রবিবার ১১ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

ঘটনার পিছনে পরকীয়া ও দ্বন্দ্ব। মিলনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী 

রংপুর অফিস : সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা শেষে বুধবার রাতে রংপুর মহানগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে দাহ করা হয়েছে স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে খুন হওয়া কৌসলী ও রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকোট রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনার। এদিকে তদন্ত সংস্থাগুলোর সূত্রে জানা যায়, বাবু সোনার স্ত্রী দীপা ভৌমিক শুধু কামরুলের সাথেই নয়, একাধিক জনের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িত ছিলেন। ২৪ বছর আগে একই দিনে স্কুলে নিয়োগ পাওয়া কামরুল ও দীপার দীর্ঘ প্রেমের একটি সমাধানও চেয়েছিলেন রথীশ। এদিকে আদালতে গ্রেফতার রথিশচন্দ্র ভৌমিকের সহকারী মিলন মোহন্ত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। 

বুধবার রাতে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে যখন এ্যডভোকেট বাবু সোনাকে দাহ করা হয় তখন সেখানে শত শত মানুষ অংশ নেন। এর আগে তার লাশ আইনজীবি সমিতি, আদালত প্রাঙ্গন, পাবলিক লাইব্রেরী মাঠ, নিজ বাড়ি এবং লায়ন্স স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে নেয়া হয়। সেখানে রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানান। তারা বলেন, একজন সর্বজন নন্দিত মানুষকে এভাবে হত্যা করার বিষয়টি তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। এই হত্যাকান্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শান্তি দাব্ িকরেন তারা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রংপুরের অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বিচারক আরিফা ইয়াসমিন মুক্তার আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আল-আমিন গ্রেফতার এ্যডভোকেট বাবু সোনার সহকারী এবং স্ত্রী দীপার ঘনিষ্টজন মিলন মোহন্তকে হাজির করেন। এসময় তিনি ১৬৪ ধারায় হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন। এছাড়াও সন্ধ্যায় গ্রেফতারকৃত স্ত্রী দীপা ভৌমিক, পরকীয়া প্রেমিক কামরুল ইসলাম, মতিয়ার রহমান, ছাত্র রোকন ও সবুজকে আদালতে তোলার কথা রয়েছে। 

এদিকে বাবু সোনা হত্যাকান্ডের ঘটনায় রংপুরের আইনজীবী সমিতি তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে। তারা কালোব্যাচ পরে শোকর‌্যালী করেছে। শোকর‌্যালী থেকে দীপা ভৌমিক ও কামরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়। এছাড়াও হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদও নগরীতে শোক র‌্যালী করে। 

 এদিকে রংপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ জানান, রথীশ ভৌমিকের সহকারী মিলন মোহন্ত ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। এছাড়াও লাশ গুম করার জন্য ব্যবহৃত স্টিলের আলমিরা এবং একটি মোটরসাইকেল কামরুলের ভাইয়ের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয় এবং কামরুল ও দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত তদন্তরত সংস্থাগুলোর সূত্র মতে, ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর একই দিনে ইসলাম ধর্মের শিক্ষক হিসেবে কামরুল ইসলাম এবং হিন্দু ধর্মের শিক্ষক হিসেবে ¯িœগ্ধা সরকার দীপা নিয়োগ পান। আর নিয়োগ দুটি দিয়েছিলেন সেই সময়ে স্কুলের সহ-সভাপতি এ্যডভোকেট রথিশ চন্দ্র ভৌমিক। তদন্তসূত্রগুলোর তথ্য মতে, এ্যডভোকেট রথীশের স্ত্রী বিবাহের পর থেকেই পারিবারিক অশান্তি শুরু হয় এবং পর পুরুষে আসক্ত ছিলেন। স্কুলে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই কামরুলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দীপা। শুধু কামরুলই নয় দীপার আরও একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল । এরমধ্যে একই স্কুলের আরেক শিক্ষক মতিয়ার রহমান এবং বাবু সোনার অফিস সহকারী মিলন মোহন্ত ছাড়াও একাধিক ব্যক্তির সাথে তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তবে কামরুলের সাথে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ট সম্পর্কে কোন বাধা হয় নি। তবে কামরুল ইসলামের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট। 

 কামরুল ও দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত তদন্ত সংস্থাগুলোর সূত্র জানায়, কামরুল শুধু দীপা ভৌমিকের পরকীয়া প্রেমিকই নয়, ওই সম্পর্কের সূত্র ধরে লাল লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তদন্তসূত্রগুলোর ধারণা রাধাবল্লভে কামরুলের যে দ্বিতল বাড়ি আছে তার আর্থিক যোগানও দিয়েছেন ওই দীপা। কামরুল যে মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করতেন সেটিও দীপার দেয়া উপহার কিনা তাও খতিয়ে দেখছে আইনশৃংখলা বাহিনী। 

 কামরুল ও দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত তদন্তরত সংস্থাগুলোর সূত্র মতে, ছাত্রজীবনে জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত কামরুল ইসলাম ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ওই স্কুলের সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই সময়ের সভাপতির আনুকুল্যে একজন জুনিয়র শিক্ষক হয়েও নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পদ ও পদবি পান এবং নিয়োগসহ আর্থিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তোলেন স্কুলটিতে। এসময়কার প্রধান শিক্ষক ছিলেন তার হাতের পুতুল। 

কামরুল ও দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত তদন্ত সংস্থা সূত্র মতে, সেই সময়ের স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি মারা যাওয়ার পর স্কুলটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এ্যডভোকেট বাবু সোনা। এরপর তিনি শিক্ষক কামরুল ইসলামের সকল অবৈধ হস্তক্ষেপ কঠোর হস্তে দমন করেন এবং সিনিয়র শিক্ষকদের যথাযথভাবে দায়িত্ব দিয়ে কাজ শুরু করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার মাধ্যমে স্কুলে একাডেমিক বিল্ডিং হওয়ার পাশাপাশি বহু উন্নয়ন হয়েছে। স্কুলের জমি নিয়ে সমস্যা ছিল তার সমাধান হয়েছে কোর্টের রায়ের মাধ্যমে গত ১৪ মার্চ। কিন্তু কামরুল অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারায় স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র এবং শৃংখলা বিরোধী কাজ শুরু করেন। আর তাকে রশদ ও সাহস জোগান প্রেমিকা ও সহকর্মী ¯িœগ্ধা সরকার। 

কামরুল ও দীপা ভৌমিককে জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত তদন্ত সংস্থাগুলো এবং স্কুল সূত্র মতে, অব্যাহত শৃংখলা বিরোধী কাজের কারণে গত ৪ মার্চ স্কুলের প্রধান শিক্ষক সভাপতির নির্দেশে তিনটি বিষয় উল্লেখ করে কারণ দর্শাও নোটিশ প্রদান করেন কামরুল ইসলামকে। কামরুল ইসলাম নোটিশের জবাব দেন। সেই জবাব নিয়ে গত ১৯ মার্চ স্কুল পরিচালনা কমিটির বৈঠক বসে। বৈঠকে জবাব পর্যালোচনা করে সন্তোষজনক না হওয়ায় কামরুলের সাথে কথা বলার জন্য অভিভাবক সদস্য বিপুল সরকারকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করে দেন এ্যডভোকেট বাবু সোনা। গত ২৮ মার্চ স্কুলে দুপুরে ওই কমিটির কাছে সরাসরি নোটিশ ও জবাবের বিষয়ে কথা বলেন কামরুল। এক পর্যায়ে ভুল স্বীকার করেন। এ বিষয়টি খুবই খারাপভাবে নেন কামরুল ও দীপা। কামরুলকে নোটিশ এবং নোটিশের জবাব প্রাপ্তির পর কমিটি করে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় দীপা ভৌমিক খুব নাখোশ হন রথিশ ভৌমিকের ওপর, এনিয়ে কথাকাটাকাটি হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে। 

 কামরুল ও দীপাকে জিজ্ঞাসাবাদের সাথে যুক্ত সূত্র মতে, কামরুলের সাথে দীপার অবাধ প্রেম ও অসামাজিক কার্যকলাপ এবং স্কুলে কামরুলের অবৈধ হস্তক্ষেপে দীপার সমর্থন ও কামরুলকে কারণ দর্শাও নোটিশ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ উঠে যায় তুঙ্গে। বিষয়টি নিয়ে একটি সমঝোতার জন্য ৩০ মার্চ রাতে পারিবারিক সালিশের দিনধার্য করা হয়। কিন্তু পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কামরুলের স্কুলের তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হওয়ার পরের দিন এবং দীপার সাথে পারিবারিক সালিশের আগের দিন (২৯ মার্চ) নিজ বাড়ির নিজ শয়নকক্ষেই দীপা ও কামরুল ইসলাম এ্যাডভোকেট বাবু সোনাকে হত্যা করে। তদন্ত সূত্রগুলোর মতে, ২৯ তারিখ রাতে বাড়ি ফেরার সাথে সাথেই ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর ওড়না পেচিয়ে বাবু সোনাকে হত্যা করে দীপা ভৌমিক ও কামরুল। লাশের গলায় ওড়না দিয়ে পেচানো সেই দাগ রয়েছে। এসময় তার পরনে শার্ট-প্যাণ্ট ও পায়ে জুতা ছিল। লাশ পেঁচানো ছিল বিছানার চাদর ও লুঙ্গি দিয়ে। সুরত হাল রিপোর্টেও সে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কামরুল ইসলামের পৈতৃক বাড়ি তাজহাট মোল্লাপাড়ায়। তিনি পরিবার নিয়ে নগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় বসবাস করলেও মোল্লাপাড়ার বাড়িতেও মাঝেমধ্যে যাতায়াত করতেন। 

 বরখাস্তের ব্যপারে প্রধান শিক্ষক তাওহিদা জানান, এ্যাডহক কমিটির সভাপতি ছিলেন বাবু সোনা। তিনি নেই। শিক্ষক প্রতিনিধি মতিয়ার রহমানকে আইনশৃংখলা বাহিনী নিয়ে গেছে। এখনও ছেড়ে দেয় নি। সে কারণে আমি কমিটির মিটিং করতে পারছি না। বোর্ডের নির্দেশনা চেয়েছি। বোর্ডের নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই তাদের বরখাস্তসহ সব কিছু করা হবে।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ