শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আলুর কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় চাষিদের মাথায় হাত

এফ.এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা : বিগত বছরগুলোতে আলুর কাক্সিক্ষত মূল্য না পেয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলায় এবার আলু চাষে চাষিরা মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় জেলার ৪টি উপজেলার মধ্যে ৩টি উপজেলাতেই চলতি বছর আলু চাষের লক্ষমাত্রা অর্জিত হয়নি। অপর দিকে জেলার একমাত্র জীবননগর উপজেলাতে চলতি মওসুমে ৬৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রেকর্ড পরিমাণ ৭৫০ হেক্টর জমিতে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্ত বর্তমানে আলুর কাক্সিক্ষত মূল্য কিংবা ক্রেতা কোনটাই না থাকায় আলু নিয়ে চাষিরা বিপাকে পড়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মওসুমে জেলায় আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ হাজার ৩৩ হেক্টর, সেখানে অর্জিত হয়েছে ১ হাজার ৯৬০ হেক্টর। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৭০৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৬২০ হেক্টর। আলমডাঙ্গা উপজেলায় ২৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ২১০ হেক্টর। দামুড়হুদা উপজেলায় ৪২৮ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৩৭০ হেক্টর এবং জীবননগর উপজেলায় ৬৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ৭৫০ হেক্টর।
সরেজমিনে জীবননগর উপজেলার আলু চাষের প্রধান এলাকা হাসাদাহ,বাঁকা ও রায়পুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে চাষিদের বাড়ির সামনে আলুর বিরাট বিরাট স্তুপ কিন্তু ক্রেতা নেই।
জীবননগর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের নতুন চাকলা গ্রামের মৃত দাউদ হোসেনের ছেলে কৃষক সেলিম হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে জানালেন- তিনি পৌনে ২ বিঘা জমিতে ডায়মন্ড জাতের আলু চাষ করে প্রায় ২শত মন আলু পেয়েছেন। বিগত কয়েকদিন ধরে বাড়িতে বসে আছেন কিন্তু ব্যাপারী বা ক্রেতা পাচ্ছেন না। একই গ্রামের চাষি জসিম উদ্দীন জানালেন- তিনিও ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন, আলুরও বাম্পার ফলন হয়েছে। অনেক চেষ্টার পর একজন ব্যাপারীকে সাড়ে ৬শত টাকা কুইন্টাল (প্রতি বস্তা ৮৫ কেজিতে ২ মণ, ৫ কেজি আবার ফ্রি) দরে আলু দিচ্ছিলেন, অর্ধেক আলু ওজনের পর ঐ ব্যাপারীর নিকট আলুর দাম পড়ে যাবার ফোন আসে। আর অমনি সে আলু না নিয়েই সে কেটে পড়ে। একই অবস্থা গ্রামের বড় চাষি সাইফুল ও তরিকুলদের। বাড়িতে আলু রাখার জায়গা নেই, তাই বাড়ির সামনের ভাগাড়ে বিরাট বিরাট স্তুপ। এ অবস্থায় বৃষ্টি হলেই বিপদ, আলু চাষই যেন তাদের অপরাধ হয়েছে।
চাষিরা জানালেন- প্রতি বিঘা জমিতে আলু উৎপাদন করতে তাদের খরচ হয়েছে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা আর সৌভাগ্যক্রমে ক্রেতা পেলে বিক্রি হচ্ছে ২৪/২৬ হাজার টাকায়। এর মধ্যে আলু তুলতে আবার প্রতি বিঘায় খরচ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার টাকা। তারপরও ক্রেতা মিলছে না।
জীবননগরের প্রায় ৯০ শতাংশ জমিতে ডায়মন্ড জাতের সাদা আলুর চাষ হয়েছে। এখানকার মাটিতে ডায়মন্ড জাতের আলুর ফলন ভাল হলেও চুয়াডাঙ্গা এলাকায় সাদা আলুর চাহিদা না থাকায় খুচরা বাজারে এর কোন ক্রেতা নেই। এখান মানুষ কার্ডিয়াল জাতের লাল আলু মানুষ বেশী পছন্দ করে। তাই গতকালও দর্শনার খুচরা বাজারে দেখা যায় সাদা (ডায়মন্ড) আলু প্রতি ৫ কেজির পাল্লা ৪০ টাকা দরে হাকলেও ক্রেতা মিলছে না।
চাষিরা জানালেন তারা আলু হিমাগারে রাখতেও ভয় পাচ্ছেন। কারণ গত বছর আলুর দাম না বাড়ার কারনে কারণে অনেকে খরচ না ওঠার ভয়ে হিমাগার থেকে আলু আনেনি,ফলে পুরাটাই লোকসান গুণতে হয়েছে। আবার এখনো পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা জেলায় সরকারি বা বেসরকারিভাবে কোন হিমাগার নেই। বাধ্য হয়ে আলু রাখতে যশোর বা ঝিনাইদহে যেতে হবে। সেখানে আলুর ভরা মওসুমে রয়েছে স্থান সংকট। সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গার চাষিদের আলুর চাষ কিংবা বাম্পার ফলন যেন গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গাস্থ খামারবাড়ীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাঈম আস সাকিব দৈনিক সংগ্রামকে জানালেন- সারাদেশেই আলুর ফলন ভাল হওয়ায় কিছুটা ক্রেতা সংকট দেখা দিয়েছে। সময়মত সংরক্ষণ করতে পারলে এ সংকট থাকবে না। আমাদের পক্ষ থেকে এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে এখানকার কৃষকদের সমস্যার কথা তুলে ধরে অবিলম্বে চুয়াডাঙ্গায় কৃষি পণ্য সংরক্ষণের জন্য একটি হিমাগার প্রতিষ্ঠার তাকিদ দেয়া হয়েছে। আশা করছি কৃষকদের স্বার্থে সরকার বিষয়টি সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করলে এ অবস্থা আর থাকবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ