রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

সহকর্মীর বর্ণনায় ফিলিস্তিনী সাংবাদিকের শহীদ হওয়ার ঘটনা

দাফনের আগে মুর্তজাকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখছেন সহকর্মী ও সাধারণ ফিলিস্তিনীরা

৮ এপ্রিল, আলজাজিরা, টাইমস অব ইসরাইল : বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী আর অগণিত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সমাহিত হয়েছেন ফিলিস্তিনী ভিডিও সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজা। গত শুক্রবার গাজার খান ইউনিস সীমান্ত বেড়ার কাছে ইসরাইলের সেনাবাহিনীর ছোঁড়া গুলীতে ্আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া এই সাংবাদিকের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় গাজার প্রধান মসজিদ আল ওমরাইতে। বিবিসি, আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে ছবি সরবরাহ করতেন এই সাংবাদিক। তার শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহও। তাকে সমাহিত করবার পর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের কাছে তার গুলীবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা দেন তার সঙ্গে থাকা অপর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক শাদি আল আসার।

ইসরায়েলী হুমকি অগ্রাহ্য করে ভূমি দিবস উপলক্ষে টানা ছয় সপ্তাহের কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্বে শুক্রবার গাজা সীমান্তে জড়ো হয় হাজার হাজার ফিলিস্তিনী। ইসরায়লী সেনাবাহিনী তাদের ওপর গুলী ছুঁড়লে নিহত হয় নয় ফিলিস্তিনী। ভূমি দিবসের দুই সপ্তাহের কর্মসূচিতে এই নিয়ে ৩১ ফিলিস্তিনী নিহত হলেন। শুক্রবার সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজা প্রেস লেখা জ্যাকেট পরে খান ইউনিস সীমান্তে ছবি তোলার সময় পেটে গুলীবিদ্ধ হন। পরের দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত হন তিনি। ফিলিস্তিনী সাংবাদিক সিন্ডিকেট জানিয়েছে এদিনের কর্মসূচিতে আরও ছয় ফিলিস্তিনী সাংবাদিক গুলীবিদ্ধ হয়েছেন।

স্ত্রী আর দুই বছরের সন্তান রেখে নিহত হয়েছেন সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজা। ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক শাদি আল আসার মুর্তজার গুলীবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা গার্ডিয়ানকে জানান। তিনি জানান, ইসরায়েলের সীমান্ত বেড়া থেকে কয়েকশো মিটার দূরে তার সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মুর্তজা। তবে ফিলিস্তিনী সাংবাদিক সিন্ডিকেট জানিয়েছে, ইসরায়েলের সীমান্ত বেড়া থেকে অন্তত ৩৫০ মিটার দূরে ছিলেন মুর্তজা। সেখান থেকেই আরও ভালো ছবি তোলার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনীদের পুরনো টায়ার পোড়ানোর ধোঁয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর ছোঁড়া টিয়ারগ্যাস থেকে বাঁচতে এসব টায়ার জ্বালিয়েছিল ফিলিস্তিনীরা।

শাদি আল আসার বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর দেখলাম কয়েকজন তরুণ একজনকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসছে। তখন আমি ছবি তোলার জন্য এগিয়ে গেলাম আর দেখলাম এটা আমার বন্ধু মুর্তজা।’ তিনি এবং অন্যরা মিলে তার প্রেস লেখা জ্যাকটটি খুলে পেটের বাম পাশের ক্ষতস্থানটি দেখতে পান। আসর জানান, প্রথমে ভেবেছিলাম এটা ছোটখাট কোনও ক্ষত। গুলীবিদ্ধ হওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন অপর ফিলিস্তিনী সাংবাদিক রুশদি সিরাজ। তিনি টেলিগ্রাফ ইউকে’কে জানান মুর্তজা প্রেস জ্যাকেট আর হেলমেট পরিহিত ছিল। এই জ্যাকেট দূর থেকে ভালোভাবেই দেখা যায়। এটা পরিস্কার যে তাকে তার কাজের জন্যেই গুলী করা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে করে মুর্তজাকে খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে নেওয়া হলে শনিবার ভোরেই মারা যান তিনি। ৩৫ বছরের আসার বলেন, ভালো মানুষ ছিলেন মুর্তজা, সবসময় হাসতো, ভালোবাসতো সবাইকে।  কাজের প্রতি নিবেদিত মুর্তজা সবসময়ই ভালো শটটা পেতে চাইতো। তার প্রজন্মের আরও অনেক গাজাবাসীর মতো জীবনে এই উপত্যকার বাইরে বের হবার সুযোগ পায়নি মুর্তজা।

গাজায় ড্রোন ব্যবহার করে ছবি তোলা প্রথম সাংবাদিকদের একজন মুর্তজা। আইন মিডিয়া নামে একটি টিভি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুর্তজা। বিবিসি, আল জাজিরাসহ বিভিন্ন বিদেশী সংবাদ প্রতিষ্ঠানের জন্য ছবি সরবরাহ করতেন তিনি। ড্রোনের সাহায্যে গাজা বন্দরের তোলা একটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে মুর্তজা একবার লিখেছিলেন, ভুমি থেকে নয় আকাশ থেকে এই ছবি তোলার স্বপ্ন দেখি। আমার নাম মুর্তজা, ৩০ বছর বয়স। গাজায় আমার বাস। কখনও এর থেকে বাইরে বের হইনি।

তার শেষকৃত্যে শামিল হয়েছিলেন ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়াহ। সেখানে তিনি বলেন, রিটার্ন অব গ্রেট মার্চ এখন ন্যায় আর সচেতনতার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। মুর্তজা তার ক্যামেরা সত্যের তীরের দিকে তাক করে অধিকৃত মানুষের অধিকারের বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন।

এদিকে পরিস্কার প্রেস লেখা চিহ্ন থাকার পরও ফিলিস্তিনী সাংবাদিকদের ওপর গুলী বর্ষণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরায়েল। সাংবাদিকদের বৈশ্বিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার অভিযোগ তুলেছে ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের ওপর গুলী ছুঁড়েছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলছে ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু বানায় না তারা। শনিবার দেশটির সেনাবাহিনীর তরফ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে শুক্রবারে ফিলিস্তিনী বিক্ষোভে সাংবাদিক নিহতের ঘটনা তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনীদের বিক্ষোভে হামাস উসকানি দিচ্ছে অভিযোগ করা হয়েছে ওই বিবৃতিতে। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এই বিবৃতির খবর নিশ্চিত করেছে।

সাংবাদিক হতাহত হওয়ার এই ঘটনায় ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়েছে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক বৈশ্বিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার। সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ক্রিস্টোফার ডেলোয়রি এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিনী সাংবাদিক ইয়াসির মুর্তজা প্রেস লেখা জ্যাকেট পরে ছিলেন: তিনি নিশ্চিতভাবেই উদ্দেশ্যমূলক গুলী চালানোর শিকার। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর এই ইচ্ছাকৃত গুলী চালানোর নিন্দা জানাচ্ছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার।’

সমালোচনা অব্যাহত থাকায় শনিবার বিবৃতি দিয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় না দাবি করে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে এই ঘটনা তদন্ত করে দেখবে তারা। প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কয়েক সপ্তাহ ধরে সীমান্ত বেড়ার কাছে আসার বিষয়ে আমরা সতর্কতা দিয়ে আসছি। হামাসের নির্দেশ না মেনে গাজার অধিবাসীদের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যক্রম বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছি। তা স্বত্ত্বেও গত শুক্রবার থেকে ইসরায়লী বাহিনী হামাসের উসকানিতে পড়ে সীমান্ত বেড়ার কাছে আসা হাজার হাজার ফিলিস্তিনীকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ