বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সেনাবাহিনী ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না

গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজনের উদ্যোগে আসন্ন সিটি নির্বাচন : নাগরিক ভাবনা শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : সেনাবাহিনী ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে গেলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। তবে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পারলে প্রশাসনের কারচুপির অপকৌশল ব্যর্থ হবে। খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচন উপলক্ষে নাগরিক ভাবনা শীর্ষক সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের উদ্যোগে গতকাল সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনেরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন এ বৈঠকের আয়োজন করে।
সুজন সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের নির্বাহী সদস্য ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ। বক্তব্য রাখেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার অব. এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ব্যারিস্টার রুহিন ফারহান, গাজীপুরের ভোটার পাঠান আসাদ প্রমুখ।
এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রথম ধাপ হলো নির্বাচন। তবে সে নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ। বর্তমানের নির্বাচনগুলো এসব মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। এজন্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনে ইসির পাশাপাশি সরকারকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাই নির্বাচন কমিশনকে সজাগ ও সতর্ক হতে হবে। কারণ তারা ঘুমিয়ে আছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন চিন্তা ভাবনার কথা বলেছিল। তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কমিশনের এখতিয়ার বহির্ভূত। নির্বাচন কমিশন এ বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেনি, এটা দুঃখের বিষয়। কারণ নির্বাচন সুষ্ঠু করা কমিশনের দায়িত্ব। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে যা যা করা দরকার কমিশন তাই করবে এটা আমরা আশা করি।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সেনাবাহিনী ছাড়া সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না জানি না। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেনবাহিনী ছাড়া হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থান নেয়। বিরোধী দলে থাকলে তারা সেনাবাহিনী চায়। অথচ ২০০৩ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিএনপি দেয়নি। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নিষ্কলুষ নির্বাচন। ২০০৩ সালের নির্বাচনে ১শ’ ১৭ জন মারা যায়। জিনজিরায় একজনকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়। ভোটকেন্দ্রে যদি এজেন্ট ও ভোটাররা শক্তভাবে অবস্থান নিতে পারেন, তাহলে কেন্দ্র দখল কেউ করতে পারবে না। এজেন্টদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদেরকে আইনগুলো সম্পর্কে বোঝাতে ও সচেতন করতে হবে। তিনি বলেন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে সরকারি দলের কী সমস্যা? এখন আইন পরিবর্তন করার বিষয়ে কোনো ধরণের ইনটেনশন আছে কি-না সেটাও দেখতে হবে। রাতের বেলায় বুথে ব্যালেট পেপার ভরে রাখা আমাদের একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচন কমিশন নিজের অফিসারকে রিটার্নিং অফিসার বানিয়েছে, এটা খুব ভালো লক্ষণ। কিন্তু এই রিটার্নিং অফিসারের কাছে সব ক্ষমতা থাকতে হবে। ক্ষমতা কিছুটা জেলা প্রশাসক, কিছুটা কমিশনের কাছে থাকলে আসন্ন সিটি নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা কমিশনের আছে। কমিশন যদি মনে করে নির্বাচন নিয়ে সংশয় আছে তাহলে সে বাতিল করতে পারে। অভিযোগ হলো পত্রিকায় টেলিভিশনে অভিযোগ আসলেও কমিশন বলে কই আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ আসে নাই। সংবাদ মাধ্যম নির্বাচন কমিশনের একটি সোর্স। মিডিয়া অনেক শক্তিশালী একটি সহযোগী নির্বাচন কমিশনের জন্য। সেখানে যদি বলা হয়, আমাকে কোনও কমপ্লেইন করা হয়নি- তাহলে আপনাকে কী ক্ষমতা দেওয়া হলো? সেই ক্ষমতা আপনাদের দেখা উচিত। আমাদের কাছে কেউ কমপ্লেইন নিয়ে আসবে এ জন্য আমরা বসে থাকিনি। পরের দিন খবরের কাগজে দেখেছি, আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। চেষ্টা করেছি তদন্ত করার। তদন্ত রিপোর্ট অভিযোগকারীকে সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয় বাস্তবায়ন করার জন্য কোনও আইন সংশোধনের প্রয়োজন নাই। কেন মানুষ বিমুখ হয় নির্বাচন থেকে ? একের পর এক নির্বাচনে যদি একটি মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ না পায় তাহলে সে অবশ্যই নির্বাচন বিমুখ হবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে তাই হয়েছে। এখন বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোক মনে করে ভোট দিলেও কিছু হবে না, না দিলেও কিছু হবে না। রাস্তায় নামলে বলে- স্যার ভোটটা কি দিতে পারবো না-কি?  এই অবস্থা তো বাংলাদেশে ছিল না। কারচুপি শুধু বাংলাদেশে না, বহু জায়গায় আছে। দুনিয়ার সব জায়গায় হয়। যদি জনগণ মনে করে তারা ভোট কেন্দ্র পাহারা দেবে এবং ভোট কেন্দ্রে যাবে, আর দু-চার জায়গায় তা বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে কারচুপি করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে বলে আমার বিশ্বাস।
মূল প্রবন্ধে ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, জনগণ কোনো রকমের ভয়-ভীতি ছাড়া মানুষ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারার নিশ্চয়তাও চায়। সিটি নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে তোফায়েল বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে গাজীপুর, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ইসির ওপর বর্তাবে। এ নির্বাচনগুলো স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অবাধে অনুষ্ঠানের ওপর আগামী জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ নির্ভর করবে।
সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুরের সিটি নির্বাচন ছাড়া বাকি নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন তোফায়েল। বলেন, আমাদের দেশে নির্বাচনে ‘ক্ষমতা ভীতি’একটি ‘হিস্টিরিয়া’বা ‘ফোবিয়া’হিসেবে সর্বগ্রাসীরূপ নিয়েছে। জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচন এলেই জনমনে প্রথম ভীতি বা আশঙ্কা দেখা দেয়- সরকার বা সরকারি দলের অনুকূলে নির্বাচনী ফলাফলকে নেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হতে পারে।  এটি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্রের জন্যই তা জরুরি।
তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দীর্ঘ দিন ধরে স্থবিরতা চলছে। এখানে বহুমুখী সংস্কারের প্রয়োজন। এসব সংস্কারের ভাবনা আজকাল আর আলোচনা হয় না। শুধু নির্বাচনকালীন নির্বাচনকে ঘিরেই যত সব আলোচনা। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবন্থাকে কার্যকর করার বিষয়টি অবহেলিতই থেকে যায়। তিনি বলেন, আজ ভোটারদের মাঝে উদাসিনতা দেখা দিয়েছে। গণউদাসীনতাই সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বড় বাধা। গণ উদাসিনতা কাটিয়ে ভোট কেন্দ্রে ব্যাপকভাবে গণজোয়ার সৃষ্টি করলে প্রশাসন বা যারা কারচুপির ফাঁদ পাতে তাদের অপকৌশল ব্যর্থ হবে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে না তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে লিখিতভাবে প্রতিবেদন এবং যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে তাদের জন্য প্রশংসাপত্র থাকা উচিত। যা তাদের নিজ নিজ চাকরির ব্যক্তিগত নথিপত্রে সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যতে পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
এছাড়া আরও বলা হয়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন সমাপ্তির অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত নির্বাচন সংক্রান্ত নানা ধরনের অভিযোগ গ্রহণ এবং তা প্রতিকারের একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করা উচিত। নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণের একটি সুষ্ঠু পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। মনোনয়ন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বাণিজ্যমুক্তকরণ এবং দলের স্থানীয় সংগঠনের মতামতকে গণতান্ত্রিকভাবে বিবেচনার যেই সুযোগ আইন করে দিয়েছে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শণ করা দরকার। উপর থেকে প্রার্থী চাপানোর প্রবণতা বন্ধ করা হোক।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে হওয়ায় গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন অনেক বার্তা বহন করবে। কারণ এই দুটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না এবং নির্বাচনে কারা জয়লাভ করবে সেদিকে দেশবাসীর নজর থাকবে।
খালেকুজ্জামান বলেন, এসবকে এখন স্থানীয় সরকার বলা যাবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের সম্প্রসারিত কাঠামো। আজ নির্বাচিত মেয়র, কাউন্সিলর মিলে তিন শতাধিক জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হয়ে আছে। আইনি কোনো শাস্তিপ্রাপ্ত নয় তারা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সচিবের একটি চিঠিতে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ফলে এটাকে স্থানীয় সরকার বলা যায় না। তাই উচিত হবে এখানে আমলাদের নিয়োগ দেয়া। স্থানীয় সরকারকে তার নিজস্ব রূপে নেওয়া জরুরি।
প্রার্থীদের হলফনামায় মিথ্যা তথ্য ও অনুপার্জিত সম্পত্তি পাওয়া গেলে প্রার্থিতা বাতিলের পাশাপাশি ওই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আইন করার দাবি জানান তিনি।
হাই কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও নির্বাচিতরা স্বাধীনেভাবে কাজ করতে পারেন না। রাজশাহী ও গাজীপুরের নির্বাচিত মেয়রদের দিতে তাকালেই বোঝা যায়।
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, মানুষ নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। এখন কেউ ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে চায় না। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ। ভোটাররা আগে অনুমান করতে পারে কে নির্বাচনে জিতবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ