শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

নারী শিক্ষা জাগরণের আন্দোলনে বেগম রোকেয়ার পূর্বসুরিরা

মো: জোবায়ের আলী জুয়েল : ­॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মুসলমান নারী জাগরণের পথিকৃৎ। বাংলাদেশের নারী সমাজ যখন অবহেলিত তখন তিনি ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে নিজগ্রামে কুমিল্লা (ত্রিপুরা) জেলার লাকসামে মহিলাদের জন্য একটি বিদ্যালয় স্থাপন করে নিজেই তাদের শিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োজিত হন। এটি উপমহাদেশের বেসরকারীভাবে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের প্রাচীনতম স্কুলগুলির অন্যতম। কালক্রমে এটি একটি কলেজে রূপান্তরিত হয় এবং এর নাম হয় নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজ।
জমিদার হওয়ার পর তাঁর সেবার হাত আরও প্রসারিত হয়। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে পর্দানশীন বিশেষত দরিদ্র মহিলাদের চিকিৎসার জন্য তিনি নিজ গ্রামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। তিনি “ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল” নামে একটি চিকিৎসালয় ও স্থাপন করেন। এছাড়া শিক্ষা বিস্তারে তিনি মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় স্থাপন করেন। দু:স্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল নির্মাণে ও অন্যান্য জনহিতকর কাজে অর্থ দান করেন। মসজিদ নির্মাণেও তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণ, দিঘী-পুস্করিণী খনন প্রভৃতি জনহিতকর কাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এতে তাঁর নাগরিক ও প্রগতিশীল চেতনার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি যুগের প্রভাবে বাইরের পর্দা মেনে চললেও মনের পর্দা ভেঙ্গে ফেলেন। এক্ষেত্রে ও তিনি বেগম রোকেয়ার অগ্রবর্তিনী ছিলেন। তবে বেগম রোকেয়ার কাজের ও চিন্তার অধিক গভীরতা ও ব্যাপকতা ছিল।
ফয়জুন্নেসা ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী ও সমাজ সেবিকা। কুমিল্লা (ত্রিপুরা) জেলার উন্নতিকল্পে সরকার কর্তৃক গৃহীত বিরাট পরিকল্পনার সমস্ত ব্যয়ভার তিনি গ্রহণ করেছিলেন বলে তৎকালীন মহারাণী ভিক্টোরিয়া ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে নওয়াব উপাধিতে ভূষিত করেন। মহারাণী ভিক্টোরিয়া “নওয়াব” উপাধি সংবলিত সনদ ও হীরক খচিত মূল্যবান পদক তাঁকে প্রদান করেন। তৎকালীন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মিষ্টার ডগলাস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এই পদক প্রদান করেন। হোমনাবাদের মতো অখ্যাত স্থানের একজন মহিলা জমিদারের জন্য এ ছিল এক দূর্লভ সম্মান। সে যুগের নারী পুরুষ সকলের জন্য এরূপ উপাধি শ্লাঘার বিষয়। ফয়জুন্নেসা নিজ কর্মগুণেই তা’ অর্জন করেন। ১৮৩৪ থেকে ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৩৩ বছর ফয়জুন্নেসা ব্যক্তিগত জীবনের প্রথম পর্ব। এ সময়ে তাঁর প্রধান পরিচয় কন্যা, জায়া ও জননী রূপে। ১৮৬৭ থেকে ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৩৬ বছরকে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় পর্ব বলা হয়। এ পর্বে তিনি লেখিকা, শিক্ষাব্রতী, সংস্কৃতি অনুরাগিনী, সমাজসেবিকা ও  জমিদার। অর্থাৎ এই ছিল তাঁর সৃষ্টি ও কর্মের জীবন।
ফয়জুন্নেসা ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কণ্যা বদরুন্নেসা ও দৌহিত্রের সঙ্গে পবিত্র হজ্ব পালনের জন্য মক্কা গমন করেন। তিনি সেখানেও মুসাফিরখানা ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন। তিনি পত্র-পত্রিকা প্রকাশনায় ও সভা সমিতিতে অকাতরে অর্থ দান করেন। সাপ্তাহিক ঢাকা প্রকাশ (১৮৬১ খ্রি. প্রকাশিত) কে নগদ অর্থ সাহায্য দেন। কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁর দানের কথা উল্লেখ করে “ঢাকা প্রকাশ” (৫ মাঘ ১২৮১ বঙ্গাব্দ) মন্তব্য করেন “অদ্য আমরা আমাদিগের পূর্ব বাঙ্গলার একটি মহিলা রত্নের পরিচয় দান করিয়া ক্ষান্ত থাকিতে পারিলাম না। .....ইনি যেমন বিদ্যানুরাগিনী ও সর্ববিষয়ে কার্যপারদর্শিনী সেইরূপ সৎকার্যেও সমুৎসাহিনী। .....শুনিলাম ইহার আবাসস্থানে সচরাচর যেরূপ করিয়া থাকেন, এখানেও সেইরূপ বিনাড়ম্বরে নিরুপায় দরিদ্রদিগকে দান করিয়াছেন।” মৃত্যুর আগে তিনি জমিদারির এক বিশাল অংশ ওয়াকফ করে যান, যা থেকে এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা লেখপড়ার জন্য আজও অর্থ সাহায্য পেয়ে থাকে।
ফয়জুন্নেসা বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীর ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। “ঢাকা প্রকাশ” ছাড়াও তিনি বান্ধব, মুসলমান বন্ধু, সুধাকর, ইসলাম প্রচারক প্রভৃতি বাংলা পত্র-পত্রিকা তাঁর আর্থিক সহায়তা লাভ করে।
ফয়জুন্নেসার সৃজনশীল প্রতিভার দিকটি নিহিত আছে তাঁর সাহিত্যকর্মে। তাঁর আতœজীবনীমূলক উপন্যাস “রূপজালাল” গ্রন্থটি ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা গিরিশ চন্দ্র মুদ্রন যন্ত্র থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর চারখানি পুস্তক-পুস্তিকার সন্ধান পাওয়া যায়- “রূপজালাল (১৮৭৬ খ্রি.), তত্ত্ব ও জাতীয় সঙ্গীত (১৮৮৭ খ্রি.), সঙ্গীত সার ও সঙ্গীত লহরী”। তাঁর তত্ত্ব ও জাতীয় সঙ্গীত একটি সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থ। এর প্রথম সংস্করণ ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ও মুদ্রক হরিমোহন বসাক, ঢাকা বাঙ্গলা প্রেস। তাঁর “রূপ জালাল” ব্যতীত অন্যান্য গ্রন্থের কপি পাওয়া যায় নাই।
“রূপজালাল” গদ্যে-পদ্যে রচিত রূপকধর্মী রচনা। গ্রন্থখানি ব্যতিক্রমধর্মী। সংস্কৃত গদ্য-পদ্য মিশ্রিত চম্পু কাব্যের নিদর্শন থাকলেও বাংলাতে তা’ বিরল। মধ্যযুগে বৈষ্ণব ভাবধারায় দু’একখানি চম্পু কাব্য রচিত হলেও উনিশ শতকে এ ধরনের দ্বিতীয় গ্রন্থ রচিত হয়নি। দ্বিতীয়ত ফয়জুন্নেসার গদ্য-পদ্য উভয় অংশ বিশুদ্ধ বাংলায় রচিত। আরবী-ফারসী শব্দের মিশ্রন নেই বললে চলে। ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী গল্পের নায়ক জালাল ও নায়িকা রূপবানুর প্রণয় কাহিনীর মধ্যে কৌশলে স্বীয় জীবনের ছায়াপাত ঘটিয়েছেন। ব্যতিক্রম একটি ক্ষেত্রে যে নিজের দাম্পত্য জীবন ব্যর্থতা ও বেদনায় পূর্ণ। “রূপজালালে”র প্রেম ও দাম্পত্য জীবন সুখ ও আনন্দেপূর্ণ। সৃষ্টির এখানেই স্বার্থকতা। ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতাকে সৃষ্টি কর্মে সফল হতে দেখেছেন। তিনি অন্তর্দাহ প্রকাশ করতে গিয়ে “রূপজালাল” উপন্যাস রচনায় মাঝে মাঝে কবিতার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। “রূপজালাল” এ ফুটে উঠেছে ফয়জুন্নেসার কবি প্রতিভা।
এই গ্রন্থটি বেগম রোকেয়ার জন্মের অন্তত: চার বছর আগে প্রকাশিত হয়। সতীন বিদ্বেষের কারণেই ফয়জুন্নেসার বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়। রূপ বানুর সতীন হুরবানু তাদের পরিণতি কিরূপ ছিল? গ্রন্থের শেষ কয়েকটি চরণে তা’ প্রকাশ পেয়েছে -
হুরবানু নিয়ে রাণী, রূপবানু মণে।
মিলন করিয়া দিল প্রবোদ বচনে॥
দোহে সম রূপবতী সম বুদ্ধিমতী।
বিভূকৃত ভেবে দোহে জন্মিল সম্প্রীতি॥
উভয় সপত্মী নানা গুণে গুণবতী।
আনন্দে বিহরে দোহে পতির সঙ্গতি॥
দুই জন নিয়ে সম দৃষ্টিতে রাজন।
নিত্য সকৌতুকে কাল করয়ে যাপন॥
সিংহাসনে বসি সদা হরিষ অন্তরে।
বিধি বিধানেতে ভূপ রাজ কার্য্য করে॥
বিচার কৌশলে দূর হৈল অবিচার।
প্রজার জন্মিল ভক্তি সুখ্যাতি প্রচার ॥
রাজা ন্যায় বিচারক ও প্রজানুরঞ্জন হবেনÑএটাও তাঁর কাম্য ছিল। স্বামী বিচ্ছেদের প্রায় নয় বছর পরে “রূপ জালাল” প্রকাশিত হয়। তিনি গ্রন্থখানি স্বামীর নামেই উৎসর্গ করেন। বাস্তবে দু:খ যন্ত্রণার পঙ্কে থেকে তিনি কল্পনায় প্রেমানন্দের পদ্মফুল ফুটিয়েছেন। “জাতীয় ভাষা অপরিহার্য্য” ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী এটি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। এরূপ সাহসী উচ্চারণের জন্য তিনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধার পাত্রী। এই ভাষার পথ ধরেই আমরা জাতীয়তা, স্বাধীকার ও স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়েছি।
ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী গান ও লিখেছেন। রূপজালাল কাব্যে গান আছে। “মূলতান” রাগিনীতে রূপবানুর গান ও অন্যত্র “মালঝাপ” রাগিনীতে কন্যার স্বীয় বৃত্তান্তের বিবরণ আছে। এছাড়া বার মাসি, সহেলা, বিরহ-বিলাপ, খেদোক্তি ইত্যাদি শিরোনামে যে সব পদ আছে সেগুলিও সঙ্গীত। সঙ্গীত সম্পর্কিত তাঁর স্বতন্ত্র গ্রন্থও আছে। এসব দৃষ্টান্ত থেকে প্রমানিত হয় ফয়জুন্নেসা সঙ্গীতানুরাগিনী ছিলেন। সঙ্গীতের সমর্থক ছিলেন তিনি। বনেদী মুসলিম পরিবারের একজন মহিলার জন্য এটিও একটি সাহসী পদক্ষেপ।
গ্রন্থের শুরুতে তিনি “রূপজালাল” গ্রন্থে স্বল্প পরিসরে গদ্যে স্বীয় বংশের বিবরণ ও পুস্তক লিখবার উদ্দেশ্য অধ্যায় রচনা করেন। এটি তথ্যপূর্ণ, আবেগ মিশ্রিত ও হৃদয়গ্রাহী। একে বাংলা আত্মজীবনী রচনার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
“রূপজালাল” এর গদ্য ও পদ্য থেকে উদ্ধৃত করার মতো অনেক অংশ আছে। “রূপজালাল” গ্রন্থে গদ্যের একটি অংশ-
“বিধাতা রমনীদিগের মন কি অদ্ভূত দ্রব্য দ্বারা সৃজন করিয়াছেন, যাহা স্বাভাবিক সরল ও নম্র। তাহাতে কিঞ্চিৎ মাত্র ক্রোধানল প্রজ্জ্বলিত হইলেও লৌহ বা প্রস্তর বৎ কঠিন হইয়া উঠে। আমার এই বাক্য শ্রবণে মহিষী উত্তর করিল, হ্যা ভাল বলিয়াছেন, তাই ত বটে, কোথায় দেখিয়াছেন, রমনীগণ এক পুরুষকে পরিত্যাগ করিয়া, পুরুষান্তর আশ্রয় করে। বরং পুরুষেরা একটি রূপবতী যুবতী দেখিলেই পূর্বপ্রেম এবং ধর্ম বিসর্জন দিয়া তাদের প্রতি আসক্তি হয় এবং তাহাকে প্রণয়িনী করিবার জন্য নানা প্রকার চেষ্টা করে। প্রভূর ইচ্ছায় যদি কোনক্রমে ঐ কার্য সুসম্পন্ন করিতে না পারে, তবে পূর্ব প্রণয়িনীর নিকট আসিয়া সহস্র শপথ করিয়া বলে, তোমাকে বিনা আমি আর কাহাকেও জানিনা। অধিক কি অন্য বামার রূপলাবণ্য আমার চক্ষে গরল প্রায় জ্ঞান হয়। পুরুষদিগের অন্ত:করণের স্নেহ চিরস্থায়ী নহে।”
এই উপন্যাসের ভাষা চিত্র বহুল ও জীবনধর্মী। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর (১০ আশ্বিন, ১৩১৪ বঙ্গাব্দ) নওয়ার ফয়জুন্নেসা চৌধূরানী লোকান্তরিত হন। পশ্চিম গায়ের নিজ বাড়ীতে নিজ কন্য আরশাদুন্নেসার পাশে তিনি চিরশয্যায় শায়িত আছেন।
মৃত্যুর ১০০ বছর পরে বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীকে সমাজ সেবার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ একুশে পদক ও সম্মাননা পত্র (মরণোত্তর) প্রদান করেন।
৩। হাজী সহিফা বিবি (১৮৫০-১৯২৬ খ্রি.)
হাজী সহিফা বিবি বেগম রোকেয়ার জন্মের আনুমানিক প্রায় দুই যুগ আগে সিলেট জেলার কুয়ারপাড় এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম জমিদার আলী রেজা। তাঁর পিতা ছিলেন লক্ষণ ছিরি ও কৌড়িয়ার জমিদার। সহিফা বিবি ছিলেন হাছন রাজার বৈমাত্রেয় বোন। তাঁর স্বামী ছিলেন হাজী মোজাফফর চৌধূরী। সহিফা বিবি সঙ্গীতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। সহিফা বিবির ৩ খানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় - ১। সহিফা সঙ্গীত, ২। ইয়াদ গায়ে, ৩। সইফা ও ছাহেবানের জারি। ছহিফা সঙ্গীত ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট থেকে আব্দুল জব্বার কর্তৃক প্রকাশিত হয়। এটি একটি সঙ্গীত গ্রন্থ। এতে ৪৮টি গান স্থান পেয়েছে। তাঁর গ্রন্থে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ভাবের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মরমী কবিদের কোন নির্দিষ্ট ধর্ম নেই। সহিফা বিবির কাব্যে তা’ লক্ষনীয়। এ গ্রন্থের প্রথমে তিনি সরস্বতী বন্দনা করেছেন। পরবর্তী সঙ্গীতটি আবার কাওয়ালী। তাঁর এই গ্রন্থে সূফীতত্ত্ব ও বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাবও লক্ষনীয়। তিনি উর্দু, হিন্দী ও বাংলা ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন।
একমাত্র সহিফা সঙ্গীত বাদে তাঁর অন্য দুটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়না। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত এবং নারীদের শিক্ষার জন্য তাঁর কবিতা ও গানে নারীদের জীবনের অনেক অবহেলিত ও সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে। যে কালে মেয়েরা কাব্য রচনার কথা দুরে থাক তাদের লেখপড়ার সুযোগ ছিলনা, সে সময়ে নারী জাগরণে সহিফা বিবির এমন সাহিত্য রচনা কৃতিত্বের দাবী রাখে। তাঁর কবিতা ও বহু গানে সে কালের সমাজের সামাজিক বৈষম্য ও নানা অসংগতির চিত্র ফুটে উঠেছে। সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি ব্যঙ্গ করে লিখেছেন -
ধনে জনে ভাল যারা
    মিথ্যা হইলে জয়ী তারা,
দুঃখিত এতিম বিধবারা।
চোরা যারা ভাল তারা
    চোরা ধনে বুক তার পুরা।
টাকায় বলে যা’ না
    ধরা কি বুঝিবে বেচারীরা।
সহিফা ভাবিয়া বলে সারা
     তেলেঙ্গী বিষম চোরা।
নারী জাগরণে সহিফা বিবির রচনার সুর মাধুরী সহজভাবে মনকে ছুঁয়ে যায়। তিনি বহুবার হজ্বব্রত পালন করেছিলেন বলে সিলেট অঞ্চলে তিনি “হাজী বিবি” নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।
৪। করিমুন্নেসা খানম চৌধূরানী (১৮৫৫-১৯২৬ খ্রি.)
করিমুন্নেসা ছিলেন প্রখ্যাত মুসলিম মহিলা কবি নারী জাগরণের উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী। জহিরুদ্দীন মুহম্মদ আবু আলী সাবের ও রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধূরানীর জেষ্ঠা কণ্যা। করিমুন্নেসা চৌধূরাণী রংপুর জেলার পায়রাবন্দে এক অভিজাত সামন্ত পরিবারে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। নারী শিক্ষা ও নারী মুক্তির অগ্রদুত বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২ খ্রি.) ছিলেন করিমুন্নেসার ছোট বোন।
সমকালীন রক্ষণশীল মুসলিম জমিদার পরিবারের রীতি রেওয়াজ মোতাবেক করিমুন্নেসা কে কঠোর পর্দা প্রথা পালন করতে হয়েছে এবং সে সময় একমাত্র কোরআন তেলাওয়াত ব্যতীত তাঁর আর অন্য কোনো শিক্ষা লাভ ঘটেনি। কিন্তু জ্ঞান লাভ করার দুনির্বার আকাঙ্খা ছিল করিমুন্নেসার প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাঁর নিজের চেষ্টার ফলে এবং লেখাপড়ার প্রতি গভীর আগ্রহের কারণে তাঁর ভাইদের পড়াশুনা শুনে তিনি কিছু কিছু বাংলা ও ইংরেজী শিখেছিলেন।
১৪ বছর বয়সে করিমুন্নেসার বিয়ে হয় টাঙ্গাইলের দেলদূয়ার জমিদার পরিবারের আব্দুল হাকিম খান গজনবীর সঙ্গে। দুই নাবালক পুত্র সন্তান সহ ২৩ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। করিমুন্নেসা একজন প্রগতিশীল মহিলা ছিলেন। কতিপয় আত্মীয় স্বজনদের মতের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর পুত্রদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি তাঁর ছেলেদের কোলকাতায় নিয়ে গিয়ে তাদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর বড় ছেলে আব্দুল করিম গজনবীকে উচ্চশিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। ছোট ছেলে আব্দুল হালিম গজনবীকেও তিনি কোলকাতা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি করে দেন। উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে করিমূন্নেসার দু’ছেলে পরবর্তীকালে বাংলার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। করিমুন্নেসা তাঁর ছোট বোন বেগম রোকেয়ার বিদ্যা শিক্ষা লাভের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। যখন সমাজের প্রায় সবাই বেগম রোকেয়ার বাংলা শিক্ষার বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন তখন করিমুন্নেসা রোকেয়াকে সমর্থন দিয়েছেন এবং তাঁর লেখায় উৎসাহ জুগিয়েছেন। করিমুন্নেসা নিজেও একজন মোটামুটি খ্যাতিমান কবি ছিলেন। তিনি “দু:খ তরঙ্গিনী” ও “মানস বিকাশ” নামক দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন (বাংলা পিডিয়া : মুহম্মদ আব্দুল সালাম)। কিন্তু বর্তমানে এই গ্রন্থ দু’টির কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই। তিনি অনেক পারিবারিক ঘটনা ও সামাজিক বিষয় নিয়েও কবিতা লিখেছেন। কোলকাতার একটি পত্রিকায় দু’টি কবিতা দু’বারে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখিকার নাম ছিল “সাবের বংশের জনৈকা কন্যা”। “বিষাদ সিন্ধু” রচয়িতা মীর মোশারফ হোসেন মেয়েদের ব্যাপারে তৎকালীন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি উদার ছিলনা। তিনি তাঁর “গাজী মিয়ার বস্তানী” বইতে কোথায়ও কোথায়ও প্রায় অশ্লীল ভাষায় বেগম রোকেয়ার ভগ্নী করিমুন্নেসা কে আক্রমন করেছেন। মহিলার অপরাধ তিনি লেখাপড়া ও সামাজিক কার্যকলাপে আধুনিক ছিলেন। করিমুন্নেসা তাঁর সমকালীন অনেক প্রগতিশীল, শিক্ষা, বুদ্ধি বৃত্তিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি আব্দুল হামিদ খান ইউসুফ জাই কর্তৃক সম্পাদিত “আহাম্মদী” নামক একটি বাংলা পাক্ষিক পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। পত্রিকাটি হিন্দু মুসলিম ঐক্য কামনা ও মুসলমানদের শিক্ষা, সামাজিক ও রাজনৈতিক কৃষি বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশ করতো।
১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মীর মোশাররফ হোসেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার জমিদার এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। মীর মোশারফ হোসেন কে তাঁর সাহিত্য কর্মের ব্যাপারে করিমুন্নেসা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। মীর মোশারফ হোসেন রচিত অমর গ্রন্থ “বিষাদ সিন্ধু (১৮৮৫ খ্রি.)” প্রথম সংস্করনটি করিমুন্নেসা কে উৎসর্গ করেন। বেগম রোকেয়া ও তাঁর বিখ্যাত “মতিচুর” গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণটি বড় বোন করিমুন্নেসার নামে উৎসর্গ করেন। করিমুন্নেসা খানম চৌধূরানী ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ সেপ্টেম্বর ৭১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
৫। আজিজন নেসা খাতুন (১৮৬৪-১৯৪০ খ্রি.)
আজিজন নেসা খাতুন পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভূক্ত চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার জালালপুর গ্রামে আনুমানিক ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন (তথ্যসুত্র : আবুল আহসান চৌধূরী ; আজিজন নেসা খাতুন, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬ খ্রি. পৃষ্ঠা ১১)। তাঁর পিতার নাম মীর চাঁদ আলী এবং মাতার নাম সৈয়দা রাহেলা খাতুন। লেখিকার পিতা  পৈতৃক নিবাস ছিল নদীয়া জেলার গোয়াড়ী কৃষ্ণনগরে। তাঁর পিতা পুলিশ ইন্সপেক্টর ছিলেন এবং কর্মক্ষেত্র ছিল চব্বিশ পরগনা। লেখিকা তৎকালীন মুসলিম নারীর মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা শিক্ষার সুযোগ পাননি। পারিবারিক পরিম-লে পিতার উৎসাহে সামান্য বাংলা ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেছিলেন। পরে স্বামী গৃহে তিনি আরবী, ফারসী, ইংরেজী ও বাংলা শিক্ষার সুযোগ লাভ করেছিলেন। তিনি বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তৎকালীন কোলকাতার সেন্টজেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক মৌলবী মেয়ারাজ উদ্দীন আহমদের যতœ ও চেষ্টায় তিনি বাংলা, ইংরজী ও ফারসী ভাষা রপ্ত করেছিলেন। তিনি তিনবার পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি। তাঁর প্রথম বিবাহ হয় সাতক্ষীরা বাঁশদহ গ্রামের মোকাদ্দেসুল হকের সঙ্গে। তিনি সংস্কৃতিমনা ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁরই অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে রচিত ও প্রকাশিত হয় লেখিকার একমাত্র গ্রন্থ “হারমিট বা উদাসীন”। এটি ছিল একটি অনুবাদ গ্রন্থ।
তাঁর প্রথম স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর সাতক্ষীরার তালা উপজেলার অন্তর্গত তেঁতুলিয়ার জমিদার হামিদ উল্লাহ খানের সঙ্গে লেখিকার বিবাহ হয়। কিন্তু সেখানে ও তাঁর সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তৃতীয় বিবাহ হয় সাতক্ষিরা বাঁশদহ গ্রামের কাজী লুৎফর রহমানের সঙ্গে। লেখিকা নি:সন্তান ছিলেন। তাঁর তৃতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি সহোদর মীর আহমদ আলীর বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সাহিত্য চর্চ্চা, সমাজ সেবা ও শিক্ষকতার কাজে তিনি বাকী জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তাঁর শয়ণ কক্ষের প্রধান আসবাব ছিলো অসংখ্য বই। তৎকালীন দুস্থ নারীদের জন্য শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি নিজ খরচে তাঁর বাসায় নিরক্ষর নারীদের শিক্ষার জন্য ক্লাশের ব্যবস্থা করেন। তাঁর সমকালে কবিতা ও কবিতা পুস্তক প্রণয়ন করে তিনি যথেষ্ট সম্মান পেয়েছিলেন (তথ্যসুত্র: মিসেস এম. রহমান, “ভুলভাঙ্গা” সওগাত [নব পর্যায়] চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা, ১৩৩৩ আশ্বিন, বঙ্গাব্দ)। আজিজন নেসা খাতুন ইংরেজী কবি পার্ণেলের “হারমিট” কাব্যটি বাংলায় “উদাসীন” নামে অনুবাদ করেছিলেন। গ্রন্থটি ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক মোকাদ্দেসুল হক, বাঁশদহ, খুলনা। গ্রন্থটি কোলকাতা ৯২, বৌ বাজার ষ্ট্রিট থেকে বামাচরণ মজুমদার মুদ্রিত করেন। এটি ১০ পৃষ্ঠার একটি ক্ষুদ্র কবিতা গ্রন্থ। তাঁর অনেক কবিতা “নবনুর” ও “ইসলাম প্রচারক” পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে এই মহৎ বিদ্যোৎসাহী নারী বসির হাটের জামালপুরে মৃত্যুবরণ করেন। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ