বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দিনমজুর

কবির কাঞ্চন : - এই রিক্সা, মাইলের মাথা যাবি?

- না, আমার ভাড়া আছে।

- কৈ কাউকে তো দেখছি না। চল আমাদের মাইলের মাথায় নামিয়ে দিয়ে আসিস।

- না, আমি এখন সেদিকে যাব না। আপনি অন্যকোন রিক্সায় যান।

- ভাড়া বাড়িয়ে দেব। তবু চল।

- দেখুন, বাসা থেকে  কল এসেছে, আমার মায়ের খুব অসুখ। আমাকে এখনই  বাসায় যেতে হবে। 

- রিক্সা নিয়ে বের হয়েছিস। আবার বলছিস যাবি না। এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেব। রিক্সা ঘুরিয়ে নে। আগে আমাদেরকে মাইলের মাথায় দিয়ে আস।

- স্যার, আপনি রাগছেন কেন? আমার সমস্যা আছে বলেই তো সেদিকে যাচ্ছি না।

 

- আবার মুখে মুখে তর্ক করছিস। বেয়াদব কোথাকার। 

এই কথা বলে রিক্সাওয়ালাকে মারতে উদ্যত হয় বিপ্লব সাহেব। রিক্সাওয়ালা বিপ্লব সাহেব মুখের দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। 

বিপ্লব সাহেবের ছেলে স¤্রাট বাবার হাত ধরে  টানতে টানতে রিক্সা থেকে একটু দূরে সরে আসে। 

বিপ্লব সাহেব রাজনীতি করেন। তার দল সরকারে আছেন। এলাকার মানুষের কাছে তার পরিচয় একজন প্রভাবশালী রাগী মানুষ হিসেবে। কারো সাথে একটু উনিশ থেকে বিশ হলেই তিনি রেগে গিয়ে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সবাই তাকে ভয় পায়।

স¤্রাট বিপ্লব সাহেবের একমাত্র ছেলে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।  মেধাবী ছাত্র। সে রাজনীতি বোঝে না। বোঝে না মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য। রিক্সাওয়ালার ওপর বাবাকে অন্যায়ভাবে রাগতে দেখে খুব মন খারাপ হয় তার। বাবার হাত ধরে একপাশে নিয়ে এলে আরেকজন রিক্সাওয়ালা কাছে এসে বললেন,

- স্যার, আপনারা আমার রিক্সায় আসেন। যেখানে যেতে চান আমি নিয়ে যাব। সত্যিই ওর মায়ের খুব অসুখ। যেকোন সময় --------।

অভাবের সংসারে মা ভক্ত ছেলেটা দিনরাত খাটুনি করে রিক্সা চালায়। 

আমার বাসার পাশেই ওরা থাকে। 

 

বিপ্লব সাহেব স¤্রাটকে সাথে নিয়ে রিক্সায় উঠলেন। রিক্সা তাদের গন্তব্যে ছুটছে। 

স¤্রাট রিক্সাওয়ালার দিকে মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকে। রিক্সাওয়ালা অনবরত ঘামছে। বামহাতে  গলার গামছা দিয়ে বারবার ঘাম মুছছে। দেখে মনে হচ্ছে খুব ক্লান্ত। তবু অবিরাম রিক্সার হ্যান্ডেলে পা দুটো চালিয়ে যাচ্ছে। সামান্য ক'টা টাকার জন্য কঠোর  পরিশ্রম করছে। কোনমতে খেয়ে পরে বাঁচতেই এত কষ্ট সহ্য করা। এদের সারাদিনে অক্লান্ত পরিশ্রমে উপার্জিত টাকার সমপরিমাণ টাকা কিংবা তারও বেশি স¤্রাটদের মতো ধনীর ছেলেমেয়েরা রোজ অপচয় করে থাকে।

স¤্রাট আবেগী হয়ে রিক্সাওয়ালাকে দেখিয়ে আস্তে করে বাবাকে বলল,

- দ্যাখো,  বাবা, লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব ক্লান্ত। তবু রিক্সা চালিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা কতো আরাম করে রিক্সায় বসে আছি! ওরাও তো মানুষ! শুধু বেঁচে থাকতে ওরা নিত্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। ওদের ন্যায্য পাওনাও কখনও কখনও ঠিকমতো ভাগ্যে জুটে না। কি ঠিক না বাবা?

এতক্ষণ ছেলের বলা কথামালা গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনলেন বিপ্লব সাহেব। এ বয়সেই স¤্রাটের  এমন মানবিক উপলব্ধিতে বাবার মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। ছেলের দিকে স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

- মানুষের প্রতি তোমার যে দৃষ্টিভঙ্গি তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তুমি যা যা বলেছ সব সত্য। শ্রমিকের  ঘাম ঝরানো শ্রমেই গড়ে ওঠেছে আমাদের আজকের সভ্যতা। তাদের শ্রমেই আমাদের সুন্দর-আরামে পথচলা। অথচ সেই তারাই আবার নানাভাবে বঞ্চিত

হচ্ছে।

- কিন্তু কেন?

- ‎আমার মনে হয় এর পিছনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে ওদের অসহায়ত্ব আর ধনী সম্প্রদায়ের শোষণ মনোবৃত্তিই মূল দায়ী। 

- ‎তার মানে তুমি বলতে চাইছো, এখানে মানবিকতাই মূল। 

- ‎হ্যাঁ, তুমি একদম ঠিক ধরেছো। আমরা সবাই যতবেশি মানবিক হবো ততবেশিই ধনী-গরীবের বৈষম্য কমবে। সমাজে শান্তি আসবে।

- ‎বাবা, তোমাকে একটা কথা বলতে আমার খুব খারাপ লাগছে। সেই রিক্সাওয়ালার সাথে তোমার উত্তেজিত হওয়াটা মনে হয় ঠিক হয়নি? লোকটা মনে খুব কষ্ট পেয়েছে!

বিপ্লব সাহেব একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,

- তুমি ঠিক বলেছো। এখন আমার কাছেও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তুমি জানো না, এরকম অনেক রিক্সাওয়ালাকে আমি দেখেছি যারা অকারণে বসে থাকবে। যাত্রীর জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে আমলে নেবে না। এমনও দেখেছি ঘরে চাল নেই। বৌ-বাচ্চা না খেয়ে আছে। অথচ ওদের মধ্যে কেউ কেউ নেশা করে, জুয়া খেলে সময় পার করছে। ইচ্ছে করলেই যেতে পারে। একটু ভালো থাকার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু ওরা তা করে না। তাই মাথাটা গরম হয়ে গেলো।

- তোমার সব কথা মানছি। কিন্তু সেই রিক্সাওয়ালা তো খারাপ ছিল না।

বিপ্লব সাহেব মাথা নাড়তে নাড়তে সায় দিয়ে বললেন,

- হ্যাঁ, ও ভালো লোক ছিল।

- ‎আমার একটা কথা রাখবে?

- ‎কি কথা?

- ‎আমরা তো এখন বাসায় গিয়ে ঘুমাবো। কিন্তু লোকটার তো ঘুম হবে না। সারারাত অসুস্থ মায়ের পাশে নির্ঘুম কাটিয়ে দিবে হয়তো। আর তোমার সাথে ঘটে যাওয়া বিষয় ওকে আরো পীড়া দিতে পারে।

বিপ্লব সাহেব একটু ভেবে নিয়ে বললেন,

- তুমি কি বলতে চাইছো?

আমি চাইছি,  এখন বাসায় না গিয়ে আমরা লোকটার বাসার দিকে যাব। তাহলে ওর থেকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ হবে। ওর অসুস্থ মাকেও দেখে আসা হবে। আর আমরাও শান্তিতে ঘুমাতে পারবো, তাই না, বাবা?

স¤্রাটকে বুকে জড়িয়ে ধরে গর্বে বলতে লাগলেন,

- বাংলার ঘরে ঘরে তোমার মতো সন্তান হলে সোনার 

দেশ হতে বেশিদিন লাগবে না। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ