বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ওআইসি’র ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন কাল শুরু

স্টাফ রিপোর্টার: ‘টেকসই শান্তি, সংহতি ও উন্নয়নে ইসলামিক মূল্যবোধ’ স্লোগান নিয়ে ঢাকায় আগামীকাল শনিবার শুরু হচ্ছে মুসলিম বিশে^র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের শীর্ষ সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। এবারের সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটের উপর বিশেষ জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ৫ ও ৬ মে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৫তম সম্মেলন-কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্স এ (সিএফএম) বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪০ জন মন্ত্রী ও সহকারী মন্ত্রী অংশ নেবেন। সম্মেলনে সব মিলিয়ে ৫৫০ জনের অধিক অতিথি অংশ নেবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এই তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহিরয়িার আলম এবং পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ঢাকা বৈঠকে বিশেষভাবে স্থান পাবে এবং এ বিষয়ে সম্মেলনকালে একটি বিশেষ অধিবেশনে আলোচনা করা হবে। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী আগত অতিথিদের প্রতিনিধি দলকে নিয়ে ৪ মে শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্যাম্প সফরে যাবেন বলে জানান।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি বাংলাদেশকে সমর্থন দিচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি আমাদের সমর্থন দিচ্ছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং অন্যান্য দেশ আমাদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

ওআইসির ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ৫৭ সদস্য বিশিষ্ট এই সংস্থার প্রায় ৪০ জন মন্ত্রী ও সহকারী মন্ত্রীসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের ৫৫০’র অধিক প্রতিনিধি আগামী ৫ ও ৬ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

সিএফএম এ যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে, তা উল্লেখ করতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু দেশ শান্তি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখন্ডতা রক্ষায় হুমকি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ, মুসলিম রাষ্ট্রে বাইরের হস্তক্ষেপ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, ইসলামোফবিয়া ও মানবিক বিপর্যয়সহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষে এবং একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিম-লে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সংস্থাটির সম্মিলিত উদ্যোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওআইসি পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের বাৎসরিক সম্মেলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া মুসলিম উম্মাহর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং ওআইসি দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিষয়সহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা হবে এ সম্মেলনের অন্যতম বিষয়।

তিনি বলেন, সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আগামী এক বছর সিএমএফ এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবে। আর এবারের সম্মেলনে প্যালেস্টাইন ও আলকুদস এর জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও অধিকারের বিষয়টি আলোচনায় বরাবরের মতোই গুরুত্ব পাবে। রোহিঙ্গা সঙ্কট ঢাকা সিএফএমে বিশেষভাবে স্থান পাবে এবং বিষয়টি সম্মেলনের একটি বিশেষ অধিবেশনে আলোচনা করা হবে। 

এই সম্মেলনের মাধ্যমে শুধু ওআইসিতেই নয় সারাবিশ্বেই বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিনির্মাণ, স্বার্থ সংরক্ষণ ও বিশ্ব পরিম-লে স্বীয় কূটনৈতিক অবস্থানকে আরো সুসংহত করা সম্ভব হবে, এই তথ্য জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বাড়বে এবং দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক ও সুদুরপ্রসারী ফল বয়ে আনবে এ সম্মেলন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা জার্মানীর চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সুইস পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এবারের সিএফএম-এ অংশ নিতে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ দিয়েছিলাম। কিন্তু সুইস পপররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশটিতে নির্বাচনের কারণে আসতে পারছেন না। আর কানাডা তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির বিশেণ দূতকে পাঠাচ্ছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এবারের সিএফএম এর সবচেয়ে বড় আয়োজন হলো, বর্বর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুতদের অবস্থা দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, সচিব ও উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের একসঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন। ওই দলে হোস্ট কান্ট্রিসহ ৫৭ মুসলিম রাষ্ট্রের জোট ওআইসি’র প্রতিনিধিরা ছাড়াও নন-ওআইসি কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশের বিশেষ আমন্ত্রণে আসা কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও রয়েছেন। তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যান্সল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দাদের অবস্থা সরেজমিন দেখবেন ও তাদের সাথে কথা বলবেন। 

জানা গেছে, ওআইসির ৫৭ সদস্য-রাষ্ট্রের প্রতিনিধিই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে ওআইসি সদস্য নয় অন্তত ৩টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, একটি দেশের উপ বা প্রতিমন্ত্রী এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ঢাকা সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। সর্বশেষ ২৭ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, একজন বিচার বিভাগীয় মন্ত্রী এবং ১০ জন প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধির সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল আসছে ২০টি দেশ থেকে। মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে এমন দেশগুলো হলো, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাহরাইন, ব্রুনাই দারুস সালাম, ক্যামেরুন, চাঁদ, কমোরোস, আইভরি কোস্ট, জিবুতি, মিশর, গ্যাবন, গাম্বিয়া (বিচার বিভাগীয় মন্ত্রী), গায়ানা, ইরাক, কাজাখস্তান, লিবিয়া, মালদ্বীপ, নাইজার, ফিলিস্তিন, সোমালিয়া, সৌদি আরব, সুদান, উগান্ডা, ইয়েমেন ও সেনেগাল। নন-ওআইসি দেশগুলোর আমন্ত্রিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কানাডা, কসোভো, নর্দান সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা থাকেছেন। উপমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকছে কুয়েত, মরক্কো, নাইজেরিয়া, ওমান, তাজিকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তিউনিসিয়া ও উজবেকিস্তানের। এছাড়া বিশেষ আমন্ত্রিত রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আসছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরখাস্ত হওয়ায় পররাষ্ট্র সচিব তেহমিনা জানজুয়া’র নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। এছাড়াও অন্য যেসব দেশ পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে তারা হলো, জর্ডান, কিরগিজ রিপাবলিক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কাতার ও তুরস্ক।

কানাডার হাইকমিশন সূত্র জানিয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড গতকাল ভোরে ঢাকায় পৌঁছেছেন। এছাড়া দেশটির প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ দূত বব রয়ে’ও বাংলাদেশ সফর করছেন। তিনি গতকাল ঢাকায় একটি পাবলিক লেকচার সেশনে অংশ নিয়েছেন। তারা দুজনই রোহিঙ্গাদের দেখতে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে কক্সবাজার যাচ্ছেন।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি’র ২য় শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এ জোটের সদস্যপদ লাভ করেছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ