সোমবার ০৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভেজাল ও দূষিত খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে লাখ লাখ মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যবসায়ীদের লোভের কারণে ‘ফুড বা ভোজ্য ক্যাটাগরি’র নয় এমন হলেও রাসায়নিকের ব্যবহারে স্বাস্থ্য ঝুঁকি উচ্চমাত্রায়। লিভার, কিডনি, পাকস্থলির মতো ‘মেইন অর্গান’গুলোর পাশাপাশি হৃদরোগ, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস, ক্যানসারসহ নানারোগে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। ভেজাল কারবারিদের দৌরাত্ম রোজার মাসেও থেমে নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে নিরাপদ খাবার তৈরি এবং বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এবং ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৫ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ থেকে জানা যায়, বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাবারের কারণে প্রতিবছর অসুস্থ হয় আর মৃত্যু হয় ৪ লাখ ২০ জনের। অপরদিকে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব  এশিয়াতে দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়, মারা যায় ১ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে কেবল বাংলাদেশেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে ৪৫ লাখ মানুষ।
রাজধানী ঢাকায় গত কয়েকদিন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ধ্বংস করেছে দেড় হাজার মণের বেশি আম। এ সময় র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেছেন, আড়তে যতগুলো আম ছিল তার সবগুলোই অপরিপক্ক। আমগুলো পাকানো হয়েছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথোফেন দিয়ে। ফলে আম ওপরে পাকা দেখা গেলেও ভেতরে কাঁচা রয়েছে, আমের আঁটিও শক্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োগ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে। অথচ খাদ্যপণ্যে রং মেশানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ দেশের প্রচলিত বিশুদ্ধ খাদ্য আইনে। কার্বাইড, ইথোফেনসহ অন্যান্য রাসায়নিক বোতলের গায়ে ফল পাকানোর কাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ সত্ত্বেও দেদারসে সেগুলো ফল পাকানোর কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলের আড়তগুলোতে ব্যবসায়ীরা মুনাফার লোভে এসব রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জানা যায়, দেশের ৬১ শতাংশ মানুষ অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত আর শতকরা ৬২ শতাংশ মানুষ মারা যাচ্ছে অসংক্রামক রোগের কারণে। আর এর মধ্যে লিভার, কিডনি ও হৃদরোগের জন্য তারা দায়ী করেছেন রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত খাবারকে।
জাতীয় কিডনি ফাউন্ডেশন থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশের শতকরা ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। রাসায়নিক মেশানো খাবার খেয়েই কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এর অন্যতম কারণ খাবারে ভেজাল, আম-লিচু, কলাসহ নানা মৌসুমী ফলে রাসায়নিক প্রয়োগ।
জানতে চাইলে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ফল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড দেওয়া হয় যেটা ফুড ক্যাটাগরি না, এগুলো খাবার উপযোগী না। এটা দিলে আম-কলার উপরের অংশ হলুদ রং ধারণ করে বটে কিন্তু সেটা প্রকৃতভাবে পাকা নয়। একইসঙ্গে ইথোফেন নামের আরেকটি হরমোনও দেওয়া হয়, যার কারণে উপরের অংশ পাকা মনে হলেও ভেতরটা কাঁচা থাকে। এ দু’টোর কোনোটাই ভোজ্য ক্যাটাগরির না-যার কারণে মানুষের শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করে।
খাবারের সঙ্গে যখন এসব রাসায়নিক উপাদান শরীরের ভেতরে চলে যায় কিডনি তখন নিতে পারে না, ফলে কিডনির ওপর রিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। আর দীর্ঘদিন এ চর্চার ফলে কিডনি ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যেতে থাকে এবং এর কার্যক্ষমতা কমে যায়। একইসঙ্গে ভেজালযুক্ত খাবারের কারণে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যায়। এবং পাকস্থলীতে গেলে ‘ইরিটেট’ করে। গ্যাস্ট্রিক এবং আলসারের মতো রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। এরসঙ্গে রয়েছে হজমের সমস্যা, অ্যালার্জি, মুখের ভেতরে ঘা এর মতো সমস্যাও হতে পারে।
ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, খাবারের ভেজালের কারণে থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে তিনি বলেন, ‘এ কারণে এখন বন্ধ্যাত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। বয়ঃসন্ধিকালে টিনএজারদের হরমোনাল সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।’
স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব বলেন, “আগে সবার জন্য খাদ্য বলা হলেও এখন সে স্লোগান বদলে গিয়ে হয়েছে ‘সবার জন্য মানসম্পন্ন খাদ্য।’ কারণ, খাবার খেলেই এখন হবে না, সে খাদ্য হতে হবে মানসম্পন্ন, শরীরের জন্য কোন ক্ষতিকারক কোনো খাদ্য খাওয়ার চেয়ে না খাওয়াই ভালো মন্তব্য করে তিনি বলেন, রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত খাবারে মানুষের ভোগান্তি বেশি।”
তাই এ বিষয়টি এখনই সরকারের নজরদারিতে আনা দরকার। এ জন্য প্রতি জেলায় খাদ্য আদালত স্থাপন, প্রতি জেলায় কৃষি আদালত, নিষিদ্ধ রাসায়নিক পদার্থের আমদানিকারক, ব্যবহারী এবং লেবেল ছাড়া রাসায়নিক উপাদান বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
নয়ত ভবিষ্যতে আমরা অসুস্থ জাতিতে পরিণত হবো বিশেষ করে শিশুরা এর মারাত্মক শিকার হচ্ছে এবং হবে। ভয়ঙ্কর এই রাসায়নিক উপাদান মিশ্রিত খাবার থেকে শিশুদের রক্ষা করা সবার দায়িত্ব বলেন অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব।
ফল কৃত্রিম উপায়ে পাঁকাতে ব্যাপকভাবে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কপার সালফেট, কার্বনের ধোঁয়া, পটাশের লিকুইড সলিউশন, কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামকসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক এবং তাজা ও সতেজ রাখতে ফরমালিন ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দেলন (পবা) এর সভাপতি আবু নাসের খান বলেন, ‘গত কয়েক বছর সরকার কর্তৃক খাদ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয় কিন্তু তা পর্যাপ্ত না। যার ফলে কাঙিক্ষত মাত্রার সুফল এখনো পাওয়া যায়নি।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ