মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গ্রামাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৪ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না

কামাল উদ্দিন সুমন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জকে সরকার ‘বিদ্যুতের হাব’ ঘোষণা করেছে অনেক আগে । অথচ আশুগঞ্জেই বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে ভোগান্তির শিকার গ্রাহকরা। শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় এখানে লোডশেডিং হয়েছে মোট ৩০ বার। দুপুর ২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ এইভাবে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করতে থাকে। এতে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। শুধু আশুগঞ্জই নয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৪ ঘন্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। ভুক্তভোগী একাধিক গ্রাহকের সাথে আলাপ কালে এমন তথ্য জানা যায়।
 লোড শেডিং অতিষ্ঠ হয়ে  লক্ষীপুরের রায়পুর উপজেলা মো: মিরাজুর রহমান পাটোয়ারী নামের একজন গ্রাহক তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে  লিখেছেন, দেশে এখন চাহিদার চেয়ে বেশী বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। সেই বিদ্যুৎ যারা দায়িত্বে থেকেও রায়পুরে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছেন না, তাদের (ডিজিএম রায়পুর) দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার আহবান জানাতে চাই। আগে আপনি সম্মানের সহিত বিদায় হোন, অনেকদিন ধরেই রায়পুরে দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু আপনার অর্জন শূন্য!
আশুগঞ্জ শহরের মো. হাসান আলী নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘বিদ্যুৎ আসে, না যায়- তা বলা মুশকিল। কারণ বিদ্যুৎ আসার এক মিনিটের পলকে আবার চলে যায়, আবার আসে আবার চলে যায়। বিদ্যুতের রাজধানীতে যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে যেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র  নেই তাদের কি অবস্থা? তাই এটাকে বিদ্যুতের আসা, না যাওয়া বলব বুঝে উঠতে পারছি না। কারণ ২৪ ঘন্টার মধ্যে যেখানে ৪ ঘন্টা ও বিদ্যুৎ থাকে না সেখানে মানুষের কি পরিমাণ দুর্ভোগ তা বুঝানো যাবে না।
মকবুল নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, আশুগঞ্জকে সরকার বিদ্যুতের হাব ঘোষণা করেছে। অথচ আশুগঞ্জেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার এই নাজেহাল অবস্থা হলে সারা দেশের কী অবস্থা?’ বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সরবরাহ একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হোক। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে আমরা নিজ উদ্যোগে বিকল্প ব্যবস্থা করে নেব।
তবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সমালোচনা করে বিদ্যুৎ , জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু গতকাল বলেছেন, আকাশ ঘোলা হলেই ওনাদের চোখও ঘোলা হয়ে যায়! তিনি বলেন, গ্রামে একটু ঝড়-বাদল হলেই বিদ্যুতের তার পুড়ে যায়, বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে ঘর-বাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আর শহরে হয় গ্রিডের ক্যাপাসিটি থাকে না, নয় ট্রান্সফরমার ব্লাস্ট হয়। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেবার মান বাড়াতে হবে।
প্রতি মন্ত্রী বলেন, আমি দায়িত্বে আসার আগে দেশে ১১ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ থাকতো না। এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যুৎ রয়েছে। এই বছরে জাতীয় গ্রিডে আরো ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ  ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর কারণে জনগণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ তৈরি করছি কিন্তু বিদ্যুৎ দিতে পারি না।
 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনী বছরের গ্রীষ্ম ঋতু লোডশেডিংমুক্ত রাখার জন্য চেষ্টা বা উদ্যোগ নিয়েছিল  সরকারের। কিন্তু সেসব পুরোপুরি কাজ দেয়নি। তাই এবারের গ্রীষ্ম আসছে লোডশেডিংকে সঙ্গী করে। ঢাকাসহ দেশের প্রায় সর্বত্র এরই মধ্যে লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
 লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ হিসেবে সূত্রগুলো চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন ঘাটতির কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, গত বছর গ্রীষ্মের লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে সরকার এ বছরের গ্রীষ্মের আগেই ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ  উৎপাদনের কার্যাদেশ দিয়েছিল। সে অনুযায়ী চলতি মার্চ মাসে প্রায় ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ডিজেলচালিত কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা ছিল। এখন জানা যাচ্ছে, সেগুলো চালু হতে আরো সময় লাগবে। এ ছাড়া, ফার্নেস তেলচালিত প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাব্য সময় ছিল আগামী মে-জুনে। কিন্তু সেগুলোর সময়ও পিছাবে। সে কারণে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি নিয়েই মৌসুম শুরু করতে হবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে।
পিডিবি সূত্র জানায়, তারা এবার গ্রীষ্মে ১২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ রেকর্ড ১০ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট। ১৯ মার্চ সন্ধ্যাকালীন সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদনের এই রেকর্ড হয়, যদিও এরপরই উৎপাদন কমে এসেছে। এর ফলে ঢাকার মিরপুর, লালবাগ, ঝিগাতলা, মগবাজার, তেজগাঁওসহ অনেক এলাকায় শুরু হয়ে গেছে লোডশেডিং। গুলশান-বনানী এলাকায় জেনারেটর চলেছে। ঢাকার বাইরেও লোডশেডিং চলছে বলে জানা গেছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সূত্রে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা (ডি-রেটেড ক্যাপাসিটি) তার চেয়ে বেশ কম। পিডিবির পক্ষে যদি ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ  নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হতো, যা প্রকৃতপক্ষে এখন সম্ভব নয়, তাহলেও গ্রাহকের কাছে পৌঁছাত সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াটের মতো। কারণ বিদ্যুৎ  কেন্দ্র গুলো চালাতেই ব্যবহার করতে হয় উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ। এই খাতের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘অক্সিলারি’। তা ছাড়া, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গ্রাহকের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে অন্তত ১০ শতাংশ হয় পদ্ধতিগত লোকসান (সিস্টেম লস)। এর ফলে ১২ হাজার থেকে প্রক্রিয়াগত কারণেই খরচ হয়ে যেত প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। অথচ এবারের গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা  ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
 দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চাহিদা হবে প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট। ঢাকার দুটি বিতরণকারী সংস্থার মধ্যে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) চাহিদা ১ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াট। আর ঢাকা বিদ্যুৎ  বিতরণ কোম্পানির (ডেসকো) চাহিদা এক হাজার মেগাওয়াট।
এ ছাড়াও আরও রয়েছে পিডিবির বিতরণ অঞ্চল, যার সর্বোচ্চ চাহিদা হবে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট। পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ওজোপাডিকো) চাহিদা এখনই ৭০০ মেগাওয়াট। নর্থ জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির চাহিদাও প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট। গ্রীষ্ম পার হতে না হতে আগামী জুনে শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। তখন যে শুধু নগরাঞ্চলেই চাহিদা বাড়বে তা নয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাবে একেবারে গ্রামাঞ্চলের গ্রাহক পর্যন্ত।
আরইবির সূত্র জানিয়েছে, প্রতি মাসে তারা গড়ে তিন লাখ করে নতুন গ্রাহককে সংযোগ দিচ্ছে। ফলে চাহিদা বাড়ছে প্রতি মাসেই। এই বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। আবার বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সব গ্রাহকের ঘরে তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপকেন্দ্র, ট্রান্সফরমার ইত্যাদিসহ যে অবকাঠামো প্রয়োজন, তা তৈরি করা সময়সাপেক্ষ। কাজেই এবারের গ্রীষ্মে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি অনিশ্চিত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম  মনে করেন,  কিছু লোডশেডিং হবেই। তেলভিত্তিক নতুন যে কে›ন্দ্রগুলো মার্চের মধ্যে চালু হওয়ার কথা ছিল, সেগুলো তো হলো না। অথচ এপ্রিল-মে হলো সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়। কাজেই চাহিদার তুলনায় উৎপাদন স্বল্পতার জন্য কিছু লোডশেডিং হবে। আর কিছু হবে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে। তবে পরিস্থিতি যাতে গত বছরের মতো না হয়, সে জন্য আগেই সরকারের প্রস্তুতি রাখতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ