মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

নাটোরে ছেলের চেয়ে মায়ের রেজাল্টই ভালো

নাটোর সংবাদদাতা : এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ছেলের চেয়ে তুলনামূলক ভাল ফলাফল করেছেন মা তাহমিনা বিনতে হক (৩৫)। পেশায় তিনি একজন গৃহিনী। এক ছেলে এক মেয়ে ও স্বামী নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। তিনটি গরু ও হাঁস-মুরগী প্রতিপালন করেন তিনি। তার একটি গাভী প্রতিদিন প্রায় আট লিটার দুধ দেয়। গরুর জন্য পুষ্টিকর ঘাসের চাষও করেন তাহমিনা। এছাড়া ৬০টি লিচুগাছ ও ১২০টি আমগাছের বাগান দেখাশোনা করা তার নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। এরই ফাঁকে একমাত্র ছেলে তাওহীদুল ইসলামকে (১৬) লেখাপড়ার সময় দিতে গিয়ে তিনি নিজেও একটি স্কুলে ভর্তি হন। তারা মা-ছেলে প্রতিদিন গড়ে ৪ ঘন্টা পড়াশুনা করেছেন। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার আনন্দনগর গ্রামে তাদের বাড়ি। তাহমিনার স্বামী আলমগীর হোসেন রঞ্জু চাঁচকৈড় বাজারের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। এত ব্যস্ততার মাঝেও সংসারের যাবতীয় ঝামেলা মিটিয়ে স্ত্রীর এই কৃতকার্যে তিনি খুব খুশি। আনন্দনগর গ্রামের ওই পরিবারে এখন আনন্দের ছড়াছড়ি। অনেকেই রঞ্জুর স্ত্রী-সন্তানকে একনজর দেখার জন্য তাদের বাড়িতে ভীড় জমাচ্ছে। গৃহিনী তাহমিনার বাপের বাড়ি পাবনার চাটমোহর উপজেলার হরিপুর গ্রামে। সেখান থেকে তিনি  জোনাইল আইটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ২৩ পেয়েছেন। পাশাপাশি ছেলে তাওহীদুল ইসলামও জোনাইল এলাকার দ্বারিকুশি প্রতাপপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ৬ পেয়েছে। মা তাহমিনার প্রত্যাশা, তার ছেলে আগামী এইচএসসি পরীক্ষাতে আরও ভাল রেজাল্ট করবে।
এতিম হৃদয় উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ভালো মানুষ হতে চায় : এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে নাটোরের ছাতনী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত এতিম ছাত্র হৃদয় উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ভালো মানুষ হতে চায়। তার দিন মুজুর বাবা জহির আলী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে, মা রেখা বেগম অন্যের বাড়িতে ঝি এর কাজ করে ছেলেকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। দুমুঠো খাবার জোগার করতে পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে অন্যের বাড়িতে নিজে দিন মুজুরের কাজ করেছে হৃদয়। নাটোর সদরের ছাতনী ইউনিয়নের হারিগাছা গ্রামের অসহায় মা রেখা বেগম এখন দুই ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে রয়েছেন চরম হতাশায়। এই মা জিপিএ-৫ না বুঝলেও তার বড় ছেলে ভালো কিছু একটা করছে এটা গ্রামের সকালের উৎসাহ দেখে ঠিকই বুঝতে পারছেন। কিন্তু যাদের বসবাসের জন্য ভালো কোন ঘর নেই, ঘরে বিদ্যুতের আলো নেই, খাবার নেই, সন্তানের প্রয়োজন মতো বই, পোষাক নেই সেখানে কি করে উচ্চ শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করবেন সেই চিন্তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন তিনি। তিনি বলেন, এতদিন হৃদয়ের বই খাতা কলম স্কুলের শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা দিয়েছে, এখন কি হবে ? তার স্কুলের শিক্ষক ইন্তাজ আলী বলেছেন, অদম্য মেধাবী হৃদয় নিজের প্রচন্ড ইচ্ছার কারণেই জেএসসির পর এসএসসিতেও এমন ভালো ফলাফল করতে পেরেছে। তাদের সংসারের এমন করুন অবস্থা যে ননু আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। ও কিভাবে তাদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। তবে সুযোগ পেলে হৃদয় একদিন সফল হবেই। তাই হৃদয় ও তার মা রেখা বেগমের প্রার্থনা সমাজের বৃত্তবান ও হৃদয়বান মানুষেরা যদি তাদের পাশে দাঁড়ান তবে একদিন অবশ্যই হৃদয়ের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে একজন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবেই।
চা দোকানীর মেয়ে সোনিয়া ডাক্তার হতে চায় : এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে নাটোরের ছাতনী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত দরিদ্র চা দোকানীর মেয়ে সোনিয়া খাতুন বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। বাড়িতে খাবার নেই, ঘরে বিদ্যুতের আলো নেই, গুচ্ছগ্রামের জীর্ণ শীর্ণ ঘরে বসে শুধু দিনের আলোতে লেখাপড়া করেই তার বড় বোন সুর্বণা এর আগে মানবিক বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থবর্ষে পড়ছে। এবার মেঝ বোন সোনিয়া খাতুন বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাবা জোটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় মা ছানোয়ারা বেগম রাস্তায় মাটি কাটার কাজ করে দুই মেয়ের লেখাপড়া চালাতেন। এখন বাবা আবুল কালাম কিছুটা সুস্থ্য হয়ে রাস্তার মোড়ে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে চায়ের দোকান করায় সামান্য রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছে। সেই রোজগারে সংসারের ৫ সদস্যের খাওয়া দাওয়া ও দুই মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগার না হলেও মাকে রাস্তার কাজ করতে দিচ্ছে না দুই মেয়ে। কিন্তু অভাব অনটনও তাদের পিছু ছাড়েনি। প্রতিনিয়ত আধ পেটা খেয়ে না খেয়ে তাদের লেখাপড়া করতে হচ্ছে। কেরোসিন কেনার সামর্থ না হওয়ায় ওরা বরাবরই শুধু দিনের আলোতে লেখাপড়া করেছে। সব বই কিনতে না পারায় ধার করেছে অন্য সহপাঠিদের বই নোট। ঈদ বা বছরের শুরুতে জোটেটি তাদের নতুন জামা। ছাতনী শিবপুরের গুচ্ছগ্রামের জীর্ণ শীর্ণ ঘরে বসবাস করা দরিদ্র অসহায় এই বাবা-মা জিপিএ-৫ না বুঝলেও দুই মেয়ে ভালো কিছু করছে এটা বুঝতে পারছে। তাই তাদের প্রার্থনা সমাজের বৃত্তবান ও হৃদয়বান মানুষেরা যদি তাদের পাশে দাঁড়ায় তবে একদিন অবশ্যই তাদের মেয়ে সোনিয়া খাতুনের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পুরুন হবে। তাদের স্কুলের শিক্ষক ইন্তাজ আলী বলেছেন, অদম্য মেধাবী সোনিয়া নিজের প্রচন্ড ইচ্ছার কারনেই জেএসসির পর এসএসসিতেও এমন ভালো ফলাফল করতে পেরেছে। সুযোগ পেলে একদিন ওরা সফল হবেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ