বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

গভীর সমুদ্রে শিশু শ্রমিক

শিশুরা আজ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছে। কলকারখানা, ওয়েল্ডিং মেশিন, গার্মেন্টস শিল্প, নির্মাণ শিল্প, ট্যানারী শিল্প, গৃহপরিচারিকার কাজসহ বিভিন্ন কাজে শিশুরা নিয়োজিত রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে। বেশি কাজ করিয়ে কম মজুরি দেয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং ছোট খাটো ভুল-ভ্রান্তিতে গুরুতর শাস্তি দেয়া শিশুশ্রমের ক্ষেত্রে সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও বে-আইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে যেমন- চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য পাচার। এসব বাদেও ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা নানান প্রলোভনে ও দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে শিশুদের। এমনই একটি কাজ হলো গভীর সমুদ্রে জেলেদের সহযোগিতা। শিশুরা কেন শ্রমে নিয়োজিত হয় তার বহুমাত্রিক দিক রয়েছে। ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার’র নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক তথ্যকেন্দ্র কর্তৃক পরিচালিত ১২টি জাতীয় ও ১৯৬টি স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ পরিবীক্ষণে দেয়া যায়, দারিদ্র্য আর ক্ষুধার জ্বালা শিশু শ্রমের প্রাথমিক কারণ হলেও এর পেছনে কাজ করে অনেক মাত্রা। বাবা-মা ও বিভিন্ন উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের মালিক আগ্রহে এবং শ্রম বাজারে শ্রমিকের চাহিদা বৃিদ্ধর ফলে শিশুরা শ্রমে নিয়োজিত হতে উৎমসাহ পায়। এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী শিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমে নিয়ে যেতে বধ্য করে। আবার শিশুদের তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার বিনিময়ে অথবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাচার করে এনে শ্রমে নিয়োজিত করে থাকে। এভাবেই মোচলেকাবদ্ধ শ্রম বা শিশুশ্রম দাস প্রথার সৃষ্টি হয়।
বয়সের সীমা পরিমাপ করলে যে বয়সে একটি শিশু স্কুলে যাওয়ার কথা, পারিবারিক পরিবেশে স্নেহ, আদর-সোহাগে মমত্ববোধের মাঝে হেসে খেলে বিকশিত হওয়ার কথা, সে সময়ে শিশুটিকে বেছে নিতে হচ্ছে নানা রকম কঠিন কাজ। এ সকল কাজ করতে গিয়ে শিশুরা একদিকে যেমন বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না অন্যদিকে তারা নানা বঞ্চনা আর ঝুঁকির শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্য বঞ্চনার পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছে এবং কেউ কেউ অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি কারখানায় ন্যূনতম কাজের পরিবেশ নেই ফলে নানারকম বিপদের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
শিশুশ্রম দাস : শিশুদের বিভিন্ন ধরনের শ্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত করার পাশাপাশি তাদের দেশের জেলা ও উপজেলা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে এনে তাদের দিয়ে জোর করে নানা ধরনের শ্রমে বাধ্য করা হয়ে থাকে। দেশের সর্বদক্ষিণে বাগেরহাট জেলাধীন দুবলার চরে শিশুদের ধরে এনে শ্রমে বাধ্য করার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এমএমসির উদ্যোগে সম্পন্ন অনুসন্ধান থেকেও এর সত্যতা পাওয়া যায়। দুবলার চরে মৌসুমে অর্থাৎ কার্তিক থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের মহাজন মাঝি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা নানান কৌশলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ১০ থেকে ১৫ বছরের শিশুদের অহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। ভাল কাজের প্রলোভন দেখিয়ে দুবলার চরে প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে পেটে ভাতে শ্রমদাস হিসেবে ব্যবহার করে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ ব্যবহৃত হচ্ছে মহাজনদের বিকৃত যৌনাচারে। রোগে শোকে কেউ মারা গেলে তার কপালে জুটছে না এক টুকরো মাটি। শিশুদের কেউ মরে গেলে জেলে মহাজনরা লাশ সাগর তীরে বালি চাপা কিংবা পানিতে ভাসিয়ে দেয়।
বাংলাদেশে শিশুশ্রমের একটি চরম রূপ হল শ্রম দাস বা বন্ডেড শিশুশ্রম। দুবলার চর অনেকগুলো চরের সমষ্টি।  একদিকে সাগর অন্যদিকে সুন্দরবন ঘেরা এসব জেলে পল্লী থেকে কারও পালাবার কোন পথ নেই। লোকালয় থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম এলাকায় এসব জেলে পল্লীর অবস্থান। নৌযানই হচ্ছে যাতায়াতের একমাত্র বাহন। শুটকি মৌসুমকে ঘিরে দুবলার চরে প্রতিবছর গড়ে ওঠে ৮/১০ টি জেলে পল্লী। সাগরে মাছ ধরা থেকে শুরু করে শুটকি বানিয়ে বস্তায় ভরা পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ হাজার লোক কাজ করে জেলে পল্লীতে। এদের মধ্যে মহাজন রয়েছে কয়েক হাজার। প্রতি বছর চলে শুটকি মৌসুম। নানা শ্রেণীর লোকের মধ্যে অন্তত ৩ হাজার শিশু কিশোর নিয়োজিত রয়েছে। শুঁটকি মৌসুমকে টার্গেট করে এক শ্রেণীর দালাল বড় বড় শহরের রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড কিংবা লঞ্চ স্টেশনে ওঁৎ পেতে থাকে। পথহারা ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের মিথ্যা প্রলোভনে প্রথমে আশ্রয় দেয়। এরপার স্বল্প মূল্যে দুবলার চরের মহাজনদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এখানে এসে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। একটু এদিক ওদিক হওয়ার কোন উপায় নেই। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মুখ বুজে সহ্য করে মহাজনদের সব অন্যায়-অত্যাচার। ক্রীতদাস হিসেবে রাতদিন কাজ করতে হয় সমানভাবে। টু শব্দ করার সাহস নেই কারো।
দুবলার চরের শিশু শ্রমিক : সুন্দরবনের দুবলার চরের মাছ শুঁটকি শ্রমিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিশুদের নিয়ে আসে। এসব শিশু এখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করছে। এককালীন সামান্য মজুরির বিনিময়ে তাদের দিয়ে কাজ করানো হয়। দুলবার চরের বিভিন্ন চরে শিশুশ্রম দাসদের ওপর এমএমসি’র নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক তথ্যকেন্দ্রর অনুসন্ধানী গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা তথ্য ছিল এরকম-
ছেলেটির পরনে লুঙ্গি। গায়ে পুরনো ময়লা সোয়েটার।  বয়স ১৩। গায়ের রং কালো। দুবলার অঞ্চলের আনারকোলে চরে সমুদ্রের মাছ বাছাই কাজ করে ইস্রাফিল। বাড়ি খুলনার কয়বার। বাবা ইয়াসিন আলী কয়বার দিন মজুরের কাজ করে। মা-বাবা ছাড়া  ৩ বোন, ২ ভাইয়ের সংসারে চরম দরিদ্রতার মধ্যে বসবাস। ইস্রাফিলকে এখানে নিয়ে এসেছে চরের মৎস্যজীবী মনির উদ্দিন (৪৫)। সে তাকে মাছ শুকানোর কাজে লাগিয়েছে। বেড়ানোর কথা বলে এখানে নিয়ে এসেছিলেন তাকে। ‘এমন কষ্ট করতি হবে জাইনলে আসতাম না’ বলল ইস্রাফিল। আরো জানায়, এ চরে শুধু কাজ আর কাজ। কোনও বিশ্রাম নেই, নেই কোন বিনোদন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের অন্তর্গত শরণখোলা থানায় ১৩টি চর নিয়ে গঠিত দুবলার চর। এই চরণগুলোতেই মৎস্যজীবীরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাছ বেচাকেনা ও শুঁটকির ব্যবসা করে থাকে। গড়ে তুলে অস্থায়ী নিবাস। এ সময়ে শুধু ইস্রাফিলের মতো আরো প্রায় ৩ হাজার শিশুকে মাছ বাছাই ও শুকানোর কাজ করানো হয়। সংবাদপত্রের পাতায় এদের শ্রমদাস হিসেবে চিহ্নিত করে বেশ ক’বছর ধরেই বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দুবলার চরের শিশুশ্রম প্রসঙ্গে বাগের হাট জেলার পুলিশ সুপার মাহবুব আহমেদ জানালেন, ‘আমার, আপনার ঘরে কাজের ছেলেরা কাজ করে, দুবলার চরের শিশুরাও ঠিক তেমিনই। এটি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।’ মংলা কোস্টগার্ডের জোনাল কমান্ডার এম এ মতিন বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় সবসময় মনিটর করা হয় না। যখন আমরা শিশু শ্রমিকের বিষয়টি জেনেছি, তখনই অভিযান চালিয়ে বেশিকিছু শিশুকে উদ্ধার করেছি। স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতা পেলে তারা উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ