বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৫টি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক

স্টাফ রিপোর্টার : প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশ কয়েকটি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার আগে এ বিতর্কিত ধারাগুলোতে সংশোধন আনার আহ্বান জনিয়েছেন তারা। অন্যদিকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো এখনও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শীঘ্রই সবার সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিশ্বমুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের বর্তমান চিত্র’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেমিনারটির আয়োজন করেন কমলওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ), বাংলাদেশ। সিজেএ এর সহসভাপতি আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।
অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, আইনটি যদি এ অবস্থায় সংসদে পাশ হয় তাহলে এটা আরও অনেকগুলো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। পাবলিক ইন্টারেস্ট ইনফরমেশন ২০১১ এ যে বিধানটা রয়েছে সেটার সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হবে। ওইখানে বলা হয়েছে- যদি কারো নিকট তথ্য থাকে যে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হচ্ছে তাহলে তথ্য পাবলিশ করার জন্য তাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। অথচ নতুন বিধানে বলা হয়েছে এই কাজটিই যদি আপনি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে করেন তাহলে আপনার শস্তি হবে। তিনি বলেন, এক আইনে বলা হচ্ছে আপনি প্রকাশ করলে কোনো সমস্যা হবে না। আবার প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বলা হচ্ছে সেটি করলেই আপনার ১৪ বছর জেল হবে। এভাবে এ আইনের ৫টি ধারা সংবিধানের তিন অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের সাংঘর্ষিক আইন আমাদের সংবিধানে অনুমোদন করে না। এসব সাংঘর্ষিক ধারাগুলোতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ূম অন্য একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে তিনি বলেন, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের সাম্প্রতিক প্রকাশিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেখা যাচ্ছে ১৮০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬। এ সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পেছনে পড়ে আছে। এ সূচকে আফগানিস্তান, নেপাল, ভূটান তো এগিয়ে আছেই, এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
তথ্যপ্রযু্ক্িত আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা এবং প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করার সময় আমাদের দেশে সাংবাদিকেরা হরহামেশা হতাহত, জেল-জুলুমের শিকার হচ্ছেন। শুধু প্রথম আলোয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ মার্চ মাস পর্যন্ত গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন একজন সাংবাদিক। বিভিন্ন ঘটনায় আহত অন্তত আটজন। জেলে গেছেন অন্তত তিনজন। গ্রেফতার ও আটক পাঁচজন। ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অপহরণ করা হয়েছে অন্তত একজনকে, অবশ্য পরবর্তিতে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এ পরিসংখ্যানে সম্পাদকদের বিরুদ্ধে মামলা-হয়রানির হিসাব উল্লেখ করা হয়নি বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, সবাই মূলত সরকারি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকদের রোষানলে পড়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংবাদ প্রকাশের কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। ব্যক্তিগত রেষারেষি বা স্থানীয় দলাদলির কারণে সাংবাদিকতার বাইরে কোনো ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এখানে ধরা হয়নি। শুধুমাত্র সাংবাদিকতার কারণে অভিযুক্ত হয়ে নির্যাতিত হওয়ার হিসাবই এখানে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অবশ্য সব খবর পত্রিকায় আসে না। আবার শুধু একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের হিসাব এটি। নির্যাতিত সাংবাদিকের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাই প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দ্বারা সাংবাদিকরা যেনো কোনোভাবে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়ে নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যদি না থাকে, তাহলে সংবাদপত্রের ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যাবে। আমরা সংবাদপত্রের কাছ থেকে সেই ভিত্তিটা চাই। আমরা চাই যে, কোথাও দুর্নীতি হলে, অপরাধ হলে, অনিয়ম হলে মিডিয়া তা তুলে ধরুক। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে। সেই স্বাধীনতা খর্ব হবে, এমন কোনও আইনে আমরা যাবো না।
ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই হেনস্থার শিকার হন দাবি করে মন্ত্রী বলেন, সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই হেনস্থার শিকার হন, এমনকি সাংবাদিকরাও বাদ পড়েন না। আপনারা খুব অবাক হবেন শুনলে যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আমি পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত, এমন বোধহয় কেউ বাদ পরেনি যাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য, মিথ্যাচার এমনকি ট্রল করাও হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের সমাজের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ অংশ হচ্ছে নারী এবং শিশু। আপনারা লক্ষ্য করে থাকবেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তাদের বিরুদ্ধে এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে যে, আমরা যদি তাদেরকে নিরাপদ করতে না পারি, তাহলে তাদেরকে ইন্টারনেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। আমাদের জন্য এটিও চ্যালেঞ্জ, কাউকে ইন্টারনেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না।
মিডিয়ার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে আইন নিয়ে আলোচনা করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের পরবর্তী যে স্থায়ী কমিটির সভা থাকবে, সেই সভাতে যেন মিডিয়ার প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকে, তা আমরা নিশ্চিত করবো। আমরা ইতোমধ্যে সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে কথা বলেছি, সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি, আপনারা অনুগ্রহ করে লিখিতভাবে  বক্তব্য দেন।  সেই লিখিত বক্তব্য আমরা স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করবো। স্থায়ী কমিটির বিবেচনা সাপেক্ষে এটি আবার সংসদে যাবে। সংসদে গিয়ে এটি আবার সংসদ সদস্যদের আলোচনার আওতায় পড়বে। সুতরাং আমাদের সংশোধনের জায়গাটা অনেকাংশে রয়ে গেছে। একটি জিনিস সবাইকে মাথায় রাখতে হবে যে, ডিজিটাল অপরাধ দমন করা শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব না, এই দায়িত্ব সাংবাদিকসহ এদেশের জনগণের। ডিজিটাল যুগে মানুষ যাতে নিরাপদে বসবাস করে, সেটি নিশ্চিত করাও কিন্তু আমাদের সবার দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে  বক্তব্য রাখেন সিজিএ’র কোষাধ্যক্ষ চপল বাসার, এমআরডিআই’র নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান প্রমূখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ