারের কারণে এখানে ইফতারি কিনতে এসেছেন। ইফতারির দাম বেশি হলেও গুণ ও স্বাদে কোনো জুড়ি নেই। তাই বাসার জন্য প্রতিদিন এখান থেকেই ইফতারি কেনেন বলে জানান তিনি।
অন্য এলাকার তুলনায় এখানে দাম একটু বেশি। চিকেন ফ্রাই ৪০০-৪৫০ টাকা, চিকেন ফ্রাই ৪০-৯০ টাকা, চিংড়ি মাছের বল ৪০-৭০ টাকা, দইবড়া প্রতি পিস ৩০ টাকা, সমুচা ১০-১৫ টাকা, বোম্বে জিলাপি ২৪০ টাকা কেজি, জয়পুরী জিলাপি ৩২০ টাকা কেজি, বিশেষ জিলাপি ২৫০, হালিম ২০০-৪০০ টাকা শানকি  তবে মানভেদে ৭০০-৮০০তেও টাকা করে বিক্রি হয়। অন্য আইটেমের মধ্যে টানা পরোটা ৫০ টাকা, কিমা পরোটা ৭০ টাকা, চিকেন ললি ৬০ টাকা, বিফমিনি কাবাব ৫০ টাকা, চিকেন ফিংগার স্টিক ৫০ টাকা, প্রন বল ৭০ টাকা, এগচপ ২০ টাকা, আলু চপ প্রতিপিস ১০ টাকা, বেগুনি ও পিঁয়াজু ১০ টাকা, ছোলা প্রতি কেজি ২০০ টাকা, প্রতিপিস শিক মিনি কাবাব ৫০ টাকা, ইরানী কাবাব ৫০ টাকা, স্টিক হটডগ ৫০টাকা, চিকেন ঝাল ফ্রাই প্রতিকেজি ৭০০ টাকা, বিফ কাটা মশলা ৮০০ টাকা, চিকেন রোস্ট প্রতিপিস ১২০ টাকা, ফালুদা ১৬০ থেকে তিনশ’ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। এখানে প্রতি কেজি গরুর কিমা ৬৫০ টাকা, গরুর মগজ ভূনা ১০০০ টাকা কেজি, চিকেন ঝাল ফ্রাই ৫৫০ টাকা, জাম্প রোস্ট ৪০০ টাকা, খাশির রোস্ট ২৫০ টাকা, দেশি মুরগি প্রতি পিছ ২৫০ টাকা, গরুর সুতি কাবাব প্রতিকেজি ৬০০ টাকা, শিক কাবাব (গরু) ৬০ টাকা, খাশি ৮০ টাকা, রেশমি কাবাব ১০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেইলি রোডের ইফতারির বাজারের প্রধান আকর্ষণ আধুনিক ও নিত্যনতুন খাবারের আইটেম। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশেল খাবারের নানা আইটেম পাওয়া যায় বলে এখানে অভিজাতরা আসেন বেশি। ‘ক্যাপিট্যাল ইফতার বাজার’ নামে এক দোকানেই রয়েছে প্রায় শত আইটেমের ইফতার।
‘বেইলি বার-বি-কিউ’ও কম যায় না। তারা এনেছে প্রায় ৩৫টি পদের ইফতার। এখানে রয়েছে স্পেশাল চিকেন বার-বি-কিউ, চিকেন তন্দুরী, চিকেন গ্রিল, চিকেন সাসলিক, চিকেন স্প্রিং রোল, চিকেন সরমা, চিকেন হরিয়ালি রোল, স্পেশাল কিম বার-বি-কিউ, স্পেশাল মাটন লেক অব লেম, চিকেন ফিঙ্গার, ড্রামস্টিক, ফিস বার-বি-কিউ, চিকেন টিকা কাবার রোল, লুচি-পরোটাসহ বাহারি অনেক আইটেম। এখানে রয়েছে ১৭০, ১৮০, ১৯০ ও ২২০ টাকার চারটি বিশেষ প্যাকেজ।
রেড কোর্ট রেস্তোরাঁয় পাওয়া যাচ্ছে ফালুদা, চিকেন সালাদ, দইবড়া, দুই বুন্দিয়া, কাস্টার্ড, চিকেন ললি, চিকেন বল, পাকুরা, হালিমসহ ২৪ আইটেমের ইফতার।
ফখরুদ্দিনের দোকানে গতকাল উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যায়। এখানে খাসির হালিম থেকে বাসমতির জর্দা পর্যন্ত রয়েছে রকমারি সব ইফতার। এখানে আভিজাত্যের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ফখরুদ্দিন কনভেন্স সেন্টারে ইফতার পার্টির ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ইফতারির প্যাকেটের অর্ডারও নেয়া হয়। তবে গত রমজানের তুলনায় মাংসের আইটেমগুলোর দাম বাড়লেও অন্য আইটেমগুলোর দাম আগের মতোই রয়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে ফখরুদ্দিন ইফতার বাজারের ম্যানেজার হোসেন মোহাম্মদ শাফিন বলেন, 'এবার গরু ও খাসির মাংস আমাদের বেশি মূল্যে কিনতে হচ্ছে। তাই মাংসের ইফতার আইটেমের দাম বাড়ানো হয়েছে।'
ফখরুদ্দিন ইফতার বাজারে পাওয়া যাচ্ছে : খাসির হালিম মাঝারি থেকে বড় ২০০-৭০০ টাকা, গরুর চপ প্রতি কেজি ৬০০ টাকা, খাসির চপ/রেজালা প্রতি কেজি ৭০০ টাকা কেজি, লুচি প্রতি পিস ১০ টাকা, খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি ২৪০-৩০০ টাকা, চিকেন বিরিয়ানি ১৪০-২৫০ টাকা, গরুর তেহারি ২০০-২৫০ টাকা, ফিরনি ৩০-২০০ টাকা, জিলাপি (ছোট) ৪০০ টাকা, দইবড়া ৩০ পিস ২০০ টাকা, চিকেন রোস্ট প্রতি পিস ১৫০ টাকা, চিকেন রোস্ট (আস্ত) ৪৪০ টাকা, চিকেন ফ্রাই ৯০ টাকা।
বেইলি রোডের ৬নং নাটক সরণির ‘নবাবি ভোজ’-এর স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান চৌধুরী বিপু বলেন, ‘আমাদের ইফতার সামগ্রীতে রয়েছে পুরান ঢাকার আমেজ। ইফতার সামগ্রীতে তাই নবাবি ও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনেছি।’ জানা যায়, এবারের রোজায় ২০ পদের ইফতারি থাকবে এখানে। ছাড়া ৩০০ টাকায় রমযানের বিশেষ নবাবি ভোজ প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে এখানে। বেইলি পিঠাঘরে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ পদের পিঠা।
 বেইলি রোডে এখন ইফতারকে কেন্দ্র করেই বিকালে চলছে তরুণ-তরুণীদের জমজমাট আড্ডা। ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে তরুণ-তরুণীর ভিড় চোখে পড়ার মতো। এর সূত্র ধরেই অনেকের সঙ্গেই হয়তো দেখা হয়ে যাচ্ছে নতুন-পুরনো বন্ধুদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ