সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ইমাম রশিদির প্রেরণায় আসানসোলে হিন্দু সম্পত্তি সুরক্ষা দিচ্ছেন মুসলিমরা

শীতলডাঙ্গায় শিভমন্দির পাহারা দিচ্ছে মুসলমানরা

৩ এপ্রিল, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস/ডেইলি নিউজ এন্ড এনালাইসিস/দ্য ট্রিবিউন ইন্ডিয়া : আবারও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার গুজবের বিরুদ্ধে প্রচারণার পাশাপাশি আসানসোলের শীতলডাঙ্গা এলাকা ছেড়ে যাওয়া হিন্দুদের বাড়ি ও দোকানপাট রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীরা। গত রোববার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে আসানসোলে ইমামের অনুপ্রেরণায় গুজবের বিরুদ্ধে সেখানকার সম্প্রীতির পক্ষের মানুষের মাঠে নামার খবর জানা যায়। গত মঙ্গলবার ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শীতলডাঙ্গার তরুণেরা পালাক্রমে সেখানে থাকা অল্প কয়েকটি হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি পাহারা দিচ্ছেন। নিশ্চিত করছেন সেখানের নিরাপত্তাও। তারা জানিয়েছেন, ইমামের অনুপ্রেরণায় এলাকায় হিন্দুদের একমাত্র মন্দিরটিকেও আগলে রেখেছেন তারা।

আসানসোলের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক ঘৃণার মারণাস্ত্রে খুন হওয়া ১৬ বছরের কিশোর পুত্রের দাফনের প্রতিশোধের বিপরীতে মাওলানা রশিদি আহ্বান জানিয়েছেন জীবনের। বলেছেন, ‘কোনও প্রতিহিংসা নয়। প্রতিশোধ নিতে যদি কারোর মৃত্যু ঘটাও, তাহলে আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাব। আমি তোমাদের সঙ্গে ৩০ বছর ধরে আছি, আমাকে যদি তোমরা ভালোবাসো তাহলে আর কাউকে যেন এভাবে মরতে না হয়।’ মাওলানার এই তৎপরতায় আপাতভাবে শান্ত হয় আসানসোল। গত  রোববারও মাওলানা রশিদি বলেছেন, আমার বিশ্বাস আমাকে শান্তি শিক্ষা দেয় তাই আমিও সবাইকে শান্তি বজায় রাখার কথা বলি। আমার পরিবার বিপুল ভুগেছে, তবে আমি চাই না কেউ সহিংসতা ছড়াতে এটাকে অজুহাত বানাক।

মাওলানার এসব তৎপরতায় উদ্বুদ্ধ এলাকার এক বাসিন্দা ওয়াসিম রাজা বলেন, ইমাম সাহেবের চরম ক্ষতি হয়েছে। তা সত্ত্বেও যদি তিনি ধৈর্য ধরে সবাইকে আইন হাতে না তোলার জন্য বলেছেন, আমরা তার পদচিহ্ন অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অল্প যে কয়েক ঘর হিন্দু যারা এখানে রয়ে গেছেন তাদের বাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই আমরা। আমরা সবাইকে বলে দিয়েছি এসব এলাকা যেন খালি করে ফেলার চেষ্টা না হয়। বৃহত্তর পরিসরে সমাজে যেন কোনও ভুল বার্তা না যায় সে কারণে এই এলাকার তরুণেরা একমাত্র স্থানীয় মন্দিরটিরও যেন কোনও ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করছে।

নিজের ভাঙচুর হওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী বলেছেন, পাল্টাপাল্টি শোধ-প্রতিশোধ নেওয়া চলতে থাকুক তা চাই না। যুগ যুগ ধরে এখানে হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে আর তা বজায়ও থাকবে। সহিংসতা আমাদের মতো গরিবদের কোনও উপকারে আসে না। আমার ছেলে আহত হয়েছে। তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে। আমার বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবু সবকিছু ভুলে যেতে চাই। প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি যেন শান্তি নিশ্চিত করা হয়। একই অনুভূতি রতন মালা দেবীরও। ৬৬ বছর বয়সী এই নারী গত ২৮ মার্চের ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, সেদিন বোমা ও পাথর ছোড়াছুড়ির মধ্য দিয়ে যেন তা-ব শুরু করেছিল মানুষ। আমরা সবসময় এখানে যেরকম ছিলাম সেরকম শান্তির সঙ্গে বসবাস করতে চাই। যাতে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ভয় ছাড়াই ঘরের বাইরে বের হতে পারে।

প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহের  রোববার হিন্দু দেবতা রামের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের রাম নবমীর র‌্যালি থেকে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে পাঁচজন নিহত হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় বহু ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। সহিংসতার জের ধরে রাজ্য দুটিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চলছে।

এদিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় সন্তান হারানোর পর শান্তির ডাক দেওয়া ইমাম রশিদির জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি তুলেছে ভারতের একটি বেসরকারি সংস্থা। সামাজিক সচেতনতায় কাজ করা ‘সাভেরা’র নামের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাটি সোমবার আয়োজিত এক শোকসভা থেকে এই দাবি তুলেছে। দ্য ট্রিবিউন ইন্ডিয়ার খবর থেকে এই দাবির কথা জানা গেছে। ইমাম মওলানা ইমদাদুল রশিদিকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক শান্তি পুরস্কার ‘ভারতরতœ’ দেওয়ার দাবিরও প্রতিধ্বনি তুলেছে সংস্থাটি। ঘটনার দুই দিনের মাথায় নন্দিত গায়ক কবীর সুমনও একই দাবি তুলেছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ভূমিকার কারণে ইমাম রশিদিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিতে নরওয়েজিয়ান নোবেল পিস কমিটির কাছে প্রস্তাব রাখার আহ্বান জানায় সংস্থাটি। ভারতের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি সংস্থাটি ওই প্রস্তাব পাঠানোর আহ্বান জানায়।

সিবতুল্লাহ রশিদির জন্য বাহাদুরপুরের শ্রী রাম ভবনে শোকসভার আয়োজন করে সাভেরা নামের বেসরকারি সংস্থাটি। ওই অনুষ্ঠানে ইমাম রশিদির জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি তোলেন সংস্থাটির আহ্বায়ক ড. অজয় ভাগ্য।

উত্তপ্ত ভারতে দলিত মিছিলে গুলীতে নিহত বেড়ে ৯ : দলিত সংগঠনগুলোর ডাকা ভারত বনদ্ (হরতাল) ঘিরে পুরো দেশটি উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে।। সহিংসতা থামাতে পুলিশের গুলীতে মৃত্যু হয়েছে ৯ জন বিক্ষোভকারীর। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র, ভিন্দ ও মোরেনাতে এক ছাত্রনেতাসহ মৃত্যু হয়েছে ছ’জনের। রাজস্থানের অলওয়ারে থানায় আগুন ধরিয়ে দিতে গিয়ে পুলিশের গুলীতে মারা গেছেন আরো এক জন। উত্তরপ্রদেশের মুজফ্ফরনগরে ও মেরঠে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা গেছেন দুই বিক্ষোভকারী। সংঘর্ষ ছড়িয়েছে পাঞ্জাব, রাজস্থান, ঝাড়খ-, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকায়। বিপর্যস্ত অন্তত সাত-আটটি রাজ্যের জনজীবন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ