বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অভিযোগ

ওয়াহিদ আল হাসান : প্রভাতের সূর্য কেবলমাত্র পূব আকাশে মেলে ধরেছে নিজেকে। একটু একটু করে হাসি ছড়াচ্ছে চারিদিকে। সেই সূর্যের হাসি রান্নাঘরের চালের ফাঁক দিয়ে মুনহার মা মালিহার মুখে পড়ছে। সেই আলোতে মুনহার মায়ের মুখ আরও হাস্যোজ্জল হয়ে উঠেছে। আর এমন হাসিমাখা মন নিয়ে ভোরের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত গ্রামের বধু মালেহা। এমন সময় মুনহার পাড়ার বন্ধু রাওহা হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ির উঠানেÑ

: খালাম্মা.. খালাম্মা... মুনহা বাড়িতে আছে?

: নাতো, ছোট বোন তানিয়াকে নিয়ে বাইরে কোথায় গেছে। কেনো রে রাওহা, কী হয়েছে? অনেকটা আতঙ্কিত মন নিয়ে জানতে চান মুনহার মা।

: না, কিছু না খালাম্মা।

: কথা লুকাচ্ছিস কেনো? তোকে কেমন যেনো দেখাচ্ছে!

: না.. মানে.. মুনহাকে নিয়ে গ্রামের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

: কেনো, কী হয়েছে?

: ঘটনাটি সত্য কি না জানি না, তবে আমি বিশ্বাস করতে বা মানতে পারছি না।

: কেনো কী হয়েছে রাওহা, খুলে বলতো শুনি!

: আপনার বড় ছেলে মুনহার বিরুদ্ধে পুরো গাঁয়ে রব উঠেছে। অভিযোগ, সে নাকি তার আরেক বন্ধু মামুনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে। এই নিয়ে সেই মামুন গ্রামের মড়লের কাছে বিচার দিয়েছে। আর তা নিয়ে পুরো গ্রামে চলছে ব্যাপক কানাকানি। আপনার ছেলেকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নাকি শাস্তি দেয়া হবে। 

 

মা-বাবার একান্ত অনুগত ও বাধ্য সন্তান মুনহা। পুরো নাম নাফিউল হক মুনহা। জীবননগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবার থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষক, ক্লাসের সহপাঠি, পাড়ার মুরুব্বি এমনকি বন্ধুদের কাছেও সে একজন ন¤্র, ভদ্র, মেধাবি ও ভালো ছেলে বলে পরিচিত। বিশেষ করে তার পরিবার জানে তাদের সন্তান কেমন? সেই ছেলেটি সম্পর্কে এমন অভিযোগ, কেউ যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না। 

এমন অভিযোগপূর্ণ ঘটনা শুনে কেঁদে ফেললেন মুনহার মা। অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলে উঠলেনÑ 

: রাওহা এ কী শুনালি তুই! 

: যা শুনেছি তাই বললাম খালাম্মা।

 

মালেহা বেগম পাগলের মতো ছুটাছুটি করে খুঁজে বের করলেন মুনহা। ছেলের কপালে ও গালে কয়েকটা চুমু দিয়ে বুকিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেনÑ

: কী শুনলাম বাবা মুনহা! যা শুনলাম তা কি ঠিক?

: কী বলছেন? কিছু বুঝছি না আম্মা। কী হয়েছে? কী শুনেছেন? অনেকটা হতভম্ব হয়ে জানতে চায় মুনহা।

: তুমি নাকি তোমার বন্ধু মামুনকে অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করেছো? এ নিয়ে সারা গায়ে হুলস্থুল পড়ে গেছে।  মোড়লের কাছে বিচার গেছে। খুব শিগগির এর বিচার হবে। তোমাকে চরম শাস্তি দেয়া হবে।

এসব কথা শুনার পর পুরো আকাশ যেনো ভেঙে পড়লো মুনহার মাথায়! অনেকটা দৃঢ় কণ্ঠে মুনহা বলে উঠলোÑ

: আম্মা এসব কী বলছেন! আমি আবার কাকে গালি দিতে গেলাম! আমার দ্বারা এমন কাজ হতেই পারে না। যদি এমন কোনো অভিযোগ উঠে থাকে তবে তা অবশ্যই মিথ্যা, বানোয়াট। এর মাধ্যমে আমাকে ফাঁসানোর জন্য এমন অভিযোগ করছে তারা। তোমার ছেলে কেমন তুমি তো সবচেয়ে ভালো জানার কথা আম্মা।

মুনহার এসব কথা শুনে ঠা-া হয়ে গেলেন মা। নরম ও ¯েœহমাখা কণ্ঠে মা বললেনÑ

: তা তো জানি বাবা। কিন্তু আমার যে খুব ভয় হয়। তারা যদি সত্যি সত্যি তোমার বিচার করে, শাস্তি দেয় তখন কী হবে! ভাবতেই পারছি না বাবা মুনহা।

: কিছু ভেবো না আম্মা। তোমার ছেলের কিছুই হবে না। আমি যেহেতু কোনো অপরাধ করিনি অতএব আমার কোনো ভয় নেই। সাহসী মন নিয়ে কয়েকটি কথা আম্মাকে শুনালো মুনহা।

 

অবশেষে এ অভিযোগের বিচারকার্যের জন্য দিনক্ষণ ঠিক করেছে  মোড়ল। আগামী শুক্রবার বিকেল ৪টায় গ্রামের গাবতলা মোড়ে অনুষ্ঠিত হবে এই বিচারকাজ। সেখানে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তপক্ষসহ গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকা হয়েছে। সবাইকে যথা সময়ে জায়গা মতো উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। 

অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে সেই দিনক্ষণ উপস্থিত। কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বিচারকার্জের জন্য সকল প্র¯‘তি সম্পন্ন। নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আগমন শুরু হয়েছে। সবাই যার যার মতো নির্দিষ্ট স্থানে হাজির। গাঁয়ের  মোড়লের নেতৃত্বে বিচারকগণও উপস্থিত। 

এদিকে মুনহাসহ তার পুরো পরিবার এসেছে। সঙ্গে মুনহার বন্ধু রাওহা। তাদের সবার মুখে ভয় ও আতঙ্কের ছাপ। যদিও মুনহার মুখে সেসব অনুপস্থিত। কারণ মুনহা জানে সে নির্দোষ। তার কোনো অপরাধ নেই। সে ষড়যন্ত্রের শিকার। ন্যায়বিচার হলে অবশ্যই নির্দোষ প্রমাণিত হবে। 

ওদিকে অভিযোগকারী মামুনের পরিবারও এসেছে। তাদেরও আশা তারা সঠিক ও ন্যায়বিচার পাবে।

সময়মতো বিচারকাজ শুরু হলো। অভিযোগকারী মানুন ও অভিযুক্ত মুনহাকে সামনে ডাকা হলো। একে একে তাদের উভয়কে কথা বলতে বলা হলো। প্রথমেই কথা বললো অভিযোগকারী মামুন। সে বললোÑ

: গত শনিবার বিকেলে যখন সবাই মাঠে খেলাখেলি করছিলো এমন সময় মুনহা আমাকে অন্যায়ভাবে গালমন্দ করেছে। আমাকে নিয়ে কুটুক্তি করেছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই ও বিচার দাবি করছি।

বিচারকগণ মামুনের কাছে জানতে চাইলেনÑ

: তোমার অভিযোগ মতো মুনহা যে তোমাকে গালমন্দ ও কুটুক্তি করেছে তার কোনো প্রমাণ আছে?

: অবশ্যই প্রমাণ আছে। আমার দুজন বন্ধু এসে আমাকে এই খবর জানায়। শক্তমনে উত্তর দিলো মামুন।

: সেই ঘটনার সময় তুমি কি সেখানে উপস্থিত ছিলে? আবার প্রশ্ন করলেন বিচারক।

: না, সেই সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। কিছুটা নরমভাবে উত্তর দিলো মামুন।

: তুমি সেসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলে না, তোমার দুজন বন্ধু এসে বললো অথচ তুমি তা বিশ্বাস করে নিলে! হতেও তো পারে তারা মিথ্যা কথা বলছে অথবা ভুল বলছে! এমন কয়েকটি কথা শুনিয়ে অভিযুক্ত মুনহাকে কথা বলতে বললেন বিচারক।

 

মুনহা সাহসী মন নিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে বললোÑ

: আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমার দ্বারা এমন কাজ হতেই পারে না। আমাকে অপমান ও অপদস্ত করার জন্য এমন ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই। এসব বলে কেঁদে ফেলে মুনহা। 

বিচারকগণ মুনহার কাছে জানতে চানÑ

: তুমি যে এসব কথা বলোনি তার প্রমাণ আছে? 

: অবশ্যই আছে। সাহসী উচ্চারণ মুনহার।

: ঘটনার সময় মুনহা তুমি কোথায় ছিলে? আবারও জানতে চায় বিচারক।

: আমি তো সেদিন খেলার মাঠেই যাইনি। আমি সেদিন আমার ছোট বোনকে নিয়ে বাড়িতে খেলছিলাম। পরদিন সাত সকালে বন্ধু রাওহার মাধ্যমে জানতে পারলাম, আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। 

 

বিচারকগণ উভয়ের কথা মনদিয়ে শুনলেন। এবার সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা। উভয়ের কথাগুলোকে নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। এমন সময় ১০-১২ বছরের দুজন ছেলে বিচারকদের সামনে এসে হাজির। তারা বললোÑ

: স্যার, আমাদের কিছু কথা আছে। অনুমতি দিলে বলতে পারি। 

বিচারকগণ একসাথে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে বললেনÑ

: তোমরা কারা, কী বলতে চাও। নির্ভয়ে বলে ফেলো?

: আমরা এই গ্রামের ছেলে। আমরা সেদিন ঐ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, সেসময় অভিযোগকারী মামুন ও অভিযুক্ত মুনহা কেউই উপস্থিত ছিলো না। তবে এ কথা ঠিক, মামুনকে যে গালমন্দ ও কটূক্তি করেছিলো তার নাম মুনহা। কিন্তু সেই মুনহা এই মুনহা এক নয়। সে পাশের গ্রামের রফিউদ্দিনের ছেলে বদিউদ্দিন মুনহা। আর আমাদের গ্রামের মুনহার নাম নাফিউল হক মুনহা। সেদিন সেই বদিউদ্দিন মুনহা আমাদের মাঠে খেলতে আসে। খেলার কোনো এক ফাঁকে পূর্বে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামুনকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ ও কটূক্তি করে সে। এ খবর কারা যেনো মামুনের কাছে গিয়ে বলে। মামুন ঘটনাটি ভালোমতো না বুঝে আমাদের পাড়ার অতি ন¤্রভদ্র, সহজসরল মনের অধিকারী মুনহার ওপর অভিযোগ করে বসে। যা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। আমরা ঐ ঘটনার সাক্ষী হিসেবে অভিযুক্ত মুনহার নির্দোষ দাবি করছি।

বিচারকগণ ছেলেদের কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনছিলেন। বিস্ময়ভাব প্রকাশ করে বললেন, কী অবাক কা-! কার অপরাধের অভিযোগ কার ওপরে করা হয়েছে? কে অপরাধ করেছে আরা কাকে সেই অপরাধের শাস্তি দিতে যাচ্ছিলাম? একজন নির্দোষ ও নিরাপরাধ ছেলেকে কীভাবে ফাঁসানো হচ্ছিলো?

বিচারকগণ তাদের বিচারের রায় চূড়ান্ত করে মুনহাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করলেন। এ রায়ে মুনহার পরিবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। মুনহাকে তার মা মালেহা বেগম কোলে তুলে নিয়ে কপালে, গালে কয়েকবার চুমু দিলেন। খুশি মন নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো মুনহার পরিবার। মুনহা ও তার বন্ধু রাওহা হাতে হাত ধরে ছন্দে ছন্দে দৌড় দিলো সবার আগে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ