শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গ্রীষ্মের শুরুতে খুলনায় সুপেয় পানির সঙ্কট

 

খুলনা অফিস : গ্রীষ্ম মওসুম শুরুতেই খুলনা মহানগরী ও জেলার উপজেলাগুলোতে সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একদিকে গ্রীষ্মের তাপদাহ, খরা, অপরদিকে  ভূ-গর্ভস্থ পানির যথেচ্ছা ব্যবহারে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দিন দিন এ সঙ্কট আরও ভয়াবহ আকার ধারন করছে। আগামী জুন মাসে বর্ষা মওসুম শুরুর আগ পর্যন্ত  সুপ্রিয় পানির এ সঙ্কট দূর হচ্ছে না বলে খুলনা ওয়াসা জানিয়েছে।

খুলনা ওয়াসার দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, তাদের চারটি জোনের ৮৫টি গভীর নলকূপ থেকে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে গ্রাহকদের প্রতিদিন পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন নগরীতে পানির চাহিদা ১১ কোটি লিটার। চাহিদার ৪০ ভাগ পানি খুলনা ওয়াসা তার গ্রাহকদের সরবরাহ করতে পারে। বাকী ৬০ ভাগ নগরিকরা নিজস্ব গভীর অগভীর নলকূপ (টিউবওয়েল), নদী, খাল পুকুরসহ অন্যান্য জলাশয় থেকে পানি সংগ্রহ করে তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

সূত্র জানায়, চলতি গ্রীষ্ম মওসুম খুলনা নগরীতে ভূ-গর্ভস্থ পানির লেয়ার ৩৩ থেকে ৩৫ ফিট নিচে নেমে গেছে। অন্য সময় শীত ও বর্ষা মওসুম পানির লেয়ার অবস্থান করে ১৮ থেকে ২০ ফিটের মধ্যে। নগরীতে যেসব বাড়ির মালিকরা এই গ্রীষ্মে তাদের টিউওয়েলে পাম্প দিয়ে পানি উত্তোলন করতে পারছেন না তার অন্যতম কারণ হল নগরীর ভূ-গর্ভস্থ পানির লেয়ার আরও নিচে নেমে যাওয়া।

নগরীর অধিকাংশ বাড়ির মালিক বর্তমানে সাধারণ পাম্পের বদলে সাবমার্সেবল পাম্প ব্যবহার করছেন তাদের  দৈনন্দিন নিজেদের ও ভাড়াটিয়াদের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য। তারপরেও ভূ-গর্ভস্থ পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় নগরবাসী চাহিদা মোতাবেক পানি পাচ্ছেনা। একই সমস্যার মধ্যে রয়েছে খুলনা ওয়াসার পাম্প স্টাটিং ওয়াটার লেবেল।

বর্তমান সময়ে ওয়াসার গভীর নলকূপগুলো প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে বেলা ২টা পুনরায় বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা পাম্প চালিয়েও চাহিদা মাফিক পানি তার গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে বেগ পেতে হচ্ছে। ওয়াসার কর্মচারীরা তাদের পাম্প মেশিনগুলো সচল রাখতে সার্বক্ষণিক তদারকি, কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন ও সমস্যাবলী নিয়ে নিয়মিত সভা করে চলেছেন।

এদিকে নগরীতে প্রতিদিনের চাহিদা মোতাবেক পানি না পাওয়ার কারণে গ্রাহকরা ওয়াসার অফিসে সশরীরে ও ফোন/মোবাইলফোনে সমাধান চাচ্ছেন। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের পথ নেই বলে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। বিকল্প উপায়ে পানির চাহিদা মেটাতে নগরবাসী ২৭শ’ লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন পানি ভর্তি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি থেকে ক্রয় করতে পারেন। এজন্য ওয়াসার পুরনো অফিস থেকে শিববাড়ি পর্যন্ত এক গাড়ি পানির জন্য দাম দিতে হবে পাঁচশ’ টাকা, শিববাড়ির পরে দৌলতপুর বা কেসিসির শেষ সীমানা পর্যন্ত গাড়ি প্রতি গুণতে হবে সাতশ’ টাকা।

নগরীতে পানির সমস্যার বিষয়ে খুলনা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম জানান, গরম বাড়ছে তাই পানির সমস্যা বাড়ছে। ইতোমধ্যে ওয়াসা এলাকায় অবস্থিত পাম্পগুলো সচল রাখার জন্য যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। যাতে কোন পাম্প নষ্ট হলে দ্রুত তা সচল করা যায়। তিনি জানান, নগরীর কোন টিউবওয়েলের মালিক তার টিউবওয়েল থেকে পানি না পেলে নতুন করে ওয়াসার পানির লাইনের জন্য আবেদন করতে পারেন।

তিনি আরও জানান, কেসিসির ৯ থেকে ৩১নং ওয়ার্ড পর্যন্ত ২শ’ ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত খুলনা ওয়াসার নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর মধ্যে বসবাসকারি কোন বাড়ির মালিক নতুন আবেদন করলে ওয়াসা স্টিমেট করে কম সময়ে অল্প খরচে পানির সমস্যা মেটাতে পারেন।

খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, দুই হাজার ৫শ’ ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে গোপালগঞ্জের মধুমতি থেকে পাইপলাইনে খুলনা মহানগরীতে ওয়াসার নতুন প্রকল্পের কাজ ৭৮ ভাগ শেষ হয়েছে। দুটি চায়না কোম্পানি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে রিভার ক্রসিং, ডেভেলপমেন্ট এর কাজসহ জুলাইতে কমিশনিং হবে। তিনি আশা করেছেন চলতি ডিসেম্বর মাসের মধ্যে খুলনাবাসী ওয়াসার পানি পাওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের পানির সমস্যা সমাধান পাবেন।

রূপসা নদীর নিচ থেকে পাইপ বসানোর কাজ সম্পন্ন ঃ মধুমতি নদী থেকে খুলনা শহরে পানি আনার জন্য রূপসা নদীর নিচ থেকে পাইপ বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নগরীর ভেতরের সড়ক কেটে বিশাল বিশাল পাইপ বসানোর পর নদীর তলদেশের প্রায় ৫০ ফুট নিচ দিয়ে এ পাইপ আনা হলো। গত ১৯ মার্চ এই কাজ শেষ হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছে, এটি অত্যন্ত জটিল কাজ ছিলো। তাই এটি সম্পন্নের মধ্যদিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ অনেকাংশে এখন সফল।

খুলনা নগরবাসীর পানি সমস্যা নিরসনের জন্য ২০১১ সালে পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় খুলনা থেকে ৭১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মধুমতি নদী থেকে পানি এনে তা পরিশোধনের পর সিটি কর্পোরেশনে সরবরাহ করা হবে। এজন্য দুই হাজার ৫৫৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০১১ সালের ২৭ জুন একনেকে অনুমোদন পায়। সরকারের সঙ্গে উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ও এডিবি এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, নগরীর রূপসা ফেরিঘাট এলাকায় রূপসা নদীর প্রশস্ততা ৩৫০ মিটার। গত ৩ মার্চ নদীর ওপারে রূপসা (উপজেলা) ঘাট থেকে আরও ২৫০ মিটার দূরে পুরাতন রেলস্টেশনের কাছ থেকে এই পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়। গত ১৯ মার্চ এই কাজ শেষ হয়েছে। নগরীর অংশে পাইপ উঠেছে কেসিসি’র নতুন বাস টার্মিনালের সামনে। মোট ৭০০ মিটার অংশে মাটির ৫০ ফুট নিচ থেকে এ পাইপ আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হরিজেন্টাল ডিরেকশনাল ড্রিলিং বা এইচডিডি মেথডে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে এই পাইপ বসানো হলো। নদীর তলদেশের পাইপের ব্যাসার্ধ এক মিটার।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক খান সেলিম আহমেদ বলেন, আটটি প্যাকেজের অন্যতম হচ্ছে রূপসার সামন্তসেনার পরিশোধনাগার থেকে পরিশোধিত পানি রূপসা নদী অতিক্রমসহ সঞ্চালন পাইপ লাইন ও বিতরণ পাইপ লাইন স্থাপন। কাগজে-কলমে যা ‘ক্লিয়ারিং ওয়াটার ট্রান্সমিশন লাইন ইনক্লুডিং রিভার ক্রসিং’ এবং ‘ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ নেটওয়ার্ক’ প্যাকেজ। দু’টি প্যাকেজেরই কাজ পেয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ইঞ্জিয়ারিং কর্পোরেশন। প্রথম প্যাকেজের মাধ্যমে রূপসার সামন্তসেনা থেকে পাইপ লাইন নদীর তলদেশ দিয়ে খুলনায় আনা হলো। 

কয়রায় খাবার পানির তীব্র সংকট ঃ গ্রীষ্ম মওসুম শুরুতেই কয়রায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানির উৎস্য পুকুরগুলোয় পর্যাপ্ত পানি না থাকায় লোকজনের দুর্দশার অন্ত নেই। দূর দূরান্ত থেকে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে প্রতিদিন শত শত নারী পুরুষদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে মহারাজপুর কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশি এবং দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে আংশিক গভীর নলকুপের পানি খাবারযোগ্য। বাকী অংশের মানুষ পুকুরের পানি ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া বাগালী, মহেশ্বরীপুর ও আমাদি ইউনিয়নের কোন গভীর নলকুপের পানি মোটেও খাবারযোগ্য নয়। এ সকল এলাকার লোকজন সারাবছর পুকুরের পানি পান করে দিন পার করছে। ২০০৯ সালের ২৫মে আইলার ভয়াবহ জলোচ্ছাসে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন পুরোপুরি লোনা পানিতে তলিয়ে গেলে খাবার পানির পুকুরগুলো ও পুকুর পাড়ে স্থাপিত পিএসএফ ব্যবহারের অনুপযোগি হয়ে পড়ে। একটানা তিন বছর জোয়ার ভাটা ওঠানামায় পলি পড়ে পুকুরগুলো ভরাট হয়ে খাবার পানির উৎস নষ্ট হয়ে যায়। 

এলাকাবাসির সাথে কথা বলে জানা গেছে, আইলা পরবর্তী সময় সরকার ও এনজিও সংস্থাগুলো ভরাটি পুকুরগুলোর সংস্কার কাজ শুরু করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য। 

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন ইউনিয়নে কয়েকটি করে পুকুর এবং পিএসএফ সংস্কার করা হয়েছে। এ সকল পুকুর থেকে প্রতিদিন সকাল হতে গভীর রাত অবধি শত শত নারী পুরুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে পায়ে হেঁটে এসে সারিবদ্ধভাবে ঘন্টার ঘন্টার পর দাঁড়িয়ে কলস ভর্তি করে খাবার পানি সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। 

বাগালী ইউনিয়নের বামিয়া সরকারি পুকুরে গিয়ে দেখা যায়, পুকুর পাড়ের পিএসএফে শত শত নারী লাইন দিয়ে কলস হাতে পানির জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ সময় ছবিরন্নেছা ও শুকলা মন্ডল নামের দু’মহিলা সহ উপস্থিত সকলে জানায়, সংসারের কাজকর্ম ফেলে রেখে পানির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে প্রতিদিন এখান থেকে পানি নিয়ে বাড়ীতে ফিরতে হয়। অধিক সময় অপচয় হওয়ায় অনেকে বাড়ীতে কাজ কর্ম ঠিকমতো করতে না পারায় সাংসারিক অশান্তি সৃষ্টি হয় বলে তারা জানান। যে সকল এলাকায় গভীর টিউবওয়েল রয়েছে সেগুলো চাহিদার তুলনায় কম বিধায় সেখানেও লোকজনের ঘন্টার ঘন্টার পর দাঁড়িয়ে থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এ জন্য এলাকা ভিত্তিক নলকুপের সংখ্যা বৃদ্ধির দাবী জানানো হয়। 

বাগালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছাত্তার পাড় বলেন, মরু এলাকার পশু পাখি যেমন পানির জন্য দিকবিদিক ছোটাছুটি করে তেমনি বাগালী ইউনিয়নের ১০ সহ¯্রাধিক পরিবার পানির জন্য ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছোটাছুটি করছে। পানীয় জলের সংকট লাঘবে বেশী বেশী পুকুর খনন ও পিএসএফ স্থাপন করা গেলে এর সমাধান হবে বলে ইউপি চেয়ারম্যান আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উপজেলার ৫নং কয়রা গ্রামের আব্দুল হামিদ সরদার জানান, তাদের খাবার পানির জন্য ১০ কিলোমিটার দুর জোড়শিং ও বজবজা এলাকা থেকে পানি এনে পান করতে হয়। এ রকম সমস্যা ৪নং কয়রা, মঠবাড়ী, তেতুলতলারচর, পাথরখালী, কাটকাটাসহ অনেক এলাকার মানুষের। 

কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রশান্ত কুমার পাল বলেন, উপজেলার অধিক অংশ এলাকায় খাবার পানির সমস্যা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের সহযোগিতায় কয়েকটি পুকুর সংস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কিছু এলাকায় টিউবওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ব্যবস্থা করা হবে।

এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল কুমার সাহা বলেন, কয়রা এলাকায় পানির সমস্যা লাঘবে টিউবওয়েল ও রেইন ওয়াটার হার্ভেসটিং বসানো জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ