বুধবার ১৫ জুলাই ২০২০
Online Edition

পৌরবিপণীর অন্ধকার জগতে মেয়র আরিফের অভিযান

কবির আহমদ, সিলেট: প্রবাসী অধ্যুষিত বিভাগীয় নগরী সিলেটকে আধ্যাত্মিক নগরী বলা হয়। ওলীকুল শিরোমনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) এর মাজারে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজারো ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা জিয়ারত করতে আসেন। অন্য ধর্মের লোকজনও বাদ পড়েননি। এই নগরীতে ৩৬০ আউলিয়ার পদার্পণে আধ্যাত্মিক নগরী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে সিলেট। এক সময়ে সিলেটে মদ, জুয়া, পতিতাদের পদচারণা তথা অসামাজিক কার্যকলাপ চিন্তা করাই যেতো না। বর্তমানে পবিত্র নগরী নামে খ্যাত সিলেট নগরীতে অপবিত্র পদচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সিলেট নগরীর বেশ কয়েকটি হোটেল এবং দক্ষিণ সুরমার কয়েকটি হোটেলে নারী ব্যবসা জমজমাট আকার ধারণ করেছে। নগরীর পৌরবিপণী আলাউদ্দিন আলোর মালিকানাধীন একটি হোটেলে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী গতকাল সোমবার অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন পতিতাকে আটক করেছেন। পুলিশ এদেরকে আইনের আওতায় এনেছে। শুধু আলোর ব্যাচেলার হোটেল নয়, লালদিঘীর পারের টাউন বোর্ডিং, লালবাজারের বেশ কয়েকটি হোটেল এবং দক্ষিণ সুরমার স্টেশন রোডে হোটেল সিতারা, হোটেল সায়মন, কদমতলীর হোটেল হকসহ বেশ কয়েকটি হোটেলে নিয়মিত দেহ ব্যবসা চলছে। অভিযোগ রয়েছে এসব হোটেল থেকে পুলিশ নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে অবাধে তাদেরকে অসামাজিক কার্যকলাপে সহযোগিতা করেই যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে কোতোয়ালী এবং দক্ষিণ সুরমা থানা পুলিশ। আবার থানায় নেয়ার পথে দালালরা পতিতাদের বড় অংকের টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয়। তবে কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ গৌছুল হোসেন ও দক্ষিণ সুরমা থানার অফিসার ইনচার্জ খায়রুল ফজল পৃথকভাবে দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে জানান, উঠতি বয়সের এসব পতিতারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রথমে দালালের মাধ্যমে পরে নিজে নিজে এসে খদ্দের সংগ্রহ করে এসব হোটেলে উঠে। পুলিশ খবর পাওয়া মাত্র অভিযান চালায় এবং আইনের আওতায় আনে। কোতোয়ালী থানার অদূরে সুরমা মার্কেটের ভিতরে তেতলী ইউনিয়নের ওসমানী আলী চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন সুরমা হোটেলে রমরমা দেহ ব্যবসা চলছে। পুলিশের সাথে বনিবনা না হলে মাঝেমধ্যে এই হোটেলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সুরমা মার্কেটের নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, সুরমা মার্কেটের পিছনে কোতোয়ালী থানার ওসির বাসভবন এর পরেই থানা, এখানে বসেন সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালী)। দক্ষিণ প্রান্তে পুলিশ সুপারের বাসভবন। এরপরও কিভাবে এই হোটেলে অসামাজিক কার্যকলাপ চলে, কেন পুলিশ বন্ধ করতে পারে না এই প্রশ্ন এসব ব্যবসায়ীদের। শুধু সুরমা মার্কেট নয়, লালবাজার কিংবা লালদিঘীর পার নয়, নগরীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত উপশহরে ভিআইপি পতিতাদের নিয়ে চলছে দেহ ব্যবসা। বাসা ভাড়া করে ঢাকা থেকে সুন্দরী মহিলাদের এনে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এক ধরনের অসাধু মানুষ। আর তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পাচ্ছে পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও সিটি এসবি’র হাতে গোনা কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
শাহজালালের পুণ্যভূমি সিলেট নগরীর পৌরবিপণী মার্কেটের দ্বিতীয়তলায় অসামাজিক কার্যকলাপের একটি আস্তানায় অভিযান করেছেন সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। গতকাল সোমবার দুপুরে সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন ওই মার্কেটের দ্বিতীয়তলা পরিদর্শনে গিয়ে এই ‘নিষিদ্ধ পল্লীর’ সন্ধান পান তিনি। পরে পুলিশ ডেকে অভিযান চালিয়ে ওই ‘ব্যাচেলর হোটেল’ নামের ওই ‘পাপরাজ্জি’ থেকে ৬ পতিতা ও হোটেলের দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে আবদুস শহীদ নামের এক কর্মচারী অভিযানকালে উপস্থিত সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে জানিয়েছে ওই ‘নিষিদ্ধ পল্লীর’ মালিক নগরীর মেন্দিবাগের আলাউদ্দিন আলো।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন পৌরবিপণী মার্কেটের দ্বিতীয়তলায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ঘর তৈরি করে ‘ব্যাচেলর হোটেল’ নাম দিয়ে ভোগদখল করে আসছিলেন আলা উদ্দিন আলোসহ কয়েক ব্যক্তি। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের লক্ষ্যে সোমবার দুপুরে পৌরবিপণী মার্কেট পরিদর্শনে যান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তখন ওই মার্কেটের নিচতলার ব্যবসায়ীরা জানান, মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অবৈধভাবে নির্মিত ‘হোটেল ব্যাচেলরে’ দীর্ঘদিন ধরে অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছেন আলা উদ্দিন আলো।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই তথ্য পেয়ে দ্বিতীয় তলা পরিদর্শনে যান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এসময় মার্কেটের পশ্চিম-দক্ষিণ পাশে নির্মিত একটি ‘ব্যাচেলর হোটেলে’ গিয়ে তিনি অসামাজিক কার্যকলাপের প্রমাণ পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
 মেয়রসহ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই হোটেলে থাকা ৬ নারী সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে নিচের একটি রুমে আত্মগোপন করেন। পরে সিটি করপোরেশনের কর্মচারীরা ওই রুম থেকে তাদেরকে বের করে আনেন। এছাড়া হোটেলের দুই কর্মচারীকেও আটকে রাখেন তারা।
খবর পেয়ে পুলিশ এসে দুই কর্মচারী ও ৬ পতিতাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। আটককৃতরা হলো- সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার বাইদুল্লাহপুর গ্রামের আবদুল মুক্তাদিরের ছেলে আবদুস শহীদ ও জকিগঞ্জ উপজেলার কসকনকপুর কামারপাড়ার মৃত আব্বাসের ছেলে মোস্তাক আহমদ, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের শওকত আলীর মেয়ে জ্যোতি (২৮), সুনামগঞ্জের বিশ্বম্বরপুর থানার পলাশ গ্রামের ঝর্ণা (১৯), গাজীপুরের শ্রীপুর থানার তাজুল ইসলামের মেয়ে আঁখি (২২), গাজীপুর সদর থানার সজিব আহমদের মেয়ে সুমি (২৮), ভোলা থানার পাটিয়া গ্রামের প্রিয়া (১৯) এবং ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নবীনগর থানার নতুনপূর্ণ গ্রামের কদ্দুস মিয়ার মেয়ে কাজল (২৪)। এসময় হোটেল থেকে জুয়া ও মাদক সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়।
অভিযানকালে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে হোটেলের কর্মচারী আবদুস শহীদ জানায়, মেন্দিবাগের আলাউদ্দিন আলো ওই হোটেলের মালিক। হোটেলটির তত্তাবধান করেন মালেক নামের এক ব্যক্তি। অভিযান টের পেয়ে মালেক হোটেল থেকে পালিয়ে গেছে। প্রতিদিন ২০০টাকা মজুরিতে তিনি ওই হোটেলে কাজ করেন বলে জানান শহীদ।
এ ব্যাপারে আলাউদ্দিন আলো গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ব্যাচেলর হোটেল’র সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই। সন্ধ্যাবাজার ব্যবসায়ী সমিতি সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে লিজ নিয়ে ওই হোটেল পরিচালনা করে বলে দাবি করেন তিনি।
এসএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ফয়সল মাহমুদ জানান, আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। হোটেলের ভেতরে সুড়ঙ্গ তৈরী করে এরকম অসামজিক কার্যকলাপের পেছনের মদদদাতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সিলেট পৌরবিপণী মার্কেট একটি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট। দ্বিতীয়তলায় নির্মিত ঘরগুলো অবৈধ। মার্কেটের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ঝুকিপূর্ণ এই ভবনটি কিছুদিনের মধ্যে গুড়িয়ে দিবে সিসিক। আলোর অন্ধকার জগত সহ নগরীর বিভিন্ন অপরাধ জগতে নিয়মিত অভিযান চালাবেন মেয়র আরিফ, সহযোগিতা করবেন এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়া এমন প্রত্যাশা পূণ্যভূমি সিলেটের ধর্মপ্রাণ মানুষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ