বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

শাস্তি পায়নি দোষিরা নিষ্পত্তি হয়নি ক্ষতিপূরণ মামলা

সংগ্রাম রিপোর্ট : আজ ২৪ এপ্রিল। দেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েক হাজার শ্রমিক। ভয়াবহ দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পূর্ণ হলেও আজও এর সাথে জড়িতদের বিচার কাজ সম্পন্ন হয়নি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণও পাননি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবাররা। নিষ্পত্তি হয়নি ক্ষতিপূরণ মামলাও। অথচ সেই শ্রমিকদের রক্তে আজ অনেকটা সুসংহত হয়েছে পোশাক শিল্প।
পোশাক কারখানার শ্রমিকরা প্রতিদিনের মতো ওই দিন সকাল ৮টায় হাজির হন নিজ নিজ কর্মস্থলে। উৎপাদনও শুরু হয় নির্ধারিত সময়ে। হঠাৎ সাড়ে ৯টার দিকে বিকট শব্দ। আশপাশে উড়তে থাকে ধুলো-বালি। ধসে পড়ে রানা প্লাজা। শুরু হয় আহত শ্রমিকদের আহাজারি। উদ্ধারে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন সেনা ও নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। চলে বিরতিহীন উদ্ধার অভিযান। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে সেখানে থাকা ৫টি তৈরি পোশাক কারখানার ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক নিহত হন৷ ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে গুরুতর আহত ও পঙ্গু হন কয়েক হাজার শ্রমিক৷ রানা প্লাজার প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান, দ্বিতীয় তলায় ছিল দোকান আর ব্যাংক, তৃতীয় তলায় নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড ও ফ্যানটম ট্যাক লিমিটেড, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ইথারটেক্স লিমিটেড গার্মেন্টস।
রানা প্লাজা ধসের পাঁচ বছর পরও শ্রমিকদের প্রায় অর্ধেক বেকার৷ পঙ্গুত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন৷ তাদের ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের সমন্বিত কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি৷
অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রানাপ্লাজা দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৪২.৪ শতাংশ এখনো বেকার৷ তারা এখনো কোনো কাজ পায়নি৷ আর কাজ না থাকায় তারা এখন মানবেতর জীবন যাবন করছেন৷ সহায়তার নামে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে যে সামান্য অর্থ পেয়েছেন তাতে চিকিৎসা চালানোই কঠিন ছিল৷ এ ব্যাপারে অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, এরা সবাই নিঃস্ব হয়ে গেছেন৷ কেউ তাদের শেষ সম্বল দুই-তিন শতক জমি অথবা বসতবাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন৷ অনেকেই দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন৷ কেন তারা কাজ পাচ্ছেন না? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আহতদের কেউ কেউ পুরোপুরি কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো ট্রমায় আক্রান্ত৷ পোশাক কারখানায় কাজ করতে গেলে ভয় পান৷ আবার কেউ কাজ করতে সক্ষম হলেও কারখানাগুলো তাদের কাজ দিতে চায় না৷ বিচ্ছিন্নভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা এনজিও তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করলেও সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেই৷ ফলে ওই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ তেমন কাজে আসছে না৷
রানা প্লাজা' শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের ১৩.১ শতাংশের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে৷ ৩০.৮ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক নয়৷
রানা প্লাজা ধসে নিহতদের পরিবার এবং আহত ১ হাজার ৪০৩ জন শ্রমিক এবং নিহত শ্রমিকের পরিবারের ৬০৭ জনের ওপর এক পর্যক্ষেণ করে অ্যাকশন এইড জানান, আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৪২.২ শতাংশ এখনো বেকার৷ কাজে যুক্ত হয়েছেন ৫৭ শতাংশ শ্রমিক৷ এছাড়া ২৬ শতাংশ শ্রমিক পরিকল্পনার অভাবে কোনো কাজে যুক্ত হতে পারছেন না৷ রানা প্লাজার অনেক শ্রমিকের এখানো খোঁজ মেলেনি৷ শ্রম মন্ত্রণালয়ের দেয়া তালিকায় নিখোঁজের সংখ্যা বলা হয়েছে, ৩৭৯ জন৷ তাদের মধ্য থেকে দুই দফা ডিএনএ টেস্টে ১৯৯ জনের পরিচয় মিলেছে৷ এখনো নিখোঁজ ১৬২ জন শ্রমিক৷
এখনও ক্ষতিপূরণ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সুরাহা হয়নি৷ হতাহতদের ক্ষতিপূরণের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে মিলে আইএলওর নেতৃত্বে ৩০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷ সেখানে ২৪ মিলিয়ন ডলার জমা পড়েছে৷ ৫ হাজার আবেদনের মধ্য থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য বাছাই করা হয়েছে ২৯০৯ জনকে৷ তাদের আংশিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে৷ প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে দেয়া ২২ কোটি টাকার অনুদানও এই তহবিলের আওতায় ধরা হয়েছে৷
রানা প্লাজা শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ছিল শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব-ইতিহাসেরই অন্যতম ভয়াবহ শিল্প-দুর্ঘটনা। কিন্তু একে কেন্দ্র করে করা মামলাগুলোর একটি ছাড়া বাকি কোনটিরই আজও নিষ্পত্তি হয়নি। এ ঘটনার পর মামলা হয়েছে মোট ১৪টি। এর মধ্যে রয়েছে অবহেলা-জনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশের মামলা, রাজউকের করা ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন এবং নিহত একজন পোশাক শ্রমিকের স্ত্রীর দায়ের করা খুনের মামলা।
লিগাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের আইন শাখার উপপরিচালক মোঃ বরকত আলী বলন, এসব মামলার কোনটিরই চূড়ান্ত ফল আসেনি। তবে দুদকের মামলায় সাজা হয়েছে যদিও সেটি ছিল ভিন্ন মামলা। মূলত সব মামলার প্রায় আসামীরা একই। অর্থাৎ একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিলো ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে। এখন শ্রম আদালতে ১১টি মামলা বিচারাধীন আছে। বিচারিক আদালতে ফৌজদারি মামলা ও ক্ষতিপূরণের মামলাও বিচারাধীন।
দুর্ঘটনার পরপরই 'অবহেলা জনিত' মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেছিলো সাভার থানা পুলিশ, যাতে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও ওই ভবনের থাকা পোশাক কারখানার মালিকসহ ২১ জনকে আসামী করা হয়৷ আর ইমারত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সোহেল রানা ও তার পিতা সহ মোট আসামীর সংখ্যা ১৮ জন।
জানা যায়, সোহেল রানার মালিকানাধীন রানা প্লাজার ভূমি, রানা টাওয়ারের ভূমি ও ধামরাইয়ের রানা ব্রিকসের জমি সরকার দখলে নিয়েছে। আদালতের নির্দেশে রানা মালিকানাধীন সকল ভূমি বাজেয়াপ্ত করে ঢাকা জেলা প্রশাসক দখল বুঝে নেয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ড্রাষ্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের আশুলিয়া থানার সভাপতি মো. ইব্রাহিম বলেন, রানা প্লাজার অনেক শ্রমিক এখনও ক্ষতিপূরণ পায়নি। তাদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ ছাড়া সরকার সোহেল রানার যেসব সম্পত্তি জব্দ করেছে সে সব নিহত ও আহত পরিবারের মাঝে বণ্টন করে দিতে হবে।
রানা প্লাজা ধসের জন্য সে সময় স্থানীয় প্রশাসনের গাফিলতিকেই দায়ি করছিল সুশীল সমাজ ও আহত শ্রমিকরা। তাদের দাবি ছিল,ভবনটি ধসের ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগেই ফাটল দেখা দিয়েছিল ৪ ও ৫ তলার কয়েকটি পিলারে। যা দেখে শ্রমিকরা কর্মস্থল থেকে নেমে আসে মহাসড়কে। এমন সংবাদের পর সেখানে ছুটে যান স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। তখন যদি ভবনটি খালি করা হতো তা হলে ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনা নাও ঘটতে পারতো।
সম্প্রতি ‘মৃতদের স্মরণ করো, জীবিতদের জন্য লড়াই করো’ এই শ্লোগানকে ধারণ করে সাভারে রানা প্লাজার সামনে ‘স্মৃতি কাঁথা ও কথা’ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হাজারো প্রাণ ও স্বপ্ন হত্যার ৫ বছর পুর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ প্রদর্শনী করেন নিহত, আহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনরা।
নিহত শ্রমিকদের ছবি কাপড়ে বসিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরাই তৈরি করেছেন ‘স্মৃতি কাঁথা’। একই সাথে নিজ হাতে পরিবারের নিহত সদস্যদের নিয়ে ছোট ছোট রুমালে লিখেছেন নিজেদের মনের নানা কথা। এসব কথায় লুকিয়ে আছে হারানো আপজনের জন্য আকুতি।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পায়নি এমন কেউ নেই। আমাদের তহবিলে টাকা আছে কেউ নিতে আসে না। রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্ত কোন শ্রমিক বলতে পারবে না যে তারা ক্ষতিপূরণ পায়নি। রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছিল। এ ফান্ড থেকে ২৮০ কোটি টাকা রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দেয়া হয়েছে। এখনও টাকা রয়েছে কিন্তু কেউ নিতে আসে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দুর্ঘটনা হয়। কিন্তু সেটা নিয়ে রানা প্লাজার মতো এত বেশি প্রপাগান্ডা হয় না।
আইএলওর নির্দেশনা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের সাধ্য এতোবেশি নেই। আমাদের সাধ্য অনুযায়ী আমরা দিয়েছি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর কারখানাগুলো অনেক সংস্কার করেছি। এখন বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় আমাদের কারখানাগুলো নিরাপদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ