মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা জনসমর্থন আদায়ে ব্যস্ত ॥ প্রচারণায় জামায়াত প্রার্থী এগিয়ে

আব্দুস ছামাদ খান, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ): তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সিরাজগঞ্জ-৫ আসন। এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেই তাদের ঐক্য, দ’ভাগে বিভক্ত তারা। এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী ৫জন এবং বিএনপিতেও ৫জন প্রার্থী।  দু’দলেরই নেতাকর্মীরাও বিভক্ত দু’ভাগে। এদিকে মনোনয়ন প্রত্যাশী বেলকুচি উপজেলা এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের ৪জন, বিএনপির ৪জন। চৌহালী উপজেলা এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের ১জন ও বিএনপির ১জন মনোনয়ন প্রার্থী। এ আসনে সাধারণ ভোটারদের মাঝে বেলকুচি উপজেলা ও চৌহালী উপজেলা এলাকাভিত্তিক নির্বাচনী আঞ্চলিক টান শুরু হয়েছে। চৌহালীর কিছু সাধারণ ভোটাররা দলীয় দ্বন্দ থেকে দূরে থাকতেই বা এলাকার স্বার্থে আঞ্চলিক টান তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এদিকে যমুনা বিধৌত চৌহালীতে যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্বেও মনোনয়ন দেয়া হয় না। দেয়া হয় বেলকুচি এলাকার মনোনয়ন প্রার্থীকে। অথচ ১৯৯১ সালে চৌহালী উপজেলার একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। সেই প্রার্থী এলাকার মাটির টানে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় লাভ করে এমপি নির্বাচিত হন। এখন দাবি তোলা হচ্ছে, চৌহালী থেকে যাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে তাকেই তারা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। বেলকুচি উপজেলায় ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৩৬ হাজার ও চৌহালীতে ১ লাখ ২ হাজার। 
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় মজলিসে সূরা সদস্য, সিরাজগঞ্জ জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর বেলকুচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোঃ আলী আলম এই আসনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছেন। অধ্যক্ষ আলী আলম দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সিরাজগঞ্জ জেলাবাসীসহ বেলকুচি, চৌহালী ও এনায়েতপুর থানার মাটি ও মানুষের সাথে যার নিবিড় যোগাযোগ, গভীর সম্পর্ক। আন্দোলন সংগ্রামে সর্বজন বিদিত। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ধর্মীয় আচার- অনুষ্ঠানে এক বাক্যে সকলের কাছে তিনি আপনজন এবং পরিচিত মুখ। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বেলকুচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে তার সততা স্বচ্ছতা, কর্তব্যপরায়নতা, দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা, সুন্দর আচরণ, ভাল ব্যবহার, সর্বমহলে “বিরলগুণ” বলে এখনও সমাদৃত আছে।  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) জামায়াত মনোনীত অধ্যক্ষ আলী আলম ২০ দলীয় প্রার্থী হতে পারেন মর্মে এলাকার জনগণের মুখে মুখে ব্যাপক গুঞ্জন ও আলোচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। এই আসনে জামায়াতের বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের কাছে হেরে জান। তখন বিএনপিরও একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে নির্বাচন করেছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আব্দুল লতিফ বিশ্বাস যখন বেলকুচি-চৌহালী আসনের এমপি এবং কেবিনেট মন্ত্রী তখনকার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বেলকুচি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সরকারকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জামায়াতের এই আলী আলম। বর্তমানে এ উপজেলায় জামায়াতের একজন ভাইস চেয়ারম্যান, একজন ইউপি চেয়ারম্যান ও ৫জন মেম্বর রয়েছে। জননন্দিত এই নেতা ১টি দাখিল মাদ্রাসাসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। এ আসনে বিএনপির চেয়েও জামায়াতের জনসমর্থন বেশী থাকলেও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি জোটের মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে ছিলেন। জোটের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় নির্দেশে তিনি ত্যাগ শিকার করে জোটের পক্ষে কাজ করেন।  এবার ত্যাগ স্বীকার নয়, জনগণের স্বার্থে তিনি নির্বাচন করবেন। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন হলে তিনিই এবার প্রার্থী হবেন বলে আলী আলম তার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আলী আলম এলাকায় সভা-সমাবেশ, ইসলামী জালসা, মাদ্রাসা-মসজিদে ও ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ করছেন। তার পক্ষে জামায়াত কর্মীরাও গ্রাম-পাড়া, মহল্লার ঘরে ঘরে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। জোটবদ্ধভাবে জামায়াতের এই প্রার্থী মনোনয়ন পেলে যতো বাধা বিপত্তি আসুকনা কেনো বিপুল ভোটে তিনি জয়লাভ করবেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা উঠেছে। এলাকার বিভিন্ন হাটে-বাজারে, চায়ের দোকানে, পাড়া মহল্লার মানুষের মুখে মুখে আলী আলমের সুনাম শোনা যাচ্ছে।
মনোনয়ন প্রত্যাশী আব্দুল  লতিফ বিশ্বাস ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হন। তিনি সামান্য ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত করেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অবঃ) মঞ্জুর কাদেরকে। লতিফ বিশ্বাস নির্বাচনে জয় লাভের পর মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নোয়ন করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হন তিনি। পরবর্তীতে তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি  নির্বাচিত হওয়ার পর দলীয় যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে নিজের সহধর্মিনীকে বেলকুচি পৌরসভা মেয়র এবং তার পুত্রকে ইউপি চেয়ারম্যান করা হয়। আওয়ামী লীগের এই সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি’র মনোনয়নকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরাও এখন দু’ভাগে বিভক্ত। যার ফলে মামলা পাল্টা মামলা ঘটনা ঘটছে এমনকি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের অফিসে চেয়ার টেবিল আসবাবপত্র ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে এবং এমপিপন্থী যুবলীগের নেতা গ্রেফতার হন। এনিয়ে উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচী পালন করে।
এমপি আব্দুল মজিদ মন্ডলের শারীরিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। শরীর সুস্থ থাকলে আগামী নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন।  অসুস্থতার কারণে তিনি অপারগ হলে তার পুত্র মন্ডল গ্রুপের এমডি মোমিন মন্ডলকে প্রার্থী করার জন্য তিনি এ বিষয়ে নেত্রীর সাথে কথা বলে বিভিন্ন সভা সমাবেশে তার পুত্রকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশী আরেকজন ত্যাগী নেতা সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য, ওয়ান ইলেভেনের (১/১১) সময় জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে অগ্রনী ভূমিকা পালনকারী গাজী মোঃ শফিকুল ইসলাম তালুকদার। ষাটের দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া বর্তমান চৌহালী-বেলকুচির তৃণমূলের নেতা দীর্ঘ ১৬ বছর যাবৎ এলাকার মানুষের কাজ করে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান। তিনি এলাকায় পোস্টার, প্যানা টানিয়ে জনগণের মন আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। সফিকুল ইসলাম অসহায় দুঃস্থ গরীব ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের আর্থিক সহযোগিতা ও অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা-পড়ার খোঁজ খবর নিয়ে আর্থিক সহযোগিতা করছেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মত বিনিময় করছেন। জনসংযোগে যাচ্ছেন ইসলামী জালসা, মসজিদ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণেও। সফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি মনোনয়ন পেলে নির্বাচিত হয়ে মাদকদ্রব্য নির্মূল করবেন, সন্ত্রাসমুক্ত, অসম্প্রদায়িক উন্নত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলবেন।   ঢাকা মহানগরের বনানী থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মীর মোশারফ হোসেন মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ লক্ষে তিনি মাঝে মধ্যে এলাকায় এসে সভা সমাবেশ ও জনসংযোগ করছেন। কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা মুসফিকুর রহমান মোহন তিনিও মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি এলাকায় কম আসেন। আগামী নির্বাচনে  মনোনয়ন চাইবেন বলে তিনি জানান। এ আসনে বিএনপির নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত। মনোনয়ন প্রত্যাশী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সহপ্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আমিরুলের নেতৃত্বে দলের কর্মকা- চালাচ্ছেন নেতাকর্মীদের একটি অংশ। অপর দিকে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির সহসভাপতি রকিবুল করিম খান পাপ্পুর নেতৃত্বে দলের অপর অংশ দলীয় কর্মসূচি পালন করছেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর  বেলকুচির তামাই বাজারে পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে হামলা পাল্টা হামলা হয়। মনোনয়ন প্রত্যাশী মেজর (অবঃ) মঞ্জুর কাদের ২০০৮ সালে বিএনপির টিকিট নিয়ে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের আঃ লতিফ বিশ্বাসের কাছে মাত্র ২৫২ ভোটে হেরে যান। এরপর তিনি আর নির্বাচনী এলাকায় আসেননি। তিনি এ আসনে আবার নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন চাইতে পারেন। আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী গোলাম মওলা খান বাবলু। তিনি বিএনপি থেকে দুইবারের এমপি মরহুম সহিদুল্লাহ খানের ভাতিজা। বাবলু খানের বাবা তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বেলকুচি ডিগ্রি কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। এ কারণে বেলকুচিতে বাবলু খানের জনসমর্থন রয়েছে। তিনি এলাকায় পোস্টার ও ব্যানার টানিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে অনেক আগে থেকেই জানান দিয়েছেন। তিনি এলাকায় জনসংযোগ করে বেড়াচ্ছেন এবং নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বিএনপি নেতা ও চৌহালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর (অবঃ) আব্দল্লাহ আল-মামুন আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলা এলাকার বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যানার ফেস্টুন লাগিয়ে অনেক আগেই জানান দিয়েছেন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে তিনি বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলার গ্রাম ও পারা মহল্লায় গিয়ে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও মতবিনিময় করে জনসমর্থন আদায় করছেন। তিনি প্রচারণায়  অন্যাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন, তার এগিয়ে যাওয়া আরোও সহজ হয়েছে, মামুনের বাবা মরহুম আনসার আলী সিদ্দিকী ১৯৯১ সালে বিএনপির মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। যার কারণে বেলকুচি ও চৌহালীতে মেজর মামুনের এতো সুনাম ও জনসমর্থন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি দলীয় নেতাকর্মী  সাথে নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গ্রামের মাতব্বরদের সাথে বৈঠক করছেন এবং দলীয় নেতাকর্মীদের, অসহায় রোগীদের  ও মাদ্রাসা মসজিদ, এতিমখানায় আর্থিক সহযোগিতা করছেন। তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে শতভাগ আশাবাদী। তিনি মোনয়ন পেলে নির্বাচিত হয়ে ভাঙ্গন রোধ এবং যমুনা গর্ভে চলে যাওয়া চৌহালী উপজেলা পরিষদের অফিস আদালতের দালান কোঠা নির্মাণ ও বেলকুচি-এনায়েতপুরে তাঁতশিল্পের উন্নয়নে কাজ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ