রবিবার ২৯ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

‘ঐ নূতনের কেতন উড়ে’

মোহাম্মদ সফিউল হক : বাংলাদেশ এক রূপময় দেশ। ফুল-ফলে শোভিত দৃষ্টিনন্দন এর প্রকৃতি। এখানে দোয়েল-কোয়েল মুখরিত করে রাখে সারাবেলা। আছে টলটলে জলের পদ্মপুকুর আর অবিরাম ঝর্ণাধারা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ হলো রূপের রাণী। এই রূপের রাণী ছয়বার পরিবর্তন হয় বিভিন্ন রূপে। বৈশাখ পুরাতনের বিদায় দেয়। আনে নতুন কাব্য। বৈশাখ আসে ঝড় নিয়ে। তাই বৈশাখ সাহসী, ক্ষ্যাপা, বৈরী, অশান্ত, অসীম, মারমুখো, নির্দয়। কিন্তু তার সৃজনক্ষমতা শিল্পীর সুনিপুন সৌকর্যকে হার মানায়। তার নতুন সৃষ্টি প্রকৃতির সকল পারক্ষমকে হার মানায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখকে আহবান করেন এভাবে- ‘এসো হে বৈশাখ! /এসো এসো, তাপস নিঃশ্বাস বায়ে...।’  কবি নজরুল বৈশাখের এমনই আজব রূপ দিয়েছেন -“কাল-বৈশাখি আসিলে হেথায় ভাঙ্গিয়া পড়িত কোন সকাল,/ঘুণ-ধরা বাঁশে ঠেকা দেয়া ঐ সনাতন দাওয়া, ভগ্ন চাল।/এলে হেথা কাল-বৈশাখি/ মরা গাঙে যেত বান ডাকি/বদ্ধ জাঙ্গাল যাইত ভাঙিয়া, দুলিত এ দেশ টালমাটাল।”

বৈশাখকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। লেখায় বৈচিত্র্য এসেছে। এসেছ নতুন ধারা। কিন্তু আমাদের জাতীয় কবি সেখানে একদমই ব্যতিক্রম। তার রেখে যাওয়া বৈশাখের ছন্দমালা এখনো দুলে বাতাসের ভেলায়। শিশুর কচি ঠোটে কিংবা গাঁয়ের কৃষকের ধানকাটা ব্যস্ত মুখে। নজরুল ছিলেন বৈশাখের প্রতীক। তিনি সাহিত্যে আবির্ভুত হয়েছেন কালবৈশাখীর মতো। তার বিদ্রোহী কবিতায় আমরা সেটাই দেখি বারবার- “আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকালবৈশাখীর।/ আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী সূত-বিশ্ব বিধাত্রির।”

কোন ঋতু যেমন স্থায়ী নয়, তেমনি দুঃখময় সময়ও স্থায়ী নয়। যখন ঝড় আসে, তখন সে সব কিছু ভেঙ্গে চুরে তছনছ করে দিয়ে যায় তার দূর্দান্ত গতি ও প্রচন্ডতা দ্বারা। এজন্যই ঝড় ধবংসের প্রতীক। কিন্তু সেই ধবংসই আবার সৃষ্টির সম্ভাবনাকে ত্বরান্নিত করে। কবিগুরু তাই ‘ক্লান্ত বরষের সর্বশেষ গান’ এ ঝড়কে আহবান করে বলে উঠেন-"গাও গান, প্রাণ ভরা ঝড়ের মতন ধ্রুব বেগে

“অশান্ত আকাশে।/উড়ে যাক, দূরে যাক বিবর্ণ বিশীর্ণ জীর্ণ পাতা বিপুল নিঃশ্বাসে”। কবিগুরু নতুনকে আমন্ত্রণ জানান কালবৈশাখীকে - “আনন্দে আতঙ্কে নিশি নন্দনে উল্লাসে গরজিয়া/মত্ত হাহা রবে/ঝার সঞ্জীব বাধ উন্মাদিনী কালবৈশাখীর/নৃত্য হোক তবে।”

‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় নজরুল বলেন- “ধবংস দেখে ভয় কেন তোর ? প্রলয় নুতন সৃজন বেদন/

আসছে নবীন জীবন হারা অসুন্দররে করতে ছেদন/ তাই সে এমন কেনো যেনো/ প্রলয় বয়েও আসছে হেসে মধুর হেসে/ ভেঙ্গে আবার গড়ছে জানে সে চির সুন্দর।” দ্বান্দ্বিক দর্শনে সাথে আবার তাকে বলতে দেখি -“তোরা সব জয়ধবনি কর/তোরা সব জয়ধবনি কর/ঐ নতুনের কেতন উড়ে কালবৈশাখীর ঝড়।”

বৈশাখের আগে আছে চৈত্র। মূলত বৈশাখি ঝড়ে চৈত্রের বাতাস অনেকটাই প্রভাব ফেলে। নজরুল চৈত্র মাস নিয়েও আবেগী ছিলেন। লিখেছেন চৈতি হাওয়া। সেখানে উঠে এসেছে বাঙলার অনন্য রূপলাবণ্য। কবুতর-বুলবুলি আর সজনে ফুলের কথা কি চমৎকার করেই না কবি লিখেছেন-” চৈতী রাতের গাইত’ গজল বুলবুলিয়ার রব/দুপুর বেলায় চবুতরায় কাঁদত কবুতর!/ ভুঁই-তারকা সুন্দরী/সজনে ফুলের দল ঝরি/থোপা থোপা লা ছড়াত দোলন-খোঁপার পর।/ ঝাজাল হাওয়ায় বাজত উদাস মাছরাঙার স্বর!”

কালবৈশাখী বলতে আমরা দুরন্ত ঝড়কেই বুঝি। কোন গতিশীল ধ্বংসাত্মক বিষয়ের উপমা দিতে তাই কবিরা উল্লেখ করেন কালবৈশাখের। নজরুল এর ‘ভাষার গান’ এ দেখি- “নাচে ঐ কালবৈশাখী/কাটাবি কাল বসে কি ?/দেরে দেখি/ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি।” আর রবীন্দ্রনাথ তার ‘পৃথিবী’ তে লিখলেন- “বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুত্ চঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে/ছিনিয়ে নিতে এল/ কালো শ্যেন পাখির মত তোমার ঝড়/সমস্ত আকাশটা ডেকে উঠল যেন/কেশর দোলা সিংহ;/ তার লেজের ঝাপটে ডালপালা আলুথালু করে/হতাশ বনস্পতি ধুলায় পড়ল উপুড় হয়ে।”

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ