শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশ-ভারত নৌ-রুটের লাইটার জাহাজের সাত হাজার শ্রমিক অমানুষিক নির্যাতনের শিকার

খুলনা অফিস : মংলা বন্দর থেকে বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকল রুটে চলাচলকারী লাইটার জাহাজের শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত নানাভাবে হয়রানি ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইতোমধ্যে ল্যান্ডিং পাশের জটিলতায় চিকিৎসার অভাবে দুই শ্রমিকের মৃত্যুসহ ভারতের কারাগারে আটকে আছে আরও আট শ্রমিক। এ ছাড়া নৌরুটের ভারতীয় অংশে নাব্যতা সংকটসহ পুলিশী হয়রানী, চাঁদাবাজ, মাস্তান দস্যুতার দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে দেশীয় নৌযান শ্রমিকরা। অপরদিকে ভারতগামী শ্রমিকরা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছে না। এ অবস্থায় প্রটোকল রুটে চলাচলকারী ৬ শতাধিক লাইটার জাহাজের প্রায় ৭ হাজার নৌযান শ্রমিক চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ বিষয় মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, খুলনা নৌ পরিবহন নৌযান গ্রুপ, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রতিকার চেয়েছে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন।
নৌযান শ্রমিকরা জানান, ভারতগামী নৌযান শ্রমিকদের কোন ল্যান্ডিং পাস নাই। এ কারণে কোন শ্রমিক অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে চিকিৎসার অভাবে শ্রমিকদের ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এমভি ‘গলফ-৭’ জাহাজের ড্রাইভার মাহাবুর রহমান ও  ৮ এপ্রিল এমভি ‘নীল আকাশ’ জাহাজের বাবুর্চি দুলাল খন্দকার ভারতের নৌ বন্দরের নামখানা এলাকায় বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। ওই দুই শ্রমিকের চিকিৎসার বিষয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ভারতীয় পুলিশকে অনুরোধ করা হলেও তাদের হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হয়নি।
ভারত বন্ধু রাষ্ট্র প্রশাসনের বক্তব্য, অথচ ল্যান্ডিং পাসের ব্যবস্থা নেই, তাই  প্রটোকলের চুক্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই বলে জানায় ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। এ ছাড়া ভারতের প্রটোকল চুক্তির দুর্বলতার কারণে ভারতে আটক ৮ জন দেশীয় নৌযান শ্রমিক দীর্ঘ ১৮ মাস ভারতের কারাগারে আটক আছে। তাদের জামিন হওয়ার পরও পুশব্যক সিরিয়ালের অজুহাতে কলকাতা জেলে আটক রাখা হয়েছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার এখনও কোন ব্যবস্থা হয়নি। এ সব শ্রমিক পরিবার অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। 
এদিকে জাহাজের মাস্টার, ড্রাইভার ও শ্রমিকদের বর্তমান গড় দৈনিক খাদ্য ভাতা মাত্র ৫০-৬০ টাকা দিয়ে থাকে নৌযান মালিক পক্ষ। কিন্তু দৈনিক ২২০ থেকে ২৫০ টাকা প্রয়োজন হয়। খাদ্য রেশন সংরক্ষণে দেশীয় পণ্যবাহী লাইটার জাহাজের ফ্রিজিং ব্যবস্থা নেই। আর ল্যান্ডিং পাস না খাকায় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না শ্রমিকরা। এ কারণে খাদ্য সংকটে পড়তে হয় নৌযান শ্রমিকদের। এ ছাড়া ভারতীয় নৌ বন্দরে ঝুঁকি নিয়ে পাইলট নামানো-ওঠানো করতে গিয়ে অধিকাংশ নৌযানকে পড়তে হয় দুর্ঘটনার কবলে। ভারতীয় নৌ পাইলট পণ্য বোঝাই জাহাজ ঝুঁকিপূর্ণ নদীর ফেরিঘাট এলাকা পৌঁছে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে দেশীয় নৌযান সমূহের।
ভারতগামী নৌযান শ্রমিকরা আরও জানায়, ভারতের নৌ পথ অংশে দেশীয় নৌযান ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ভারতীয় হলদীয়া নৌবন্দরে পুলিশ, মাস্তান হয়রানী নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। দেশটির নৌ পথের বচ বচ এলাকায় টিটি সেট নৌ পুলিশ হয়রানীতে নাজেহাল হতে হচ্ছে শ্রমিকদের। বন্দরের টিটি সেট জেটি ও জি আর জেটিতে দেশীয় নৌযান গুলো পণ্য বোঝাই হওয়ার পরও নানা অজুহাতে সেইলিং ব্যবস্থা না করে আটকে রাখা হয়। নৌ পথের ভারতীয় অংশের বি গার্ডেন্ট বচ বচ নামখানা বড় নদীতে কোন মুরিং বয়া না থাকায় দেশীয় নৌযান নোঙ্গর করতে দুর্ঘটনায় পড়তে হয়। এ ছাড়া সপ্তম মুক্ষিবজোবলোবপুর কেপলোট বড় নদীর মাথার চরে, যারখালীর চরে কোন বিকন বাতিও নেই। ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় হলদীয়া পাথর পতিমা ও মাথলা ও অন্যান্য জায়গায় নাব্যতার কারণে পণ্যবাহী নৌযানকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়।
এ অবস্থায় ১৪ দফা দাবি নিয়ে আবারও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিকরা। লাইটারেজ ইউনিয়নের মংলা শাখার  সাধারণ সম্পাদক মামুন হাওলাদার বাদশা জানান, প্রটোকল রুটে চলাচলকারী নৌযান শ্রমিকদের দাবিনামা ইতিমধ্যে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, খুলনা বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তর, খুলনা বিভাগীয় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন মালিক গ্রুপ, কার্গো ব্যাসেল মালিক সংগঠনসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অবহিত করা হয়েছে। 
লাইটারেজ ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাৎ হোসেন জানান, নৌ প্রটোকল রুটে চলাচলকারী নৌযান শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত জুলুম, নির্যাতন ও হয়রানীর শিকার হলেও  কোন প্রতিকার মিলছে না। আর এ বিষয়টি সরকারসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার জানানো হলেও কর্ণপাত করছে না কেউ । আগামী ৫মে’র মধ্যে এ বিষয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বাংলাদেশ-ভারতে প্রটোকল রুটে চলাচলকারী লাইটার জাহাজের শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করতে বাধ্য হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ