বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

মিয়ানমারের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথে ইইউ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুড়িয়ে দেয়া রোগিঙ্গাদের একটি গ্রাম

২৬ এপ্রিল, রয়টার্স : চলতি সপ্তাহে মিয়ানমারের ওপর আরোপিত অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরও এক বছর বাড়াতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), এরপর দেশটির আরও কয়েকজন জেনারেলের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করতে পারে। ইইউয়ের কূটনীতিক ও কর্মকর্তারা এসব কথা জানিয়েছেন বলে খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা। গত বছর দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে চালানো সামরিক অভিযানে ‘গুরুতর ও পদ্ধতিগতভাবে’ মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য মিয়ানমারকে অভিযুক্ত করেছে ইইউ। ওই অভিযানের কারণে মিয়ানমারের ওই অঞ্চলটি থেকে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। ইইউয়ের চলতি অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ এই এপ্রিলেই শেষ হতে যাচ্ছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরও এক বছর বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন ইইউয়ের কূটনীতিক ও কর্মকর্তারা।

ইতোমধ্যেই সীমিত করে আনা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণও এই বর্ধিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে বলে জানিয়েছেন তারা।উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে চালানো সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে গত অক্টোবরে মিয়ানমারের জেনারেলদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইইউ। রাখাইনের ওই সামরিক অভিযানকে জাতিগত নির্মূল অভিযান অভিহিত করে এর নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। অপরদিকে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। ইইউয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের জেনারেলদের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ জব্দের মতো বিষয় থাকতে পারে। মে অথবা জুন মাসের মধ্যে এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে এবং নিষেধাজ্ঞার তালিকায় মিয়ানমারের মেজর জেনারেল মং মং সোসহ আরো কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার নাম আছে।রাখাইনের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো দমনপীড়নের জন্য মেজর জেনারেল মং মং সোকে দায়ী করে গত ডিসেম্বরে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাখাইনের ইন দিন গ্রামে ১০ রোহিঙ্গা মুসলিম পুরুষ ও বালককে রাখাইনের বৌদ্ধ গ্রামবাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে অথবা নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে, রয়টার্স এমন প্রতিবেদনে প্রকাশ করার পর ফেব্রুয়ারিতে কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।ইন দিনের ওই হত্যাকা- রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর চালানো বড় ধরনের দমনাভিযানেরই অংশ। ইন দিনের ওই ঘটনার ওপর প্রতিবেদন করাকালে রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে কারাগারে পাঠায় মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ। মিয়ানমারের সরকারি গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের দায়ে ইয়াঙ্গুনের কারাগারে বন্দি এই দুই সাংবাদিকের সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদ- হতে পারে।

এদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর মিয়ানমারের নৃশংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থাকে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে ১ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পুরুষ ও নারীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিচালিত হত্যা, ধর্ষণ, মারধর ও সম্ভাব্য অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও অপরাধ বিষয়ে ২০ জন বিশেষজ্ঞ তদন্তকারী এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এই বছর মার্চ ও এপ্রিলে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তদন্তের কথা স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মিয়ানমার সরকার ও নিরাপত্তাবাহিনীর উচিত দেশটির সব মানুষের মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। যারা এটা করতে ব্যর্থ হয় তাদের জবাবদিহীতার মধ্যে রাখা। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তকারীদের সংগৃহীত তথ্যগুলো ওয়াশিংটনে বিশ্লেষণ করা হবে এবং প্রতিবেদন আকারে আগামী মে অথবা জুন মাসের প্রথম দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করবে কিনা কিংবা মিয়ানমার সরকারের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ অথবা আন্তর্জাতিক বিচারের সুপারিশ করতে ব্যবহৃত হবে কিনা তা পরিষ্কারভাবে জানানো হয়নি।

তদন্তকারীদের ব্যবহৃত নথিতে বলা হয়েছে, ‘এই তদন্তের উদ্দেশ্য হচ্ছে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সমর্থন চেষ্টা এবং সামাজিক ভিত্তিক সংশোধন চেষ্টাসহ বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া যা তদন্ত, সত্য অন্বেষণ চেষ্টা অথবা বিচার ও দায় আরোপের অন্যান্য চেষ্টা।’ ২০০৪ সালে সুদানের দারফুর অঞ্চলে গণনিপীড়ন তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র যে ফরেনসিক তদন্ত চালিয়েছিল সেই পদ্ধতি অনুসরণ করেই তদন্ত চালানো হচ্ছে। সুদানের তদন্তের সময় যুক্তরাষ্ট্র যেখানে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল বলে জানায় এবং সুদান সরকারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তদন্তে নিয়োজিত থাকা এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গাদের কাছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার তারিখ, সহিংসতার সময় তাদের অভিজ্ঞতা, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধদের ভূমিকার কথা জানতে চাওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা রোহিঙ্গাদের কাছে জানতে চান, সেনাদের উপস্থিতি ও কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা জানান, তদন্তকারীরা অপরাধীদের নাম ও পরিচয় এবং নিপীড়নের জড়িত নির্দিষ্ট ব্যটালিয়নের পরিচয় পেয়েছেন।

গতবছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। মিয়ানমার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের বাঙালি মুসলিম আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে এবারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার এক পর্যায়ে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে সেই চুক্তির পর বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও ধোঁয়াশা কাটছে না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রস্তাব করা হলেও মাত্র ৬০০ জনকে ফেরত নিতে চেয়েছে মিয়ানমার। তাদের পক্ষ থেকে প্রথম রোহিঙ্গা পরিবার ফেরত নেয়ার দাবি করা হলেও ওই দাবি সাজানো বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ