রবিবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ইসরাইলের বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে ফিলিস্তিনীদের শরীর

ইসরাইলের ‘বটারফ্লুাই বুলেট’ শরীরে ঢুকে বিস্ফোরিত হয়ে মাংস ও হাত ক্ষতবিক্ষত করে দেয়

৩ মে এএফপি : গাজা উপত্যকায় গত ৬ এপ্রিলের ঘটনা। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বুলেট বিঁধে মোহাম্মদ আল জাইমের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। তার বাঁ পা বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। আর বাঁচবেন না বলে জাইমের মনে ভয় ধরে গিয়েছিল।তার আক্রান্ত পায়ের ধমনী, শিরা উপশিরা ও হাড় ধ্বংস হয়ে যায়। তার ডান পায়েও একটি বুলেট ঢুকে বের হয়ে গেছে।পরে রামাল্লার একটি হাসপাতালে তাকে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তার শরীরে সাতটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল।তার বাঁ পা রক্ষা করতে তখন চিকিৎসকের কিছুই করার ছিল না। কাজেই সেটি কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।২২ বছর বয়সী তরুণ জাইম অচেতন হয়ে হাসপাতালের বেডে পড়ে আছেন।তিনি জানেন না যে তার একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসক। কিন্তু যখন জাইমের হুশ ফিরবে, তখন তার একটি পা নেই, এ কথা তাকে কে বলবে? হাসপাতালে তাকে দেখতে আসা স্বজনদের কেউ বলতে সাহস করছেন না।পশ্চিমতীরে বাস করা তার এক চাচাতো ভাই বললেন, আমার পক্ষে এ ঘটনা তাকে জানানো সম্ভব নয়।এর পর তিনি যখন জেগে ওঠেন, তখন শরীরে ভারসাম্যহীনতা অনুভব করতে থাকেন। আসল ঘটনা বুঝতে পারার পর মানসিকভাবে প্রচ- ধাক্কা খান তিনি।

তখন তার মনোভাবটা এমন যে তিনি তার পা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এটি ছিল তার জীবনের একটি কঠিন সময়।পাঁচ মিনিট ধরে তার গলায় কোনো কথা আসেনি। তার সব ভাষা যেন আটকে গেছে।গত ৩০ মার্চ শুরু হওয়া নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার দাবিতে বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ২৪ ফিলিস্তিনি তাদের অঙ্গ হারিয়েছেন।

চিকিৎসকরা বলেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এত নৃশংসভাবে গুলি করছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। তাদের এই নতুন গুলির ধরনকে বলা হয় 'বাটারফ্লাই বুলেট'।এটি এমন যে শরীরে বিঁধে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়, কোষ, ধমনী ও হাড় ধ্বংস করে দেয়। এতে করে আহত ব্যক্তির শরীরের ভেতরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। মারাত্মক জখম তৈরি করে।অঙ্গ হারানো এই ২৪ ফিলিস্তিনির সবার শরীরে একটি করে এই বিস্ফোরক বুলেট বিঁধেছিল। এমনকি সাংবাদিক ইয়াসের মুরতজা ও আহমাদ আবু হুসেনের শরীরেও একই বুলেট লেগেছিল।মুরতজা ঘটনাস্থলে নিহত হলেও আবু হুসেন আহত হওয়ার পর হাসপাতালে প্রাণ হারান।

গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল কেদরা বলেন, তাদের সবার শরীরের ভেতরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস হয়ে গেছে। দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর এ যাবতকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বুলেট হচ্ছে এটি।আল কেদরা বলেন, সাধারণ বুলেট লাগলে পা ভেঙে যায়। কিন্তু নতুন এই বুলেট ব্যাপক ক্ষত তৈরি করে। শরীরের ভেতর বিস্ফোরণের ফলেই এমনটি ঘটছে বলে তিনি জানান।মাসখানেক আগে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভে ইসরাইল বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত ৪৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

এসব নিহতের ঘটনায় নতুন ধরনের এ প্রাণঘাতী বুলেট ব্যবহার হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।এ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে সাত হাজারের বেশি নিরপরাধ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।এত বেশিসংখ্যক লোক আহত হওয়ায় গাজার চিকিৎসকদেরও ত্রাহী দশা। এ ছাড়া তাদের পক্ষে এই ভয়াবহ জখমের সঠিক চিকিৎসা দেয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।জেনেভাভিত্তিক চিকিৎসকদের সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) জানিয়েছে, এ ধরনের বুলেটে কেউ আহত হলে তার শরীরে হাতের মুঠোর সমান ক্ষত  তৈরি হয়। যার ভয়াবহতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

এমএসএফ জানায়, এসব গুলিতে আহত ব্যক্তিদের কঠিন অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।ফিলিস্তিনে এমএসএফের প্রধান মারিয়া এলিজাবেথ ইনগ্রেস বলেন, আমাদের ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে পাঁচশতাধিক আহত ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন। যাদের অর্ধেকটাই এই প্রাণঘাতী বুলেটে জখম হয়েছেন।তিনি বলেন, শরীরের ভেতরে এই বুলেটের বিস্ফোরণ ঘটলে হাড় ও কোষ ধ্বংস হয়ে যায়। এটি শরীরে ভয়াবহ ক্ষত তৈরি করে, যার চিকিৎসা দেয়া খুবই কঠিন।এ ছাড়া এই বুলেটে আহত ব্যক্তিদের পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেবে বলে জানান চিকিৎসক মারিয়া এলিজাবেথ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ