রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

পুজি ছাড়া ব্যবসা

মোহাম্মদ লিয়াকত আলী : তিনি তোমাদেরকে শোনা, দেখা ও চিন্তা ভাবনা করার শক্তি দিয়েছেন অথচ তোমরা তা কমই কাজে লাগাও। তিনিই তোমাদেরকে জমিনের উপর চলাফেরা করার ক্ষমতা দিয়েছেন। তারই কাছে তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। কি চমৎকার কথা। আল্লাহর কথাতো চমৎকার হবেই। আল্লাহর নবীর কথাও কম চমৎকার নয়। কবিতার ছন্দে প্রকাশ করলে আরো সুন্দর লাগে ঃ 

তিন দিন হতে খাইতে না পাই, নাই কিছু মোর ঘরে

দারা পরিবার বাড়িতে আমার, উপোস করিয়া মরে

নাহি পাই কাজ, তাই ত্যাজি লাজ, বেড়াই ভিক্ষা করি

হে দয়াল নবী, দাও কিছু মোরে নহিলে প্রাণে মরি।

দয়াল নবী (সাঃ) তাকে ভিক্ষা দেননি। শিক্ষা দিয়েছেন ঃ 

সম্বল তার কম্বল খানি বেঁচিয়া তাহা করে

অর্ধেক টাকা দিলেন, খাদ্য কিনিবার তরে

বাকী দিয়া তার, কিনিয়া কুঠার, হাতল লাগিয়ে নিজে 

কহিলেন যাও, কাঠ কেটে খাও, দেখো খোদা করে কিযে।

নবীর শিক্ষা মেনে জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে বাজারে বেচে সেই ভিক্ষুক পরবর্তীতে দাতা হয়েছেন। 

কোরান হাদিছের সুন্দর কথাগুলো মানুষ কমই কাজে লাগায়। সুস্থ-সবল, জোয়ান-মর্দ আরিফ হাত পাতে মোতালেব সাহেবের কাছে। 

- নাহি পাই কাজ, তাই ত্যাজি লাজ, আইছি আপনের কাছে। আল্লায় আপনের অনেক দিছে। দোয়া করি আরো দেক। আমাকে একটু সাহায্য করলে প্রাণে বাঁচি। দান করলে মান বাড়ে। কামাই রোজগারে বরকত অয়। মোতালেব সাহেবও একটু শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করলেন ভিক্ষা না দিয়ে ঃ 

- কাম কইরা খাইতে ভালা লাগেনা ? ভিক্ষা চাইতে খুব মজা লাগে ? 

- কই পামু কাম ? আপনে দিবেন ? কাঠ কাইটা খাওনের ওয়াজ অনেক শুনছি। অত সস্তা জঙ্গল এখন আছে নাকি ? ইচ্ছা করলেই কি গাছ কাইডা বেছন যায় ? 

- ঠিক আছে। আমি তোমাকে আমার এক বন্ধুর কাছে নিয়ে যাচ্ছি। সে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবসা করে। 

- তার কাছে যাইয়া আমি কি করমু ?

- তোমার কিছু করতে হবে না। যা করার তিনিই করবেন। তোমারতো দুইটা চোখ আছে। এক চোখ দিয়েই দুনিয়া দেখা যায়। সব কাম কাজ করা যায়। ইসরাইলের সাবেক প্রধান মন্ত্রী মোর্শেদায়ান এক চোখ দিয়েই দেশ শাসন করছেন। তোমার একটা চোখ তুলে নিবে। দশ লাখ টাকা পাবে। 

- পাগলে পাইছে নাকি ? চোখ বেইছা দুনিয়াত কানা অইয়া থাকমু ?

- ঠিক আছে, তোমাকে কানা হতে হবে না। তোমার বুকের ভিতর দুইটা কিডনি আছে। এক কিডনিতেই মানুষ বাঁচে। কাম কাজ করতে পারে। তোমার একটা কিডনি অপারেশন করে নিয়ে যাবে। পাঁচ লাখ টাকা পাবে। স্যুট কোট পড়ে ডাটে ঘুরে বেড়াতে পারবে। কেউ বুঝবে না, তোমার একটা কিডনি নাই। 

- খাইয়া আর কাম নাই। কিডনি বেইছা ফুডানি করমু। বাহিডা ও নষ্ট অইয়া গেলে বাঁচমু কেমনে ?

- ঠিক আছে। দুনিয়ায় আর কয়দিন বাঁচবা ? মানুষতো টাকা জমায় ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যত চিন্তায়। তুমি তোমার পুরা শরীরটাই বেচতে পার। চোখ, কিডনি, হার্ট, লিভার, স্টমাক, ব্লাড, যেখানে যেটা লাগে, কাজে লাগাবে। তোমার ছেলে মেয়েদের নামে বিশ লাখ টাকা ডিপোজিট করে দিবে।

- রাহেন আপনের ফালতু প্যাচাল। দরকার নাই আপনের সাহায্যের। 

পুজি ছাড়াই ঢাকা এসেছে ফরিদ ও আরিফ। কাজ না পেলে ব্যবসা করবে, এই আশায়।

 

বিনা পুজিতে লাভজনক ব্যবসা ভিক্ষা করা। দশ জনের কাছে হাত পাতলে একজনের কাছ থেকে কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই। দু’চারজন গালাগালি করলেও ক্ষতি নেই। দু’টাকার নোট বা কয়েন বর্তমান বাজারে কোন কাজে লাগে না কিন্তু দান করলে ছোয়াব হয়। দু’টাকা পাঁচ টাকা দিয়ে ছোয়াব কামানোর সুযোগ সন্ধানীর অভাব নেই।  

 

ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়ার চেয়ে গাড়ি ভাড়া  কম। বাড়ির জন্য জমি কিনতে হয়। গাড়ির জন্য রাস্তা কিনতে হয় না। মেসে সিট ভাড়া তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বাড্ডা থেকে ফার্মগেট বাস ভাড়া মাত্র দশ টাকা। যানজটের কারণে তিন ঘন্টা বসে থাকা যায়। বসে বসে ঘুমানোও যায়। 

ফরিদ বিশ টাকা বাস ভাড়া দিয়ে আপ ডাউন পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা ঘুমাতে পারে প্রতিদিন। মাসে মাত্র ছয়শত টাকা। 

কম টাকায় খাওয়ার জন্য ঢাকায় আছে হোটেল ছালাদিয়া, হোটেল ইটালিয়া, হোটেল রোডেশিয়া। বড় বড় তিন তারা পাঁচ তারা ও চাইনিজের উচ্ছিষ্ট বিক্রি হয় এসব হোটেলে। মুরগীর চামড়া, গলা, ডানা, পা, গিলা ও কলিজার বিশেষ  মেনু খেতে খারাপ লাগেনা। 

ফরিদ ভিক্ষা না করে কাজ করে খায়। “নবীর শিক্ষা করোনা ভিক্ষা মেহ্নত কর সবে”। নবীর শিক্ষা  কাজে লাগিয়েছে সে। মাঝে মাঝে আরিফের সাথে দেখা হলে ফরিদ জিজ্ঞেস করে। 

- কেমন আছ-টাছ, কি কর-টর দিন-টিন কেমন চলে-টলে ?

এ সব দ্বৈত শব্দ ডিকশেনারিতে না থাকলে ও মানুষের মুখে মুখে চালু আছে। 

আরিফ জবাব দেয় ঃ

- আল্লাহর রহমতে তোমাগো দোয়ায় ভালাই আছি। বিনা পুজিতে লজিনে খাই, মেছে ঘুমাই, মসজিদে টয়লেট করি।

- মসজিদে কি কর ?

- মসজিদের বাথরুমে কাম সারি। ছিটি কর্পোরেশনের পাবলিক টয়লেটে ফি লাগে। ছোট কাজ দুই টাকা , বড় কাজ পাঁচ টাকা। এত মসজিদ থাকতে টাকা খরচ করে কোন পাগলে ?

- আমি ঠিক উল্টা। আমি ভিক্ষা করি। বাসে  ঘুমাই। মিনারেলের খালি বোতলে জেনারেল ওয়াটার ভরে রেল লাইনে ছোটবড় সব কাম সারি। 

- তোমার বাবার ও লাজ-শরম কম আছিল। তুমি একদম বেশরম। আল্লায় হেদায়েত করুক। 

- পুরুষ মাইনষের আবার লাজ-শরম ?

- তুমি যেই রকম পুরুষ, তোমার কাজ-কাম, লাজ-শরম ও সেই রকমই। 

- প্রাইমারী স্কুলে পড়ছিলাম, পুরুষ তিন প্রকার। উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ ও নাম পুরুষ। আমি অইলাম ঐ নাম পুরুষ। মানে নামেই পুরুষ। কামে নাই। তাই বইলা তোমার মতন কা-পুরুষ না। মাইগ্যা খাইনা। 

- পাগলে কি না কয়, ছাগলে কি না খায় ?

- চোর চোট্টার চাইতে পাগল - ছাগল অনেক ভালা। পাগলে আবল-তাবল কইলেও মিছা কতা কয়না। ছাগল সব খাইলেও ঘুষ খায় না। আমরাই ভদ্র লোক। পুজি ছাড়া ব্যবসা করি। একজন কাম করি, একজন ভিক্ষা করি। চুরি চোট্টামি করিনা, কাউরে ঠকাই না। 

- ছোটকালে পোলাপানগো একটা ধাঁধাঁ শোনাইতাম। এক ছাগলের তিন মাথা, ছাগলে খায় লতা পাতা। এর জবাব মটির চুলা। এখন সেই মাটির চুলাও নাই লতা পাতা দিয়া কেউ রান্ধেও না। 

- সেই ছাগলের খাওনও এখন মাইনসে খায়। ক্ষেত নিড়াইনা পাট পাতা, মালঞ্চা, হেলেঞ্চা, ঢেকি, কলমি, থানকুনি এখন ঢাকায় টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না। 

গ্রাম থেকে এক বেগ এসব আগাছা নিয়ে ঢাকায় এসেছিল ফরিদ। মতিঝিলের অফিস পাড়ায় ফুটপাতে সাজিয়ে বসতেই বিক্রি হয়ে যায় সব। বিনা পুজিতেই লাভ পাঁচশত টাকা। কাজে লেগেছে চাপার অভিজ্ঞতা। 

- ফরমালিন পিজারবেটিভ ছাড়া টাটকা শাক। খাইয়া মজা পাইবেন। রোগ-বালাই মাফ পাইবেন। 

মাঝে মাঝে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে এলেবেড়া, ওলট কমল, চিড়তা কালমেগ, বাসক, তেলাকুচা, নিমের ডাল, অর্জুনের ছাল। শহরে এসব ঔষধি গাছ তাজা পাওয়া যায়না। শুকনা লতা-পাতা ভিজিয়ে পানি খায় ঔষধ হিসেবে। তর তাজা এসব বনাজি বিক্রি হয় হট কেকের মত চাপাড় জোরে ঃ 

- আমার কাছে দেখতে পাচ্ছেন কিছু জঙ্গলের লতা পাতা। জঙ্গল হল মানবের জন্য মঙ্গল। এসব চিনলে জড়ি,

না চিনলে চুলা গুতানোর খড়ি। এসব  দিয়েই ঔষধ কোম্পানী ঔষধ বানায়। কোম্পানীর ঔষধ না খাইয়া ডাইরেক্ট আল্লাহর নেয়ামত খান। 

বিনা পুজির এ ব্যবসায় ফরিদ মিয়া হয়ে যায় ফরিদ সাব। 

স্বল্প পুজির ব্যবসায়ে লোকসানের ঝুঁকি নাই, ভ্যাট নাই, ট্যাক্স নাই। 

কিছু জিনিস দশ টাকা কেজি কিনে প্রতি পীস দশ টাক বিক্রি করা যায়। ফরিদের লেকচার ও বেশ কাজে লাগে ঃ 

- বরফ -কোল্ড ড্রিংক মুখে ঠান্ডা লাগলে ও খাইলে শরীর গরম লাগে। শশা-খিড়াই-গাজর খান। মন-প্রান একেবারে ঠান্ডা আর তাজা। কাইট্টা ছিল্লা লবন লাগাইয়া দিছি। চাইয়া যান, খাইয়া যান, ঘরের জন্য লইয়া যান।

সীজন বুঝে আনারস, পেয়ারা, জাম্বুরা, আমড়া, কামরাঙ্গা ও বড়ই বেঁচে এভাবেই লাভবান হয় ফরিদ। 

বাসে ঘুমানোর বদ অভ্যাস ত্যাগ করে বাসা ভাড়া নেয়। তবে কিনা ভাড়ায় বাসে চড়ে স্বল্প পুজিতে ব্যবসা করে মাঝে মাঝে। লোকাল বাসে প্রতিবন্ধি ও হকারদের ভাড়া লাগেনা। 

আরিফ মাঝে মাঝে প্রতিবন্দি সেজে ভিক্ষা কাম ব্যবসা করে। সিটে বসা যাত্রীদের কোলে লজেন্স বা বাদামের প্যাকেট ছুড়ে দিয়ে বলে ঃ

- ভিক্ষা না দিয়ে একটা লজেন্স, এক প্যাকেট বাদাম নিয়ে যান। খান আর ছোয়াব কামান। 

ফরিদ ও চটকদার লেকচার দিয়ে বাসে চড়ে বিক্রি করে ভিক্স কফ লজেন্স, ডোল কোম্পানীর চুলকানির মলম, মাথা ব্যথার টাইগার বাম, কান চুলকানোর কটন স্টিক, টুথ ব্রাশ ও টুথ পাওডার। সস্তা দামের বিপদের বন্ধু, ঘরের ডাক্তার। ফরিদকে দেখলে দ্রুত সরে পড়ে আরিফ। দুই বন্ধুতে দূরত্ব তৈরী হয়। অথচ কেউ কারো শত্রু নয়। একজন নবীর শিক্ষা মেনে খেটে খায়, আর একজন নবীর শিক্ষা অমান্য করে মেগে খায়। 

এক সাথে ঢাকায় এসেও  আরিফ ফরিদের মত সাহেব না হয়ে হয়েছে আরু ফহির।  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ