রবিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

গণতন্ত্রের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগ আবারও ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন করতে চাইছে মন্তব্য করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন,সংকট মোকাবেলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এই ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে কোনও মতেই মুক্তি পাবেন না, যদি আপনারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারেন। গণতন্ত্রের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাহলে আপনারা নিশ্চত থাকতে পারেন, আমরা বিজয় অর্জন করতে পারব।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, মুক্তগণমাধ্যম না থাকলে গণতন্ত্র বাঁচে না। অক্সিজেন ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, তেমনই মুক্ত গণমাধ্যম না থাকলে গণতন্ত্র বাঁচে না। পাকিস্তান আমল থেকে সাংবাদিক ভাইদের সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু যে বিষয়টা নিয়ে আমাদের স্বাধীনতা, সেই অবস্থা আজ নেই। আমরা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলাম ভিন্ন চিন্তা করতে পারবো বলে। কিন্তু এখানে কিছু লিখলে গুম হতে হয়। দেশ ছাড়তে হয়েছে সাংবাদিকদের। সরকার মুখে বলছে মুক্ত গণমাধ্যম। অথচ ভিন্ন ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ করছে সবখানে। টেলিভিশনে কোন নিউজ যাবে আর কোন নিউজ যাবে না, তা সরকারের লোকজন নির্ধারণ করে দিচ্ছে। একটা খবরের জন্য আমি এক পত্রিকার লোকদের জিজ্ঞেস করলাম এটা কোথায় কীভাবে পেলেন ? তারা বললেন, কিছু করার নেই, আমাদের দেয়া হয়েছে। এই হলো আমাদের মুক্ত গণমাধ্যম।

জাতির সঙ্গে জঘন্য প্রতারণা ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আচরণ করা হচ্ছে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী। ভেতরে এক আর চেহারা আরেক। মুখে বলে এক, আর করছে আরেক। আসলে গত ১০ বছরে ভীতির সমাজ  তৈরি করেছে, যে সমাজে কথা বলতে ভয় এবং লিখতেও ভয়। এই ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আমাদের শেষ করতে হবে। 

কাউকে নির্বাচন না করলে তো আর জেলে দেব বলতে পারবো না বুধবার সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফখরুল বলেন, এমন একটা মেরুদ-- বিহীন নির্বাচন কমিশন  তৈরী করেছে। যারা কোনো নিয়ম মানে না। খুলনার ক্যান্ডিডেট বাধ্য হয়ে প্রচারণা থেকে সরে এসেছে। আমরা প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে নির্বাচন কমিশনকে বলেছি। যখন ফোনে বলি তারা বলে সবই ঠিক আছে। কিন্তু যেই এসপি হুইপকে মেরেছিল। এটা সবার জানা। আমরা প্রথমদিনই বলেছি গাজীপুরের এসপিকে সরাতে হবে। কারণ সে চিহ্নিত আওয়ামী লীগার। কালকে রাতেও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজকে (বৃহস্পতিবার) সারা শহরে পুলিশ দিয়ে দিয়েছে, খুলনার বাইরের কেউ সেখানে গেলে তাকে ধরা হবে। নির্বাচনের কোন আইনে আছে, কোথায় আছে ?

তিনি বলেন, গাজীপুরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তাকে আবার সেখানে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এবারও প্রচারণা শুরুর প্রথম দিনই জামায়াতের প্রার্থীসহ ৪৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। আমরা বলেছি, চিঠি দিয়েছি, আমাদের ডেলিগেশন গেছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি।

সংকট মোকাবেলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, একটা কথা আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এই ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে কোনও মতেই মুক্তি পাবেন না, যদি আপনারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারেন। গণতন্ত্রের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। তাহলে আপনারা নিশ্চত থাকতে পারেন, আমরা বিজয় অর্জন করতে পারব।

তিনি বলেন, আমরা অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। আমরা একটা কথা খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, নির্বাচনকালীন একটা নিরপেক্ষ সরকার থাকতে হবে, পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড  তৈরি করতে হবে। তবে এই লড়াই খুব কঠিন লড়াই, এ সংগ্রাম খুব কঠিন সংগ্রাম। শুধু নির্বাচনে জিতলাম, জিতলাম না বিষয়টি শুধু তাই নয়। এ লড়াই অস্তিত্বের লড়াই।

মির্জা ফখরুর আরও বলেন, এই ষড়যন্ত্র আজকে শুরু হয়নি। অনেক আগে শুরু হয়েছে। ২০০১ সালে জোটের সরকার আসার পরই এই ষড়যন্ত্রের প্রকাশ্য রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি। সরকার গঠনের কয়েকদি পরই অরবিন্দ আধিয়ার নামে একজন সাংবাদিক ওয়ালর্ট্রিট জার্নালে লিখলেন, বাংলাদেশ কি জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে? বাংলাদেশ কি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে? সাথে সাথে বাংলাদেশের দু’টি পত্রিকা এই একই নিউজ করেছে। তখনই আমরা পার্লামেন্টে বলেছিলাম অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছি। তার পর অনেক ঘটনা ঘটছে। একটি  বৈধ চারদলীয় জোট সরকারকে সরিয়ে দিয়ে একটা অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছে। এখন আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে।

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এভাবে তো এবার নির্বাচন হবে না। কতবার জেলে দেবেন, কতজনকে মারবেন, কতজনকে গুম করবেন- করতে পারেন। এবার এই ধরনের নির্বাচন এদেশের মানুষ মেনে নেবে না।

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, সরকার এমন একটা মেরুদ-বিহীন নির্বাচন কমিশন তৈরি করেছে; আমি যখন তাদের ফোন করি তারা বললেন না না সব ঠিক আছে। কী ঠিক আছে?

আওয়ামী লীগ ১/১১-এর প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, তারা আপনাকে জেলে নিলো, কতো কিছু করলো। তাদের তো কিছু করলেন না। বরং তাদের সবকিছুকে ঘোষণা দিয়ে বৈধ করেছেন। সম্পূর্ণ মিথ্যা অপরাধে খালেদা জিয়াকে জেলে আটক রাখা হয়েছে। আমাদের দাবি, আগামী নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। সংসদ ভেঙে দিতে হবে। এরপর নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে জাতীয় নির্বাচন হতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। 

সভায় আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ হচ্ছে যারা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ আরোপ করে কোনোমতে টিকে আছেন। দ্বিতীয়টি দালাল গণমাধ্যম। এই দালাল গণমাধ্যমের কাজ হচ্ছে বর্তমান ফ্যাসিস্ট যে সরকার আছে তাদের তোষামোদ করা, সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করা এবং বিনিময়ে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পাওয়া। এই দুই গণমাধ্যমের বাইরে বাংলাদেশে আর কোনো গণমাধ্যমের অস্তিত্ব নাই।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকলে খালেদা জিয়ার জেল হওয়ার পরও  ২৪ ঘন্টার মধ্যে জামিন হয়ে যেত। শেখ হাসিনাকে সিভিল নারী চীফ মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটর আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সিএমএলএ হিসেবে রেকর্ড করতে যাচ্ছেন। দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার মঞ্চ বানানোর প্রস্তাব দেন তিনি। 

 ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের  সভাপতি রুহুল আমিন গাজী বলেন, এখন বাংলাদেশের কথা বলার অধিকার  নেই, জনসভা করার অধিকার নেই, বিচার পাওয়ার অধিকার নেই। একদল ছাড়া আর কেউ কথা বলতে পারবে না, জনসভা করতে পারবে না, কোনো কিছুই করতে পারবে না।

এখন বাকশালের শাসনই বিরাজ করছে। পক্ষে বললে ঠিক আছে, না বললে ফ্যাসিবাদের নিপীড়ন-নির্যাতন। আজকে গণমাধ্যমের কাছে যে পুঞ্জিভূত তথ্য রয়েছে তা তাদের প্রকাশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

 ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আইন করা হয়েছিল। এবার একাদশ নির্বাচনের আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য এই আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দেয়া। এর বিরুদ্ধে আজকে সাংবাদিক সমাজকে সোচ্চার হতে হবে, প্রতিবাদ জানাতে হবে।

আলোচনা সভায় বিএফইউজের মহাসচিব এম আবদুল্লাহ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ডিইউজে সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমের মুখ সেলাই করে দেয়া হয়েছে যাতে কথা না বলতে পারে। অনুসন্ধানি সাংবাদিকদের পায়ে  বেড়ি পড়ানো হয়েছে। 

সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের কোন দাবি নেই। কারণ দাবি করে কোন লাভ নেই। অধিকার আদায়ে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

ডিইউজের সহসভাপতি শাহিন হাসনাতের পরিচালনায় অন্যদের মধ্যে জাতীয় প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাাদক ইলিয়াস খান, মোদাব্বের হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ