শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

দেশহীন হওয়ার শঙ্কায় আসামের নাগরিক তালিকায় নাম না থাকা বাসিন্দারা

নাগরিক তালিকায় বাদ পড়া অধিকাংশ বাসিন্দাই মুসলমান বাংলা ভাষাভাষি

২৬ মার্চ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট : অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়ে পূর্বের আইন বাতিল করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন তাতে, আসামের বিশাল সংখ্যক বাসিন্দার নাগরিকত্ব হারিয়ে দেশহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশ’ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার পেছনে যেমন ভূমিকা রেখেছে আদালতের আদেশ, তেমন কাজ করেছে রাজনৈতিক সমর্থনও। একদিকে আদালত বলেছেন, সন্দেহভাজনদেরকেই তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিল করতে হবে। আর অন্য দিকে রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি ভোটে জয়লাভের জন্য নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ‘বহিরাগতদের’ বাছাই করতে নাগরিকত্ব তালিকা হালনাগাদ শুরু করেছে। এর ফলে বিপাকে পড়েছে আসামে বসবাসকারী সব ধর্মের বাংলাভাষী মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে আসামে বসবাসরত প্রায় ৫০ লাখ বাংলাভাষী মানুষ যদি নাগরিকত্ব না পায় তাহলে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মতোই অবস্থা হতে পারে।

ভারতের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের আসামের রাজ্য সরকার জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকা (এনআরসি) সম্পূর্ণ করার পথে। আর মাস চারেকের মধ্যেই এই তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। এরই মধ্যে প্রথম তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এতে অনেক বাংলাভাষী মানুষ বাদ পড়েছেন। ফলে আসামের বাঙালিদের রোহিঙ্গাদের মতোই দেশ ও নাগরিকত্বহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল হয়েছে। প্রথম তালিকায় কয়েক প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাসকারীদেরও নাগরিকত্বের তালিকায় নাম ওঠেনি। রাজ্য সরকারের দাবি, বাদপড়া আবেদনকারীদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত তথ্যে ‘অসামঞ্জস্যতা’ পেয়েছেন তারা। মিয়ানমার রাখাইনে বসবাসকারী লাখ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রহীন করে দিয়েছিল ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের বলে। এবার নাগরিকত্ব আইনের বলি হতে পারেন আসামের বাসিন্দা বাংলাভাষীরা। আর বাংলাভাষীদের মধ্যে বেশিরভাগই মুসলমান।

নতুন তালিকায় ওঠেনি আসামের সংখ্যালঘুদের নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক দল ‘অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের’ (এআইইউডিএফ) মাওলানা বদরুদ্দিন আজমল এবং রাধেশ্যাম বিশ্বাসের নামও। এই দুইজনের নাম ছাড়াও আসামের নতুন তালিকা থেকে বাদ পড়েছে দলটির আরও কয়েকজন নেতার নাম। একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার নামও বাদ পড়েছে তালিকা থেকে।

আসামের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ‘এনআরসিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য জমা পড়া আসামের ৪৮ লাখ বাসিন্দার আবেদনপত্রে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত তথ্যে অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে। এসব আবেদনকারীদের বা এদের মধ্যে বেশিরভাগ আবেদনকারীদেরই নাগরিক তালিকায় স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।’

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই তালিকা প্রকাশের জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। প্রায় ২ কোটি নাগরিকের তথ্য যুক্ত খসড়া তালিকাটির প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর। তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন আসামের ৩ কোটি ৩০ লাখ বাসিন্দা। এসব আবেদনকারীর মধ্যে এখনও ১ কোটি ২৮ লাখ আবেদনকারীর নাম তালিকাতে ওঠেনি। যাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় আসবে না, তাদের নাগরিকত্ব থাকবে না। আসামের জন্য প্রথম নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি হয়েছিল ১৯৫১ সালে। আসামের ৪৫ শতাংশ বাসিন্দাই বাঙালি, যারা সংখ্যায় অসমীয়দের চেয়েও বেশি। এর কারণ, আদিবাসী বাসিন্দারা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে নিবন্ধন করিয়েছে , অসমীয় ভাষাভাষী হিসেবে নয়।

অনেক বছর ধরেই আসামে ‘বহিরাগতদের’ বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন চলছে। প্রাথমিকভাবে ওই আন্দলোনের লক্ষ্য ছিল নৃতাত্ত্বিকভাবে যারা অসমীয় নয় তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এখন ‘বহিরাগত’ বলতে ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী’ বোঝানো হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই ‘বহিরাগতবিরোধী’ প্রচারণাকে ব্যবহার করেই ২০০৬ সালে রাজ্যটিতে ক্ষমতাসীন হয়। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ‘বহিরাগতদের’ কারণে আসামের পরিচয় ‘বিনষ্ট’ হওয়া রুখতে তারা জাতীয় নাগরিকত্বের তালিকা হালনাগাদ করবে। আর হয়েছেও তাই। হালনাগাদ করা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বাংলাভাষীরা।

‘ইলিগ্যাল মাইগ্রেন্টস ডিটারমিনেশন বাই ল’ বা আইএমডিটি নামের অবৈধ অভিবাসী সংক্রান্ত আগের যে আইনটি ছিল তাতে বলা হয়েছিল, যতক্ষণ না পর্যন্ত অবৈধ হিসেবে প্রমাণিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত নাগরিকত্ব বহাল থাকবে। কিন্তু ২০০৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ওই আইনের সেই ধারাটি উল্টে দিয়েছে, যার ভিত্তিতে চালু থাকা জাতীয় নাগরিকত্ব হালনাগাদ প্রকল্প এখন লাখ লাখ মানুষের ঘর ছাড়া হওয়ার দশা করেছে। অবৈধ অভিবাসী সংক্রান্ত নতুন আইনে বলা হয়েছে, যাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সরকার নিশ্চিত নয়, তাদের নিজেদেরই নাগরিকত্বের প্রমাণ হাজির করতে হবে।

কলকাতাভিত্তিক রিসার্চ গ্রুপের প্রধান আনিতা সেনগুপ্তা বলেছেন, ‘যদি আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দারাই নাগরিকত্ব বঞ্চিত হয়, তাহলে রাখাইনে যেরকম শরণার্থীদের ঢল দেখা গিয়েছিল আসামেও আমাদের সেরকম শরণার্থীদের ঢল দেখতে হতে পারে। একই রকম মানবিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে সামনে।’

বাংলাভাষী যে ৪৮ লাখ আবেদনকারী এখনও বংশ পরম্পরায় আসামের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণ হাজির করতে পারেননি, তাদের রোহিঙ্গাদের মতো শরণার্থী হয়ে ওঠার আশঙ্কার দিকে ইঙ্গিত করে রাজ্যটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক উৎপল বরদলই প্রশ্ন রেখেছেন, ‘আসাম কি পরবর্তী রাখাইন হতে যাচ্ছে?’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ