শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দুদককে ঘিরে ফের সক্রিয় শক্তিশালী  প্রতারক চক্র 

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ঘিরে শক্তিশালী প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চক্রের সদস্যরা সুকৌশলে কমিশনের নাম, কর্মকর্তাদের পদ-পদবী ব্যবহার করে নানা ফন্দি ফিকিরে বিভিন্ন স্তর থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ খবর খোদ কমিশনের কাছেও আছে। কমিশনও প্রতারক চক্র থেকে বাঁচতে দেশবাসীকে নানা মাধ্যমে সর্তক করছে।

জানতে চাইলে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান জানান, সম্প্রতি কিছু প্রতারক দুদক কর্মকর্তাদের পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে দুদকের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘প্রতারক চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন স্থানে কমিশনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করছে।’ এসব প্রতারকদের আইনের আমলে আনার বিষয়ে সজেকার (সমন্বিত জেলা কার্যালয়) উপ-পরিচালকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্র জানায়, কখনো দুদকের উপ-পরিচালক, মহাপরিচালক কিংবা কখনো সচিব পরিচয় দিয়ে সরকারি বড় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান করছেন আবার অর্থের বিনিময়ে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিচ্ছেন এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা। প্রতিনিয়ত এভাবেই হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এ যেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বাইরে আর একটি কমিশন। এমনই একটি শক্তিশালী প্রতারক চক্র আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে দুদককে ঘিরে।

বিশেষ করে বর্তমান কমিশনের গ্রেপ্তার অভিযান শক্তিশালী হওয়ার পর থেকে দুদকের ওই প্রতারক চক্র দুদকের বিভিন্ন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কেউ কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

প্রতারকরা কাল্পনিক অভিযোগ বা কমিশনের বিবেচনাধীন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদানের আশ্বাস দিয়ে ও নানা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও মাঝেমধ্যেই এমন অনেক ভুয়া কর্মকর্তা দুদকের জালে ধরা পড়ছে।

গত মার্চ মাসে অবৈধ সম্পদসহ নানা দুর্নীতির ভূয়া আদেশের বেশ কিছু অভিযোগ কমিশনের নজরে এসেছে। যা নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ করছে দুদকের বিশেষ টিম।

শুধু তাই নয়, দুদকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দাবি করলে দুদক পরিচালক (পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন) মীর মো. জয়নুল আবেদিন শিবলীর টেলিফোন-৯৩৫২৫৫২ ও মোবাইল ০১৭১১৬৪৪৬৭৫ নম্বরে বিষয়টি অবহিত করার জন্য অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।

প্রতারণার বিভিন্ন অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত মার্চ মাসে গণপূর্ত বিভাগ, বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফরের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান বিষয়ে একটি মিথ্যা অফিস আদেশের কপি তৈরি করে দুদকের লোগো ব্যবহার করে সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারির কপি পাঠিয়েছিল একটি প্রতারক চক্র। ভুয়া আদেশ কপি পাঠানোর পাশাপাশি ওই প্রকৌশলীকে ফোনও করে প্রতারক চক্র। গত ২৭ মার্চ সই করা আদেশের বিষয়ে দুদকের ওই অভিযোগ আসে পরের দিন। যেখানে দুদক উপপরিচালক জহিরুল আলমের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও বর্তমান দুদকে কর্মরত এ নামে কোনো কর্মকর্তা নেই।

প্রায় একই প্রক্রিয়ায় ২১ মার্চ তারিখ উল্লেখ করা অপর এক ভূয়া আদেশে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পেকু সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ফিরোজ হাসানকে দুদকের নাম ব্যবহার করে সম্পদের হিসাব চেয়েছে আর একটি প্রতারক চক্র। দুদকের উপপরিচালক আবুল হোসেনের নাম ব্যবহার করা ওই আদেশে কাজী ফিরোজ হাসানের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে বলা হয়েছে। অধিক বিশ্বাসযোগ্যতা আনতে আরেকজন উপপরিচালক মো. শহিদুল্লাহ খানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এই নামেও দুদকে উপপরিচালক নেই বলে দুদক জানায়।

গত ১৯ মার্চ তারিখ উল্লেখ করে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রকল্প ও হাসাপাতাল ২৫০ হতে ৫০০ শয্যা উন্নতীকরণ প্রকল্পের পরিচালক প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ আলী খানকে পাঠানো হয় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আদেশ। দুদক সচিব শামসুল আরেফিনের সই ব্যবহার করে ওই ভুয়া আদেশ তৈরি করা হয়েছে। দুদক ধারণা করছে, হয়ত এ ধরনের আদেশ তৈরি করে প্রতারক চক্র বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। অথচ দুদক ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ অনুসন্ধান করেননি কোনো দিন।

এর আগে গত ১২ মার্চ মোহাম্মদ আলী খানের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিল করে নোটিশ জারি করেছিল দুদক উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন নামের ভূয়া কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে। এক্ষেত্রেও দুদক থেকে জানা যায় এই নামে কোনো উপপরিচালক দুদকে কর্মরত নেই।

দুদক উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘একাধিক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দুদকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে বা টেলিফোনের মাধ্যমে কাল্পনিক অভিযোগ অথবা কমিশনের বিবেচনাধীন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদানের আশ্বাস দিয়ে ও নানা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের কাছে অবৈধ আর্থিক সুবিধা দাবি করে। আর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ইতোপূর্বে এ ধরনের প্রতারক চক্রের একাধিক সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তার হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

প্রতারক চক্রের তৎপরতার ব্যাপারে অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে দুদক সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন লিখিত আদেশে এ বিষয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করেছেন। জনসংযোগ দপ্তরকে লিখিত আদেশে তিনি বলেছেন, দুদক বিভিন্ন সূত্রে অবহিত হয়েছে যে, একাধিক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দুদকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোন, টেলিফোন, ই-মেইল বা ব্যক্তিগতভাবে কাল্পনিক অভিযোগ করে কমিশনের বিবেচনাধীন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদানের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ও নানা প্রকার ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের নিকট অনৈতিক সুবিধা দাবি করছে।‘দুদকের নির্দশনা অনুযায়ী অনুসন্ধানকারী বা তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাক্ষী ও আসামীদেরকে লিখিত পত্র দিয়ে থাকেন। দুদকের কর্মকর্তাদের কারো সাথে মোবাইল ফোন, টেলিফোন, ই-মেইল বা ব্যক্তিগতভাবে যোগযোগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপরও যদি দুদকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দাবি করা হয় তাহলে সে বিষয়ে দুদক পরিচালক (পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন) মীর মো. জয়নুল আবেদিন শিবলীর টেলিফোন-৯৩৫২৫৫২ ও মোবাইল ফোন ০১৭১১৬৪৪৬৭৫ নম্বরে বিষয়টি অবহিত করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।                                 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ