শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ছয়টি ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী

 

স্টাফ রিপোর্টার : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ছয়টি ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী বলে জানিয়েছেন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক পরিষদ। সরকারের তিন মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন এ ধারাগুলো বাতিল কিংবা পরিবর্তন আনা হবে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

গতকাল বৃহস্পতিবার আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকের সঙ্গে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক পরিষদ বৈঠক করে এসব ধারার বিষয়ে আপত্তি তুলে ধরে।

 আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মাদ শহিদুল হক, দ্যা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, নিউজ টু ডে’র সম্পাদক রিয়াজ উদ্দীন আহমেদ, যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, দি নিউ এইজের সম্পাদক নুরুল কবির, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজাম, নয়া দিগন্তের সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদসহ বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক।

আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছেন, সম্পাদক পরিষদ ডিজিটাল আইনের যে পাঁচটি ধারার ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছেন তা যুক্তিক। তাদের দাবি আমরা বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখছি। বিষয়টি আমরা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠাবো।

তিনি আরও বলেন, আমরা এই আইন করেছি ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য। আইনটি সংসদে পেশ করা হয়েছে। এই যাচাই বাচাইয়ের জন্য বর্তমানে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আগামী ২২ এপ্রিল স্থায়ী কমিটির বৈঠক হবে। ঐ বৈঠকে আমরা সম্পাদক পরিষদকে থাকতে বলবো। সেখানে তারা তাদের বক্তব্য তুলে ধরবেন।

তিনি আরও বলেন, সেই মিটিং এ আমরা তাদের সুপারিশ লিখিত আকারে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছি। আমরা আশা করছি তারা বিষয়টি বিশেষ বিবেচনা নিবেন। আমরা এও বলতে পারি সবার সাথে আলাপ আলোচনা করেই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।

বৈঠক শেষে পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল ও দ্যা ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, গতকালের বৈঠকটি হয়েছিল সম্পাদক পরিষদের অনুরোধে। তিন মন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমি সত্যিকার অর্থে বলতে চাই উনারা সহযোগিতার স্পিরিটে আমাদের আপত্তিগুলো গ্রহণ করছেন। একইসঙ্গে এ সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কামিটির আগামী ২২ এপ্রিলের বৈঠক তারাই (তিন মন্ত্রী) উপস্থাপন করবেন যেন স্থায়ী কমিটিতে সম্পাদক পরিষদ নিয়ে আমাদের আপত্তিগুলোর বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

মাহফুজ আনাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২, এবং ৪৩ ধারায় আমাদের আপত্তি। আমরা এ ধারাগুলোকে মনে করেছি এগুলো বাক স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থি। স্বাধীন সাংবাদিকতা যেটা বাংলাদেশে আমরা খুবই গর্ববোধ করি, খুব গভীরভাবে এটা ব্যাহত হবে। এ বিষয়েগুলো আমরা মন্ত্রীদের বুঝিয়েছি এবং তারা এগুলো সানন্দে গ্রহণ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি যে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি প্রণয়ন হবে, সেটা সত্যিকার অর্থে সাইবার ক্রাইমকেই প্রতিহত করবে। সাংবাদিকতার কোনো রকম স্বাধীনতা খর্ব হবে না। আমরা এটা বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে একটা সাইবার সিকিউরিটি এ্যাক্ট প্রয়োজন। কেননা এখন যে ধরনের সাইবার ক্রাইম হচ্ছে। সোসাল মিডিয়া, অনিয়ন্ত্রীত অনলাইন মিডিয়া এমন কিছু ছাড়াই যেটা আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়ায়। তাই আইনটা হোক তবে একটা সুষ্ঠু আইন। যেটা আসলেই তার পারপাস সার্প করবে।

জানা গেছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করে সেই ধারার বিষয়বস্তুগুলো ঘুরে ফিরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাখা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হওয়ার পর এটি ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আপত্তি ওঠা কিছু ধারা বাদ দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল।

কিন্তু গত ৯ এপ্রিল সোমবার জাতীয় সংসদে আইনটি উত্থাপনের পর দেখা যায়, তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এমনকি ‘ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি’-বিষয়ক ৩২ ধারার মতো আরও কঠিন একটি ধারা জুড়ে দেয়া হয়েছে। সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বিলটিতে আপত্তি জানিয়েছে। পরে বিলটি চার সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।

প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত বা তাদের প্রতিনিধিরাও আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, দেশে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন ও ইউনিয়ন আইনটির কঠোর ও বিতর্কিত কিছু ধারা বাদ দেয়ার দাবি তোলে। এসব দাবি আমলে না নিয়ে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া খসড়াটিই প্রায় হুবহু গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করা হয়।

বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, বিলটি সংসদীয় কমিটিতে গেলে পর্যালোচনা করে সংযোজন-বিয়োজন করার সুযোগ থাকবে। কোনো উপধারা যুক্ত করতে হলে সেটিও স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সংযোজন সম্ভব হবে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ