রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ফররুখ আহমদের ‘কাফেলা’র ছন্দ ও প্রকরণ

খুরশীদ আলম বাবু : প্রথমে ফররুখ অনুরাগী পাঠকের জানিয়ে রাখি এই কাব্যগ্রন্থটি বেরিয়ে ছিলো ফররুখ আহমদের মৃত্যুর প্রায় পনের বছর পর। বলতে গেল দীর্ঘ সময় লেগেছে। দেশের কোন বেসরকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ এগিয়ে আসেনি, বের করেছিল ইসলামী সংস্কৃতিকেন্দ্র, ঢাকাÑযা মূলতঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের অধিনেই পরিচালিত হয়ে থাকে। ফররুখ আহমদের বহু অপ্রকাশিত লেখা এখন অবধি প্রকাশের আলোর পথে পা রাখেনি। তার কারণ আবদুর মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৫, ১০ জুন) গ্রন্থে কবির সমস্ত রচনাবলির যে বিবরণ আছে তা পড়লে বোঝা যায় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত আপদমস্তক একজন সৃজনশীল কবি। প্রয়াত কবি সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ চট্টগ্রামে একবার এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ফররুখ আহমদ তাঁর লেখার মর্ম বুঝতেন বলেই লেখাগুলোকে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রেখেছিলেন। তবে আশা করা যায় প্রয়াত কবির সমস্ত রচনাবলি এক সময় প্রকাশিত হবেই, একথা জোর দিয়ে বলা যায়। যে ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল আমাদের আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ ‘কাফেলা’। এই কাব্যগ্রন্থটি বের করার ইচ্ছে কবি জীবনের প্রথম পর্বেই ছিলেন; জীবৎকালীনে কবির সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এটাই বাস্তবতা। ফররুখ অনুরাগী কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ’র মতে এটাই ছিলো তাঁর জীবনের প্রথম কবির পা-ুলিপি। এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ হলে আমরা অবশ্য প্রথম প্রকাশিত ‘সাত সাগরের মাঝি’র বেশ কিছু উজ্জ্বল কবিতা পেতাম না, যেমন : ‘আকাশ নাবিক’ ও ‘আওলাদ’ ইত্যাদি স্মরণীয় কবিতাকে এই গ্রন্থের তালিকায় রেখেছিলেন। তবে ফররুখ আহমদ কেন এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করলেন না তার যথাযথ ব্যাখ্যা আমরা এ যাবৎ পাইনি। পাশাপাশি কেন প্রকাশ করেননি? তার যথাযথ ব্যাখ্যা এতদিন পর আমাদের পক্ষে সঠিক ভাবে উপস্থান করা একটু কঠিনও বটে। কারণ এই বিষয়ে ফররুখ অনুরাগী লেখক  গবেষকরা খুব বেশি নাড়াচাড়া করেছেন বলে মনে হয় না। আমার ব্যক্তিগত মতামত অবশ্য একটু অন্যরকম। খুঁজে পেতে দেখা গেল ‘কাফেলা’র যে পা-ুলিপি ফররুখ আহমদ জীবৎকালীনে তৈরি করেছিলেন, আজকের প্রকাশিত ‘কাফেলা’র সাথে খুব একটা মিল নেই। ১৯৪৩ সালে যে পা-ুলিপি তৈরি করেছিলেন তাতে কেবল নয় নম্বর কবিতারই শিরোনাম  ছিল ‘কাফেলা’। পরবর্তীকালে ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) ও ‘সিরাজুম মুনিরা’ কাব্যগ্রন্থে ‘কাফেলা’র কবিতাবলি ঠাঁই পাই। এটা ধারণা করা অমূলক হবে না যে, এই সময়-এ তিনি সাত সাগরের মাঝি’র সাড়া জাগানো কবিতাবলি ঠিক যেন কোলরিজিও ঘোরের মধ্যে সৃজন করে ফেলেছিলেন।  তাই হয়তো সমসাময়িক কবি বন্ধুদের পরামর্শেই ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। বলা বাহুল্য এই কাব্যগ্রন্থ এনে দেয় একজন সফল কবির শিরোপা। যদিও প্রয়াত সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ মনে করেন স্বয়ং শিল্পমূল্যে ফররুখ আহমদ এই কাব্যগ্রন্থকে অতিক্রম করতে পারেননি। আমিও অবশ্য সেইরকম মনে করি না। এটা ঠিক যে, ‘সাত সাগরেরর মাঝি’ কাব্যগ্রন্থে ফররুখ আহমদ নিজের জগতের সন্ধান পেয়ে যান। তাই বলে প্রথম জীবনের কবিতাবলিতে শিল্পীমূল্য কম সেটি বললে সত্যের অপলাপ হবে। পরবর্তীতে ফররুখ আহমদ নিজের পরিকল্পনা মোতাবেক ‘কাফেলা’ বের হয়। সেখানে যোগ হয় অনেক নতুন কবিতা। এই কারণে ফররুখ অনুরাগী কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্ ‘কাফেলা’র কবিতাবলিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। কবিতাবলি দুই পরিবেশ থাকার কারণে হয়তো এই মন্তব্য করেছেন:

ক. সেগুলো মুসলিম ইতিহাস পুরাণ ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক ও 

খ. স্বাদেশিকতার সৌরভ আমোদিত কবিতা মালা। 

যারা অভিযোগ করেন যে, ফররুখ আহমদের কবিতা স্বদেশ বিবর্জিত হয়েছে, তারা হয়তো কস্মিন কালেও এই গ্রন্থের কবিতাবলি কোন দিন ইচ্ছাকৃত ভাবে পড়ে দেখেননি। অথচ এই সমস্ত সমালোচকরা সময় সুযোগ পেলেই বুদ্ধদেব বসুর ‘তরঙ্গ ও তপসিনী’ কিংবা বিষ্ণু দে’র ‘উর্বশি ও আর্টেমিস’ এর প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দেন। প্রায়শ ঐতিহ্যবোধের নিদর্শন হিসেবে তাদের আলোচনায় ব্যবহার করেন। বলা বাহুল্যঃ একধরনের উদ্দেশ্যবাদী সমালোচনার মোকবেলা ফররুখ আহমদকে বরাবরই করতে হয়েছে। যাই হোক, বেশ কয়েকদিন যাবৎ এই কাব্যগ্রন্থটি আবার পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল কবির কবিতাকে মূল্যায়ণ করার জন্য কেবল সমকালই নয়, সমকাল পরবর্তী দীর্ঘকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকতে হয়। ‘কাফেলা’র কবিতার বিষয়গত বস্তুমালা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়। আমাদের আলোচ্য বিষয় তার কবিতার ছন্দ ও প্রকরণ। এখানে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা জরুরী যে, কবিতা সাহিত্যের শাখায় এমন একটি চরমতম স্পর্শকাতর শাখা, সামান্যতম বিচ্যুতি হলে এই শিল্পের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমরা জানি যে, ফররুখ আহমদের উত্থান চল্লিশের দশকে হলেও গদ্য ছন্দের দিকে তাঁর তেমন নজর ছিলো না, বলে বহুল তথ্য প্রচলন আছে সম্ভবত তাও ঠিক নয়। আবদুল মান্নান সৈয়দের সোজাসাপ্টা মন্তব্য এই রকমÑ

“তার অর্থ এই নয় যে, ফররুখ গদ্য ছন্দ আদৌ লেখেননি। তার প্রথম দিককার কবিতাতেও গদ্য ছন্দের ব্যবহার আছে।”Ñ

এর পরে আরো চমৎকার তথ্য পাই- সেগুলো পড়া যাকÑ

“সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা “আঁধারের স্বপ্ন” গদ্য ছন্দ ও কাব্যছন্দের মিশেলে রচিত (পৌষ ১৩৪৫), মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত “ইতিহাস” আর “আজকের রাত্রি” (ফাল্গুন Ñ১৩৪৫) এবং আরো কিছু কিছু কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা। ১৯৩৮ সালেই ফররুখ গদ্য ছন্দে লিখেছেন। তবে সেই প্রথম যুগেও গদ্য ছিলো ফররুখের প্রধান অবলম্বন।”  

(“ভূমিকা অংশ” : ‘ফররুখ আহমদ রচনাবলী-২য় খ-’, প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৬ আগস্ট/ ১৪০৩, প্রকাশক : বাংলা একাডেমী, পৃ. ২০)

আমি এই মন্তব্য করলাম এই কারণেÑ আমাদের আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে বেশ কয়েকটি গদ্য কবিতা ঠাঁই পেয়েছে। তবে লক্ষণীয় আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় (প্রথম প্রকাশ Ñ ১৯৭৫) এগুলোর একটিও রাখেননি। বরং ছন্দ ভিত্তিক কয়েকটি কবিতা নিয়েছিলেন। এখন দেখা যাক, কবিতামালাতে কবি ফররুখ আহমদ কোন কোন ছন্দের আশ্রয় নিয়েছিলেন। আপাততঃ একটা দ্রুত চয়নিকা করা যাক। সেইগুলো এইরকম Ñ

১. অক্ষরবৃত্ত ( কবি এখানে সমিল ও অমিল রীতি অনুসরণ করেছিলেন) ছন্দকে কবি ফররুখ নিজের মত ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে অনেক কবি সমালোচক তার উপর জীবনানন্দ দাশের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন, বটে কিছু কিছু কবিতা সেইরকম দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে তিনি অন্যদিকে অগ্রসর হয়েছেন। এক্ষেত্রে তার বিখ্যাত “বৈশাখ” কবিতার কথা উল্লেখ করা যায়। এমনকি আট দশ মাত্রার অক্ষরবৃত্তের ব্যবহারও লক্ষ্য করেছি। আমার যতদূর ধারণা এই মাত্রার ছন্দে কবি অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ বোধ  করতেন। এই কাব্যগ্রন্থে তার প্রমাণ অহরহ পাচ্ছি।

২. কবি ফররুখ আহমদের প্রিয় ছন্দের মধ্যে একটি হলো মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। সমকালীন কবিবন্ধু ও সমালোচক সৈয়দ আলী আহসান লক্ষ্য করেছিলেন তাঁর কবিতায় শ্রুতি গ্রাহ্যময়তার (To write for hear ) প্রভাব। তবে একথা ঠিক যে , এই ছন্দ কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “সাত সাগরের মাঝি”তে যে গুরু গম্ভীর হয়ে জমাটবদ্ধ ভাবে ঝংকার তুলেছিলো, এই ‘কাফেলা’য় সেই ছন্দ একরকম কেলাসিত রূপ নিয়েছে। বলা বাহুল্যঃ এটাও কবি ফররুখের প্রতিভার আরেক উজ্জ্বল অধ্যায়। এটা ঠিক যে, এই প্রচলিত ছন্দে কবিতায় নতুন রূপ-কল্প আবিস্কার না করতে পারলেও পরীক্ষা নিরীক্ষার খুব একটা অভাব নেই। অনেক সময় মুক্তক মাত্রাবৃত্তের ব্যাপক ব্যবহারও করেছেন ।

৩. এই কাব্যগ্রন্থে গদ্যছন্দের ব্যবহার থাকলেও স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে মনে হয় ফররুখ আহমদ ক্লাসিক মানসিকতার কবি বলেই এই বাংলা আদি ছন্দের প্রতি খুব একটা লক্ষ্যপাত করেননি। তবে যে আগ্রহ ছিলোনা সেই রকম মন্তব্য করলে মানানসই হবে না। কারণ শিশু-কিশোর কবিতায় এই ছন্দের ব্যাপক ব্যহার করেছেন। তার কবিতা পড়তেই মনে হলে আসলে বিষয়বস্তুই নির্ধারণ করে দ্যায় কবিতার ছন্দ। 

এখন আমরা অগ্রসর হব এই কাব্যগ্রন্থে ছন্দের প্রয়োগটা কেমন ভাবে করলেন সেটাই দেখার ক্ষেত্রে। একগুচ্ছ উদাহরণ তুলে আনা যাক সমিল অক্ষরবৃত্তের আট দশ মাত্রার Ñ

১. এপৃথিবী পণ্যশালা-এই কি কিসসাখানির বাজার

এ-ও এক পণ্যশালা শেষহীন আলিফ লাইলার

অশেষ কাহিনী নিয়ে পড়ে আছি যুগযুগান্তর

মরুগিরি পাড়ি দিয়ে এসেছিল যত সওদাগর

চিত্রল, সোয়াত থেকে তাতার বা খরাসান থেকে

উঠের সারির মত উপত্যকা পথে এঁকেবেঁকে।

(কিসসাখানির বাজার)

অমিল অক্ষরবৃত্ত আট দশ মাত্রারÑ

১. আর একবার সূর্য। জেগে ওঠো প্রদীপ্ত গৌরবে

এ অন্ধ গুহায় আজি তোমার একান্ত প্রয়োজন

ক্ষুদ্র এ গ-ির মাঝে আকাশের উদারতা অনো।

আত্মঘাতি বৈষম্যের সর্বগ্রাসী ষড়যন্ত্রের জালে

নিজেকে অবরুদ্ধ রেখে উননাও সম হতাশ্বাশ।

(জাগো প্রদীপ্ত গৌরবে)

এই প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় পাঠকদের জানিয়ে রাখি যে, ফররুখ আহমদের কবিতাই এই ছন্দের ব্যবহার তার মহাকাব্যধর্মী কাব্যগ্রন্থ ‘হাতেম তায়ী’তে ব্যাপক দেখা যায়। তিনি এই ধারার  কবিতা সৃজনের প্রেরণা হয়তো মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও ক্ষেত্র বিশেষে অগ্রজ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের থেকে পেয়েছিলেন। বলা বাহুল্যঃ প্রথম জন কবি ছিলেন, তার অন্যতম প্রিয় কবিÑ আবার লক্ষ্যণীয় এই ধ্রুপদী   (Classic) রীতির মধ্যে রোমান্টিকতার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বাংলা কবিতায় এক অভাবনীয় কা- ঘটিয়ে ফেলেছিলেন। এছাড়া মুক্তক অক্ষরবৃত্তের ব্যবহার বেশ কয়েকটি কবিতায় দেখতে পাচ্ছি; সেগুলো “খলিফাতুল মুসলেমিন”, “মদিনার মুসাফির” ও “কাফেলা” (যেখানে তিনটি অন্তমিল ব্যবহার করা হয়েছে।) নামীয় কবিতার উল্লেখ করার মত। এটা ঠিক যে, বাংলা ছন্দের রূপান্তরের ক্ষেত্রে তিনি কোন বিপ্লবীপন্থা অনুসরণ করেননি। ক্ষেত্র বিশেষে অতীতমুখীও হয়েছেন। তবুও তার মধ্যে আমরা নানা ধরনের কৌতূহলী পরীক্ষা নিরীক্ষার বিস্তর প্রমাণ পাচ্ছি। উপরের উদাহরণের তালিকায় আমি অবশ্য কবির সনেট জাতীয় সৃজন কর্মের উল্লেখ করছি না। কারণ  পরবর্তী আলোচনার সময় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আলোকপাত করবো। আলোচনার ক্ষেত্র কিন্তু অবশ্যই অন্য ছন্দে স্পর্শ করা দরকার। আগেই বলেছি মাত্রাবৃত্ত ছন্দ কবির ছিলো অন্যতম প্রিয় ছন্দ। সময় সুযোগ পেলেই এই ছন্দের ব্যবহার ঘটিয়েছেন কবির বিখ্যাত কবিতা মালার অনেক বিখ্যাত কবিতায়। এগুলো হলো :- “সিন্দবাদ”, “সাত সাগরে মাঝি”, ‘শাহরিয়ার” ও “নিশান বরদার” এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এই ছন্দের ঘনগম্ভীর, জমাটবদ্ধ রূপ ধরা পড়েছে তার এক কথায় তা অতুলনীয়। অবশ্য চল্লিশের দশকের অনেক কবিই তাদের কবিতায় এই ছন্দকে প্রিয় মাধ্যম করেছিলেন। কবি ফররুখ আহমদ তার ব্যতিক্রম হবেন এমনটি ভাবা ঠিক নয়।

আপততঃ দুটি উদাহরণ চয়ন করছি :Ñ

 

১. কোন সন্ধ্যার বিয়াবনে আজ

থামলো কাফেলা সিপাসালার

পেরেশান পথ যাত্রীরা তুলে

তন্দ্রায় ণত উটের সারি

শৃঙ্খলিত পথে ক্লান্ত অশ্ব

মরে শ্রান্তিতে ঘোড়সওয়ার। (কোন বিয়াবানো)  

 

২. দুই মৃত্যুর মাঝখানে মোরা দাঁড়ায়েছি আজ এসে

হে মুসা কালীম! দেখ চেয়ে পিছে কারুণের বেষ্টনী

জাগে ফেরাউন নির্ভিক সম্মুখে

     পুতুল পূজার রাত শেষে এল

      আত্মপূজার রাত

    এলো কারণের আজদাহা লোভ

     নেমে এলো সংঘাত।

            আবার নতুন বেশে।

তুমি জানবেনা হে মুসা কালীম

আখেরী এ জামানাতে

দুই মৃত্যুর মাঝখানে মোরা

কেন দাঁড়িয়েছি এসে?

(দুই মৃত্যু)

 

উপরের দুটি কবিতায় ছয়মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ব্যবহার হয়েছে। আপাততঃ দৃষ্টিতে এটাকে ম্যানারিজম মনে হলেও-একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবেÑ প্রথম কবতিায়Ñতিনটা অন্তমিলের (সিপহাসালার, উটের সার, ও ঘোড়সওয়ার) ব্যবহার কবিতাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। কবিতার রূপকল্পও প্রকরণ নিয়ে কবি ফররুখ কতটা ভাবতেন, এই দুটি কবিতা তার উজ্জল উদাহরণ। দ্বিতীয় কবিতাতেও দেখা যাচ্ছে একই অন্তমিল গীতিকবিতার মত ঘুরে ফিরে আসছে প্রশ্ন বোধক হয়ে। যেমন- “দুই মৃত্যুর মাঝখানে মোরা কেন দাঁড়িয়েছে এসে?” বলা বাহুল্যঃ এই রীতি কবিতাটিকে রীতিমত সুখপাঠ্য করে তুলেছে। কারণ এই অন্তমিল পর্বে কোন মিল নেই। যেমন- “সম্মুখে জামানাতে।” আর এই রকম প্রয়োগরীতি একজন ছন্দ দক্ষ কবির পক্ষেই সম্ভব। তবে একথা ঠিক যে, আধুনিক কালের তরুণ কবিরা ছন্দের এই রীতিনীতি আধুনিকতা বর্জিত রীতি বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা বোধ করেন না। যদিও চল্লিশের দশকে হুজগ উঠেছিল অন্তমিল বর্জিত কবিতা লেখার। ফররুখ সেটাকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও ছন্দ ও অন্তমিলেই বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন। যদিও এই কাব্য গ্রন্থ কয়েকটি গদ্য কবিতাও গ্রন্থিত হয়েছে। এই কবিতাগুলোর প্রত্যেকটি মূলত গদ্য ছন্দে লেখা। সেই হিসেবে পর্ব বিন্যাসও অসমান হয়ে হওয়া স্বাভাবিক। তবে এটা ঠিক যে, শেষ পর্বের কবিতাবলিতে সেই ছোঁয়া পাইনা। এখানে গদ্য কবিতা যেন নিজেই প্রাণহীন গদ্য কবিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। সত্যি বলতে কি গদ্য ছন্দের রহস্যময়তা তিনি আবিষ্কার করতে পারেনি। সেই দিক তিনি যে খুব একটা নজর দিয়েছেন- সেই রকম আমরা তথ্য পাচ্ছিনা। যদিও তিনি “হাবেদা মরুর কাহিনী” নামে যে কাব্যগ্রন্থ সূচনা করেছেন, যার পুরোটাই আবর্তিত হয়েছে গদ্য ছন্দে। তবুও কোন কোন কবিতার পঙ্তিমালা হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। যখন পড়ি Ñ

আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস

সে তো অগনিত মুজাহিদের

অনমনীয় সংগ্রামের ইতিহাস।

আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস 

নিযুত লক্ষ শহীদের রক্ত বন্যার স্মরণে-

আমরা এক নতুন মিনার গড়ে তুলি।

(নতুন মিনার)

আগেই উল্লেখ করেছি ফররুখ আহমদ প্রায়শ তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে একাধিক সনেট কবিতা গ্রন্থিত করে দিয়েছেন। রাশি রাশি সনেট লিখেছেন। তাঁর কলেজ শিক্ষক প্রখ্যাত উপন্যাসিক ও সমালোচক প্রমথনাথ বিশির হাতে তরুণ ‘শেক্সপীয়র ফররুখ আহমদ” এর আবিস্কারের ঘটনা এখন রীতিমত কিংবদন্তী। তার অপ্রকাশিত সনেটের সংখ্যা এখনো অনেক। আমার ব্যক্তিগত ধারণা তাঁর অগ্রজ কবি অজিত দত্তের পরেই সংখ্যাধিক্যের দিয়ে ফররুখের স্থান ইতোমধ্যে হয়তো নির্ধারিত হয়ে গেছে। সময় সুযোগ পেলেই এই সনেট প্রকরণকে কাজে লাগিয়েছেন। একথা ঠিক যে,  ফররুখ আহমদ অক্ষরবৃত্তের আট দশ মাত্রার ছন্দেই বেশি লিখেছেন। সেখানে পরীক্ষা নিরীক্ষা কম বলেই মনে হয়েছে। কিছু সমালোচক এই অভিযোগ করলেও বিষয়টি আমাদের এখন জরুরী ভাবে ভেবে দেখা দরকার। পাশাপাশি আমাদের আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে যে সমস্ত সনেট পাচ্ছি- সেগুলো তার শ্রেষ্ঠ সৃজনশীলতার অংশই হয়ে গেছে। কারণ প্রয়াত আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত “শ্রেষ্ঠ কবিতা”য় (প্রথম প্রকাশ-১৯৭৫, জুন) বেশ কয়েকটির ঠাঁই মিলেছে, সেগুলো হলো :

১. ঈদের স্বপ্ন, 

২. পদ্মা, 

৩. আরিচা পারঘাট, 

৪. ঝড় উল্লেখ্য।

এর বাইরেও “ ‘চতুর্দশপদী (ফররুখ আহমদের কবিতার নামকরণ দেখে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ফররুখ তার প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মত সনেটকে চতুর্দশপদী কবিতা বলতে ভালোবাসতেন।) “নয়া সড়ক” (এই সনেটকে কবি পরীক্ষামূলক ভাাবে দুই ভাগে ভাগ করেছেন।) নামীয় দুইটি সনেট কবিতা পাওয়া যাচ্ছে। এই সনেট দুটিতে শিল্পের গুনগত মান অন্যান্য সনেটের তুলনায় কম হলেও সেখানেও পুরোপুরি ফররুখীয় মুদ্রা স্বাক্ষরিত। ‘কাফেলা” ও “মঞ্জিল” নামীয় কবিতার প্রথম অংশ রীতিমত সনেট, দ্বিতীয় অংশ মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ছয়মাত্রার ছন্দে লেখা নিটোল কবিতা। ফররুখের এই রীতি অবশ্য নতুন নয়। ‘সাত সাগরের মাঝি’র অন্তর্গত “আওলাদ” কবিতার মধ্যে এই রীতির প্রয়োগ আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি।  যাই হোক, “ঝড়” , “আরিচা ঘাট” ও “বর্ষা” শিরোনামে তিনটি কবিতাই সর্বসাকুল্যে পনেরটি সনেট পাচ্ছি। প্রত্যেকটি কবিতায় শিরোনামে একটি সিকোয়েন্স দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ফররুখ আহমদ তার অগ্রজ দুই কবি বিষ্ণু দে ও জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পা-ুরিপি’র “জীবন” শীর্ষক কবিতামালার প্রকরণ অনুসরণ করেছিলেন। বলা বাহুল্যঃ এটি ছিলো ফররুখ আহমদের একটি অন্যতম প্রিয় প্রকরণ। এই সনেটগুলো কবির কোলকাতা জীবনের পর্বে রচিত হয়নি। রচিত হয়েছে ঢাকা জীবনের পর্বে। একথা স্বীকার্য যে, কোলকাতা জীবনের সৃজিত সনেটমালার যে জমাটবদ্ধতা ছিলো, এই পর্যায়ে সেই নিয়ম শৃংখলার ভেতর দেশে এক ধরনের রোমান্টিকতার মধুর ছোঁয়া স্পর্শ করেছে। আর এই সনেট মালায় স্বদেশ মৃত্তিকা ও প্রাকৃতিক রূপময়তা (কখনো রক্ষতা যেমন “ঝড়ের” সনেট গুচ্ছ) যেন নতুন ভাবে আবার জেগে উঠেছে। এই সমস্ত সনেটগুচ্ছ সৃজিত হয়েছিলো ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে। এই সালে শেষবারের মত অগ্রজ  সিদ্দিক আহমদের সাথে দেখা করতে  যান ফরিদপুরে। এসেই লিখলেন এই সমস্ত সাড়া জাগানো কবিতামালা; একটি উদাহরণ তুলে আনা যাক Ñ

বর্ষার মেঘের নীচে ছায়াচ্ছন্ন আরিচায় এসে

মনে হলো পারঘাট যেন এক নিস্প্রাণ কবরÑ

জীবনের সব চিহ্ন মুছে গেছে এখানে নিংশেষে

প্রতীক্ষার ক্ষণ তাই মনে হয় রিক্ত ক্লান্তিকর

পারে না জাগাতে আর কারো বুকে প্রাণের স্পন্দন

বিমর্ষ প্রকৃতি মেঘ গতিহীন সময় মন্থর

(আরিচা পারঘাট)

কবি ফররুখ আহমদ এখানে বহুল প্রচলিত আট/ দশ মাত্রার ছন্দে লিখেছেন। এই রীতির বাইরে তাঁর খুব একটা সনেট দেখা যায় না। তবে শেক্সপীরিয়ান ও পেত্রাকীয় দুই রীতিতেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে এখানে একটি প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক সেটি হলো এই যে, আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে স্বরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহার কেন নেই? এটা নিয়ে আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনেক ভাবনা চিন্তা করেছি। উত্তর যে যথাযথ পেয়েছি তা নয়। কারণ ফররুখ আহমদ যে স্বরবৃত্ত ছন্দে কবিতা লিখেননি বললে ভুল বলা হবে। তবে সম্ভবত এর কারণ দুটি হতে পারে। 

প্রথমত, তাঁর কবিতার বিষয় বস্তুর ভাব সম্ভবত এই ছন্দের জন্য অনুকূল ছিলো না। দ্বিতীয়ত, ক্লাসিক কবিদের জন্য মূলতঃ অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দই যথাযথ প্রেক্ষাপট তৈরি করে থাকে। অন্য কোন ছন্দে সুবিধা করা যায় না। তাঁর সামনে উদাহরণ হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাংলা কবিতার প্রেক্ষাপটে স্বরবৃত্ত ছন্দের এক ধরনের বিস্ময়। তবে শেষাবধি লক্ষণীয় যে, এই কাব্য গ্রন্থের বিশিষ্ট দিক হলো অতীতের তুলনায় ফররুখের এই কাব্যগ্রন্থ-বহুল আলোচিত আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার বেশ কম হয়েছে। সুতরাং প্রচলিত শব্দের এই প্রয়োগ প্রমাণ করে ফররুখ আহমদ বড় কবি বলেই, কেবলমাত্র একই ধরনের কাব্য ভাষার উপর নির্ভর করে তাঁর সৃজনশীলতা অব্যাহত রাখেননি। আর আধুনিক কবি বলেই আধুনিকতা বিবর্জিত কোন ভাষা তিনি আমদানী করেননি। আরবি-ফারসি যা ব্যবহার করেছেন, তা প্রয়োগগুণে অতুলনীয় হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আর এই পঙ্তিমালা (আরবি-ফারসি শব্দ বর্জিত) যখন পড়ি, তখন মনটা শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়ে Ñ

দূরন্ত চঞ্চল নদী, প্রান্তবন্ত পাথরের ঢলে 

কূলে কূলে পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ কানায় কানায়।

অবাধ, উদ্দাম, গতি দূর দিগন্তের পথে চলেÑ

 

নিশান্তের তীরে এসে বিহঙ্গম উন্মুক্ত ডানায়Ñ

জীবনের আমন্ত্রণে ভেসে যায় আকাশে যেমন

এ জীবন্ত নদী চলে তেমনি সিন্ধুর ঠিকানায়।

(বর্ষায়- ৪ নং সনেট)  

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ