মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কয়লার রাসায়নিক ছড়িয়ে জীববৈচিত্র্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা

খুলনা অফিস : সুন্দরবনের পশুর চ্যানেলে হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে ডুবে যাওয়া কয়লাবোঝাই কার্গো উদ্ধার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কার্গোটি উদ্ধারে মালিক পক্ষের কোনো প্রকার তৎপরতাই নাই বলে জানিয়েছে সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগ। মালিকপক্ষ বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও গত চার দিনেও উদ্ধার কাজে অংশ নেয়নি। মালিক পক্ষের এ ধরণের আচরণে ক্ষুব্ধ বনবিভাগ। সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগ মালিক পক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পেয়ে বিআইডব্লিউটিএ খুলনা-এর কাছে কার্গোর তথ্য চেয়ে পত্র পাঠিয়েছে। অপরদিকে কার্গো কর্তৃপক্ষ ও সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের করা তিনটি সাধারণ ডায়েরির তদন্ত শুরু করেছে মংলা থানা পুলিশ।

সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহামুদুল হাসান জানান, বনবিভাগের পক্ষ থেকে চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামরুল হাসান তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্গো কর্তৃপক্ষের আচরণে পরিলক্ষিত হয় যে ডুবে যাওয়া কার্গোর ফিটনেস ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তারা কার্গোর কাগজপত্র সরবরাহ করতে পারেনি। কার্গো উদ্ধারের ব্যাপারেও তাদের কোনো তৎপরতা নেই।

তিনি জানান, কার্গো কর্তৃপক্ষ বনবিভাগকে কোন প্রকার সহযোগিতাই করছে না। ফলে বুধবার ডুবে যাওয়া কার্গোর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে বিআইডব্লিউটিএ খুলনা-এর কাছে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে কার্গো সম্পর্কিত কাগজপত্র বা তথ্য পেলেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা কার্গো ডুবির ঘটনায় বনবিভাগ, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও লাইটার কার্গো মালিকপক্ষের করা তিনটি সাধারণ ডায়েরির তদন্ত শুরু করেছি। মংলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তুহিন ম-লকে এ তদন্তভার অর্পণ করা হয়েছে।’ ওসি জানান, ডায়েরিতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের কয়লাডুবিতে এক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা, বনবিভাগ এবং কার্গো মালিক পক্ষ শুধু দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে।

ডুবে যাওয়া কার্গো উদ্ধারের অগ্রগতির ব্যাপারে জানতে চেয়ে এমভি বিলাসের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) লালন হাওলাদারকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি ফোনটি কেটে দেন।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চার দিন ধরে পানিতে ভিজে থাকায় কয়লায় থাকা রাসায়নিক পদার্থ এরই মধ্যে পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে গেছে। এখন কয়লা তোলা হলেও এর রাসায়নিক পদার্থগুলো পানি ও মাটিতেই থেকে যাবে। পানির মাধ্যমে তা ছড়াতে থাকবে চারপাশে। এতে আক্রান্ত হবে নদীর জলজ প্রাণী, তা সেগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে মানুষের মধ্যেও।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘কয়লায় প্রচুর পরিমাণে সীসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও আর্সেনিক থাকে। এগুলো মানুষ ও প্রাণীর শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ফলে এসব রাসায়নিক পদার্থে আক্রান্ত হবে মাছসহ জলজ প্রাণী। সেগুলো থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষও। তাছাড়া, এসব পদার্থ মাটিতে মিশে মাটির গুণাগুণ নষ্ট করবে। এতে অঙ্কুরোদগম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ক্ষতি অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে তেলবাহী জাহাজ ডুবেছে সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে। সেই তেল ছিল ভাসমান। তবে কয়লার রাসায়নিক পদার্থ পানি-মাটি সবখানে মিশে যাবে এবং ছড়িয়ে পড়বে।’

সুন্দরবনে কয়লার বিষাক্ত উপাদানের ক্ষতির প্রভাব সম্পর্কে এই অধ্যাপক বলেন, ‘হারবাড়িয়া এলাকা ইরাবতী ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্র। কুমিরের প্রজননেরও সময় এটা। ফলে কয়লার বিষাক্ত রাসায়নিকের কারণে ডলফিন ও কুমিরের জীবনচক্র ব্যাহত হতে পারে। অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজননও হুমকিতে পড়বে। একইসঙ্গে মাছসহ অন্যান্য প্রাণী ভেতর থেকে আক্রান্ত হবে। এভাবে এই বিষ যুক্ত হয়ে পড়বে খাদ্যচক্রে।’

কেবল প্রাণীই নয়, উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে কয়লার রাসায়নিক পদার্থ। ড. আব্দুল্লাহ হারুন বলেন, ‘কয়লার বিষ মাটিতে মিশে গুণাগুণ নষ্ট করবে এবং অঙ্কুরোদগম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বংশ বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় ভ্রুন নষ্ট হবে। অনেক ক্ষেত্রে জলজ ও বনজ প্রাণী মরে পচে থাকবে। সাদা চোখে হয়তো এই প্রভাব বোঝা যাবে না, কিন্তু এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী।’

অধ্যাপক হারুন জানান, ডুবন্ত কার্গোটিতে নিম্নমানের পিট কয়লা রয়েছে। যশোরসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন ইটভাটা ও বিভিন্ন লোহার কারখানায় ব্যবহারের জন্য এগুলো আনা হয়েছিল। এই কয়লায় রয়েছে সালফার, সীসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, পারদ, নিকেল, সেলেনিয়াম, বেরিলিয়াম, রেডিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও আর্সেনিকের মতো প্রাণী ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সব পদার্থ।

সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘কয়লাসহ কার্গো ডুবে যাওয়ায় সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর অস্তিত্বসহ জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হবে। কারণ এসব কয়লায় সালফারের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, যা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ডুবন্ত নৌযানে থাকা তেল, মবিলও পানির সঙ্গে মিশে যায়। এসব পদার্থও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লাবাহী কার্গোর চলাচল বাড়বে। এর সঙ্গে এ ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়বে।’

সুন্দরবন রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান দিলিপ কুমার দত্ত বলেন, ‘মানবসৃষ্ট দুর্যোগ ঠেকাতে হবে। কয়লাসহ কার্গোডুবি প্রাকৃতিক নয়, মানবসৃষ্ট। এ ধরনের বিপদ সুন্দরবনের পিছু ছাড়ছে না।’ তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা শর্ত মানছেন না। শর্তগুলো পালন হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষেরও মনিটরিং নেই।’

এদিকে, হাড়বাড়িয়ায় কয়লাসহ কার্গো ডুবির ঘটনায় মঙ্গলবার বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রাথমিক একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে সেই প্রতিবেদনে সুন্দরবন ও এর আশপাশের পরিবেশ ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কিছু বলা হয়নি। কার্গো উদ্ধার হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শাহিন কবির।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ