বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Online Edition

গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে ভোটাররা শঙ্কিত

স্টাফ রিপোর্টার: আসন্ন গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা পরিদর্শন করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন। দু’টি সিটিতে ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় সেখানকার পরিবেশ নিয়ে ভোটাররা শঙ্কিত বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, দুই সিটিতে আমরা কিছু কাজ করেছি। দেখেছি, সেখানকার মানুষদের মধ্যে ভোট নিয়ে ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকার উপকণ্ঠে গাজীপুর এবং দক্ষিণের নগরী খুলনার ভোটাররা আগামী ১৫ মে তাদের সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নেবেন।

দুই সিটি করপোরেশনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপনের জন্য আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বদিউল আলম প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে নির্বাচন কমিশনকে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান।

মেয়র পদে দলীয় প্রতীকের নির্বাচনে গাজীপুরে প্রার্থী হয়েছেন সাতজন। আর সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ২৫৪ জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৮৪ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন এ সিটিতে।

খুলনায় পাঁচজন মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

এই প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য উপস্থাপনের পর সুজন সম্পাদক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, আমরা চাই, প্রার্থীরা যেসব তথ্য হলফনামায় দিয়েছে সেগুলো যাচাই করে খতিয়ে দেখা হোক। হলফ করে তথ্য গোপন করা ফৌজদারি অপরাধ। নির্বাচন কমিশন চাইলে তাদের সেই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে পারে।

স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব না হলেও অন্তত নির্বাচিতদের হলফনামার তথ্য শপথগ্রহণের আগে এক সপ্তাহের মধ্যে যাচাই-বাছাই করার পরামর্শ দেন সুজনের নির্বাহী সদস্য আইনজীবী শাহদীন মালিক।

তিনি বলেন, অনেকের সন্দেহ হচ্ছে, হলফনামায় তথ্য ঠিকমতো উঠে আসে নাই। তবে সব ধরনের তথ্য স্বল্প সময়ে যাচাই করা দুরূহ কাজ, যদিও নির্বাচন কমিশনের এটা আইনগত দায়িত্ব। নির্বাচিত দুই মেয়র এবং কিছু কাউন্সিলরের হলফনামার তথ্য এক্ষেত্রে ইসি বিশ্লেষণ করতে পারে বলে মত দেন শাহদীন।

সবারটা সম্ভব না হলেও নির্বাচন কমিশন যদি একসপ্তাহের মধ্যে শুধু নির্বাচিতদের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করে সত্যিকারের অবস্থা বের করে আনে এবং কারো তথ্যে গরমিল পেলে ব্যবস্থা নিতে পারে। সেক্ষেত্রে নির্বাচিত হলেও ফলাফল বাতিল করা যাবে।

নির্বাচন কমিশন একবার যদি এটা করতে পারে, আমি ৯০ ভাগ কনভিন্সড, পরের নির্বাচনে কেউ মিথ্যা তথ্য দিবে না।

কলামনিস্ট আবুল মকসুদ বলেন, দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক দলগুলো বা প্রার্থীদের জন্য নয়, নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি পরীক্ষা। কারণ জাতীয় নির্বাচনের ছয় মাস আগে এই নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন যথাযথ দায়িত্ব পালন করে তার সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দিবে বলে আশা করি।

সাংবাদিক সম্মেলনে প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্যের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার।

তথ্য উপস্থাপন করে তিনি বলেন, গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য নিয়ে গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। কারো কারো বিরুদ্ধে হলফনামায় তথ্য গোপনের ও অসত্য তথ্য প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। আইন অনুযায়ী হলফনামায় তথ্য গোপন করলে কিংবা মিথ্যা তথ্য দিলে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাবে। তথ্য গোপন কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নির্বাচিত হলে নির্বাচন বাতিলযোগ্য।

আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশন জনস্বার্থে মেয়র প্রার্থীদের হলফনামাগুলো চুলচেরাভাবে যাচাই-বাছাই করে তথ্য গোপনকারী ও ভুল তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তাহলেই কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে।

গাজীপুর সিটিতে প্রার্থীদের তথ্য

দিলীপ কুমার জানান, গাজীপুরে প্রতিদ্বন্দ্বী সাত মেয়র প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন স্নাতকোত্তর এবং বাকি দুজন স্নাতক ডিগ্রিধারী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম আইনে স্নাতকোত্তর এবং বিএনপি থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার স্নাতক ডিগ্রিধারী। এই প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন ব্যবসায়ী, তিনজন চাকুরিজীবী এবং একজন আইনজীবী। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী উভয়ের পেশা ব্যবসা।

সাতজন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের ফৌজদারি মামলার সংশ্লিষ্টতা আছে। বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং অতীতে আরো তিনটি ছিল। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অতীতে দুটি ফৌজদারি মামলা থাকলেও এখন নেই।

গাজীপুরে সাতজন প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের। হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী তার সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৮৮ লাখ ২৬ হাজার ৭৩৬ টাকা। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিনের মোট সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৩৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৪৯ টাকার। ২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের হলফনামার সঙ্গে ২০১৮ সালের তুলনা করে দিলীপ বলেন, ২০১৩ সালে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৪ হাজার ৭৩৭ টাকার। আর এই পাঁচ বছরে তার সম্পদের বৃদ্ধি হয়েছে ৭ কোটি ৬৯ লাখ ৩১ হাজার ৯৯৯টাকা। বৃদ্ধির এই হার ৬৪৬ শতাংশ। বিএনপি প্রার্থী আগেরবার প্রার্থী না থাকায় তার সম্পদের তুলনা পাওয়া যায়নি।

খুলনায় সিটিতে প্রার্থীদের তথ্য

খুলনায় মেয়র প্রার্থী পাঁচজনের মধ্যে তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারী হলেও বাকী দুইজন ‘স্বশিক্ষিত’ জানিয়ে দিলীপ কুমার বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক বিএ পাস করেছেন আর বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু আইনে স্নাতক।

তিনি জানান, এই প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন ব্যবসায়ী, একজন কৃষিজীবী এবং আরেকজনের আয়ের উৎস বাড়িভাড়া। আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেশায় ব্যবসায়ী আর বিএনপির প্রার্থীর ‘ব্যবসা এখন বন্ধ, তার আয়ের উৎস বাড়িভাড়া।

খুলনা সিটিতে পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা চলমান, যার একটি ৩০২ ধারায়। অতীতে আরো দুটি ফৌজদারি মামলা ছিল তার নামে।

বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুর বিরুদ্ধে চারটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং অতীতে ছিল তিনটি। আওয়ামী লীগের তালকুদার খালেকের অতীতে নয়টি ফৌজদারি মামলা থাকলেও এখন একটিও নেই। তার বিরুদ্ধে এই নয়টির চারটিই ছিল ৩০২ ধারায়।

খুলনা সিটিতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের সম্পদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। তার মোট সম্পদ ১১ কোটি ৮৩ লাখ ৩১ হাজার ৫৫৬ টাকার। বাকি চার প্রার্থীর সম্পদে পরিমাণ ৫ লাখ টাকার নীচে।

২০১৩ সালের সিটি নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী তালুকাদার খালেকের সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি ৮ লাখ ৪১ হাজার ২৯১ জানিয়ে দিলীপ বলেন, সেখান থেকে ২০১৮ সালের হলফনামা অনুযায়ী পাঁচ বছরে বেড়েছে ১ কোটি ৭৪ লাখ ৯০ হাজার ২৬৫ টাকা, শতকরা বৃদ্ধির হার ১৭ দশমিক ৩৪।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ