সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১
Online Edition

ভরাট-দখলে অস্তিত্বহীন আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : যেন দেখার কেউ নেই। অথচ যারা দেখভাল করছেন, কিংবা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ তাদের নির্লিপ্ততাতেই বছরের পর বছর ধরে ভরাট-দখল হচ্ছে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে চলা ভরাট-দখলে অস্তিত্বহীন হতে বসেছে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল। এখন তাকালেই চোখে পড়ে দু’পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে শতশত বসতভিটা ও দোকানপাট। বড় বড় অট্টালিকা গড়ে উঠেছে আদি বুড়িগঙ্গার বুক ফুড়ে। ফলে কোথাও সরু আবার কোথাও নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দাবি করে অনেকে সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছেন। কেউ উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের আদেশও সাইনবোর্ডে লিখে রেখেছেন। তারপরও মাঝে মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করলেও কিছুদিন পর রহস্যজনক কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দখল আবার জেকে বসে। এভাবেই সময়ের সাথে সাথে দখল পাকাপোক্ত হচ্ছে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে। 

পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের কিছুটা পশ্চিমে চাঁদনীঘাট এলাকায় দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার উত্তর দিকের শাখাটি আদি চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। আর দক্ষিণের শাখাটি এখনকার মূল বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল বুড়িগঙ্গার দ্বিতীয় চ্যানেল নামেও পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য চার কিলোমিটারের বেশি। 

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, একসময়ে নৌকায় চলাচল করা আদি চ্যানেল দিয়ে এখন হেঁটেই চলাচল করা যায়। বর্ষার মৌসুমে কেবল পানি দেখা যায় আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে। বুড়িগঙ্গা এ চ্যানেলের দু’পাড় দখল করে এখন শতশত বসতভিটা, দোকানপাট গড়ে উঠেছে। কামরাঙ্গীরচর লোহার ব্রিজ সেতুর পূর্ব পাশে ভাঙা বাড়ির ইট-সুরকি ফেলা হচ্ছে। একইভাবে পূর্ব ইসলামবাগের একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হাজারীবাগ পর্যন্ত সদরঘাট-গাবতলী বেড়িবাঁধ সড়কের দক্ষিণ পাশে ইট-সুরকি ফেলা হয়েছে। একইসাথে গৃহস্থলী বর্জ্য ফেলেও ভরাট করা হচ্ছে বুড়িগঙ্গার এ আদি চ্যানেল। এলাকাবাসীর অনেকে অভিযোগ করেছেন, সিটি করপোরেশনের ময়লাও ফেলা হচ্ছে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে। হাজারীবাগ কোম্পানীঘাটের বাসিন্দারা বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের পুরো অংশজুড়েই চলছে দখলদারিত্ব। অনেকে জাল দলিল করে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দাবি করে অনেকে সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছেন। কেউ উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের আদেশও সাইনবোর্ডে লিখে রেখেছেন। এ কারণে এক সময়ের প্রমত্তা আদি বুড়িগঙ্গার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

জাওলাহাটি, রসূলপুর, কোম্পানীঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পশ্চিম রসূলপুর অংশে এ চ্যানেলটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। কোম্পানীঘাট ম্যাটাডোর, পান্না ব্যাটার শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে আরো সরু হয়েছে। আর জাওলাহাটি গিয়ে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলের আর কোন অস্তিত্ব নেই। বড় বড় অট্টালিকা গড়ে উঠেছে আদি বুড়িগঙ্গার বুকে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করলেও কিছুদিন পর রহস্যজনক কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দখল আবার জেকে বসে। এভাবেই সময়ের সাথে সাথে দখলপোক্ত হচ্ছে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে। 

এ কারণে স্থানীয় এলাকাবাসী আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল দখলমুক্ত করতে আন্দোলন শুরু করেছেন। গত ২৯ মার্চ ওই এলাকায় মানববন্ধন করে তারা দখলমুক্ত করার দাবি জানান। এ দাবিতে গত ৩ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন এলাকাবাসী। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল রক্ষার ব্যাপারে আমরা সোচ্চার ভূমিকা পালন করছি। রাজউকের সংশোধিত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলকে পূর্বের রূপে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি আমরা। আশাকরি রাজউক আমাদের দাবির বাস্তবায়ন ঘটাবে ড্যাপের গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে। এজন্য আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল রক্ষায় সংগ্রাম করে যাচ্ছি, সরকারের সংশ্লিষ্টদের আমরা পাশে পেতে চাই। হাতিরঝিলের মতো কোন প্রকল্প গ্রহণ করে আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল রক্ষা না করলে প্রভাবশালী দখলদারদের কবল থেকে কামরাঙ্গীরচরবাসীর পক্ষে এ চ্যানেল রক্ষা করা দূরহ হবে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়ার পর তিনি আমাদের এ ব্যাপারে আশস্ত করেছেন। আশা করি এ ব্যাপারে দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া সরকার পাঁচটি খাল উদ্ধারে যে একনেকে যে বরাদ্ধ দিয়েছে তার প্রেক্ষিতেও আদি বুড়িগঙ্গা তার স্বরূপে ফিরে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেলে ৫২ দখলদার

পরিবেশ অধিদফতরের ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল দখল করে ছোট-বড় ৫২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ওই প্রতিবেদন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়। যদিও এব্যাপারে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। বর্তমানে এর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। 

পরিবেশ সংগঠনের অভিমত

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন বলেন, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল রক্ষাকরা রাজধানীর জন্য খুবই জরুরী বিষয়। এই ইস্যুতে বিভিন্ন সময় আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। কামরাঙ্গীরচরবাসীর আন্দোলনে আমাদের সমর্থন রয়েছে। সরকারের কাছে দাবি জানাবো, আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন। নইলে ভবিষ্যতে বড় খেসারত দিতে হবে ঢাকাবাসীকে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, রাজধানীর পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার জন্য আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল রক্ষা করা খুবই জরুরী। দীর্ঘদিন থেকে আমরা এ দাবি জানিয়ে আসছি। কামরাঙ্গীরচরবাসী তাদের এ প্রয়োজন অনুভব করায় আমরা খুশি, আমরা তাদের কর্মসূচির সাথে সহমত পোষণ করছি। ভবিষ্যতে এই ইস্যুতে আমরাও কর্মসূিচ দেবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ