শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অর্থায়ন দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত করবে

বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সরকার আরো বেশি সুযোগ সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরানুযায়ী ব্যাংক মালিকদের চাপে ইতোমধ্যে সরকার সরকারি তহবিলের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে জমা রাখার জন্য সরকারি দফতরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়াও আইনানুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের নগদ অর্থ জমার যে আইন রয়েছে তা শিথিল করে ৬ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। ব্যাংকসমূহের তারল্য সংকট নিরসনের জন্য এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারীর ফলে নগদ অর্থের সমস্যা দেখা দেয় এবং তাদের মধ্যে কোন কোন ব্যাংক গ্রাহকদের আমানতের টাকাও ফেরৎ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে নতুন ঋণ দেয়া  তো দূরের কথা। সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরের ব্যাংক- ফার্মারস ব্যাংক এ ধরনের একটি ব্যাংক। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এই ব্যাংকটি মূলধনও খেয়ে ফেলেছে। আবার ঋণের নামে প্রদত্ত বিপুল অংকের অর্থ গ্রহীতার নামে জমা হওয়ার পরিবর্তে এই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন খান আলমগীরের একাউন্টে জমা হবার অভিযোগ উঠলেও অদ্যাবধি সরকারের তরফ থেকে বিশাল এই অভিযোগটি তদন্তের জন্য কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এই যে, সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকটিকে বাঁচানোর জন্য সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের প্রত্যেককে ১৬৫ কোটি টাকা (১.৬৫ বিলিয়ন) করে এবং আইসিবি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ৫৫ কোটি টাকা (৫৫০ মিলিয়ন) ফার্মাস ব্যাংককে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মোট পরিমাণ হচ্ছে ৭১৫ কোটি টাকা। প্রদত্ত অর্থ ব্যাংকটি পরিশোধিত মূলধন হিসেবে গণ্য হবে। আমানতকারীদের অর্থ লোপাটকারী দুর্নীতিগ্রস্ত ফার্মারস ব্যাংককে বিপুল অংকের এই অর্থ প্রদানকে অনেকে দুর্নীতির অর্থায়ন বলে অভিহিত করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, যে ব্যাংকটির মালিক-পরিচালকদের দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের জন্য শাস্তি হওয়ার দরকার ছিল তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের উদ্ধার করার জন্য বিপুল অংকের সরকারি তহবিল প্রদান দুর্নীতিবাজদের উৎসাহিত করবে এবং এতে দেশের অর্থখাতের অবস্থার আরো অবনতি ঘটবে।
অর্থমন্ত্রী জনাব মুহিত প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংক এবং অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের শ্রেণিকরণকৃত ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬৩,৪৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৫৮৮৭৭ কোটি টাকা এবং ব্যাংক বহির্ভূত অর্থ প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৪৫৫৮ কোটি টাকা। উল্লেখ্য যে, শ্রেণিবদ্ধ ঋণের মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত ৬ থেকে ৯ মাস পুরাতন ঋণ (নিম্নমান), অপরিশোধিত ৯ থেকে ১২ মাস পুরাতন ঋণ (নিম্নমান), অপরিশোধিত ৯ থেকে ১২ মাস পুরাতন ঋণ (সন্ধেহজনক) এবং ১২ মাস ও তদূর্ধ্ব মেয়াদের অপরিশোধিত ঋণ, (মন্দ ঋণ)। অবশ্য ক্রেডিট কার্ড ও ট্রেড ফাইনান্সি ইনস্ট্রুমেন্ট ভিত্তিক ঋণের বেলায় তিন মাস পুরাতন ঋণ ও নিম্নমানের ঋণের আওতায় পড়ে। ব্যাংক ও অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহ ইতোমধ্যে তাদের মন্দ ও খেলাপী ঋণের মধ্য থেকে যথাক্রমে ৩৪ কোটি ৪৩ লক্ষ ৮০ হাজার এবং ৩২ কোটি টাকা Write off তথা আদায়যোগ্য নয় বলে গণ্য করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের CIB’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্যাংক ও অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহে ২,১৩,৫৩২ জন ব্যক্তি ও কোম্পানির কাছে ৬ লক্ষ কোটি টাকার অধিক বকেয়া ঋণ রয়েছে তার মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৬৩,৪৩৫ কোটি টাকা (৯.৪%)।
দৈনিক যুগান্তর গত ২৯ শে মার্চ ‘হদিস নেই ২২ হাজার ২২১ কোটি টাকার’ শীর্ষক এক রিপোর্টে জানিয়েছে যে মাত্র ২০ জন ঋণ খেলাপকারী বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ২২ হাজার ২২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এক পয়সাও শোধ করেনি। সরকারি সিদ্ধান্তে এই বিশাল অংকের ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। অথচ গত এক বছরে অবলোপনকৃত অর্থের এক পয়সাও ব্যাংকগুলো আদায় করতে পারেনি। এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো হচ্ছে আরব বাংলাদেশ ব্যাংক (এবি ব্যাংক), আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, স্টান্ডার্ড ব্যাংক এবং এনসিসি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী শীর্ষ ২০ জন ঋণ খেলাফকারীর কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা ৩২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপনকৃত আলোচ্য ২২ হাজার ২২১ কোটি টাকা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সব চেয়ে বেশি খেলাপী ঋণ রয়েছে চট্টগ্রাম ভিত্তিক ইলিয়াস ব্রাদার্স নামক একটি কোম্পানির কাছে। ১৩ টি ব্যাংকে তাদের ৮৯০ কোটি টাকা খেলাপী যা দু’টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সমান। এই ঋণের বিপরীতে বিধি অনুযায়ী কোনও প্রকার জামানত রাখা হয়নি বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে এই ঋণের লেনদেন হয়েছে এবং এই কারণে তাদের কাছ থেকে কোনও টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র ভূমিহীন, বর্গা চাষি ও ক্ষুদ্র চাষিদেরই জামানতবিহীন ঋণ দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো তাদের ঋণও প্রকৃত অর্থে বিনা জামানতে দেয় না। সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে সমিতির স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ও সদস্যদের শেয়ার সঞ্চয়ের টাকা ঋণের বিপরীতে তারা বন্ধক দেয়। শিল্প ও বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে জমি ও দালানকোঠা এবং বাণিজ্য সামগ্রী জামানত থাকে, সংশ্লিষ্ট ঋণ গ্রহণকারী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামানতকৃত সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ আদায় করা হয়। এসব ক্ষেত্রে যেহেতু কোনও প্রকার জামানত রাখা হয়নি, সেহেতু এই টাকা আদায়ের সম্ভাবনা নেই। এই ঋণের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী ও দেওয়ানী আইনের অধীনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে হয়তো অর্থ আদায়ে কিছুটা অগ্রগতি হতে পারে। এব্যাপারে বিশিষ্ট ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ কিছু মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ঋণদাতা ও গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তার মতে, অবসরে যাওয়া এমডিদের কার আমলে কত ঋণ, কিভাবে গেছে, কার কাছে গেছে খতিয়ে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমার মতে, তাদের সাথে ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও বোর্ডের সদস্যদের সামনে আনা দরকার। বোর্ডের চেয়ারম্যানদের প্রত্যেকেই রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। এই আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া কোনও বড় ঋণই অনুমোদন পায়নি। সুপেরিয়র রেসপন সিবিলিটির জন্য দায়ী রাজনৈতিক নেতাদের সামনে আনতে না পারলে অর্থ আদায় সম্ভবপর নয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বাজারে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি, ব্যাংক ও অর্থ প্রতিষ্ঠানসমূহের আমানত হ্রাস এবং সরকারি উদ্যোগে নির্বাচনমুখী ঋণের মহোৎসব শুরু করায় ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ডিসেম্বর (২০১৭) মাসে এই তারল্যের পরিমাণ ছিল ৮৬,৬৯৫ কোটি টাকা, জানুয়ারি (২০১৮) মাসে তা ৭১,২৩৬ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে হ্রাস পেয়েছে ১৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। নির্বাচনকে সামনে রেখে এ টাকা কোথায় যাচ্ছে? ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসের হিসাব ধরলে এর পরিমাণ আরো বাড়ে। ঐ মাসে তারল্যের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এর মধ্যে আরো ৫২৬৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে। ঋণ বিতরণ ভালো যদি তা ফেরত আসে এবং উৎপাদনমূলক কাজে বিনিয়োগ হয়। কিন্তু তা হচ্ছে বলে মনে হয় না। বকেয়া ও খেলাপী ঋণের পাহাড় সৃষ্টি করে নতুন ঋণ দিতে গেলে সব অর্থ প্রতিষ্ঠানকেই দেউলিয়া হতে হবে। বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর ফল ভাল হয় না। দ্রব্য মূল্যের যে অবস্থা, আসন্ন রমজানে মানুষের নাভিশ্বাস সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
এফবিআই বা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কথা ক্ষমতাসীনদের অনেকেই বলে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ব্যাপারে এফবিআই-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেল রিজার্ভ চুরির ব্যাপারে একটা তদন্ত হয়ে দোষীদের শাস্তি দিতে আমরা পারলাম না। আমাদের অমার্জনীয় ব্যর্থতার অর্থ কি এই নয় যে, আমরা এ জন্য দায়ী? বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ চাষি, শ্রমিক, মজুর, ধোপা-নাপিতরাও বুঝে। শাসক শ্রেণি তাদের এত বোকা মনে করা ঠিক নয়। যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বয়ং রিজার্ভ চুরির সাথে জড়িত সেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার অধীনস্থ ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাৎ কিভাবে রোধ করবে? জাতির কাছে এখন এটি একটি বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে এখন সকল সাংবিধানিক ও পাহারাদারী প্রতিষ্ঠান অকার্যকর অবস্থায় আছে। সরকার দলীয় স্বার্থে তাদের ব্যবহার করছেন। এ অবস্থায় অন্যান্য খাতের ন্যায় অর্থখাতও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ অপরিহার্য। তা নিশ্চিত করতে হলে একটি পরিবর্তন প্রয়োজন। এই সরকার নিজের দলীয় স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই করতে পারেন না। তাই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ