সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ওবায়দুল কাদেরের থলের বিড়াল

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য থেকে তার দলের নির্বাচনী নীলনকশার থলের বিড়াল প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আমরা আমাদের কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন জয় করেছি। দেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সততা ও পরিশ্রমী নেতৃত্বের জন্য খুশি। আগামী নির্বাচনে আমাদের বিজয়ের বিষয়ে কোনো সঙ্কোচ ও দ্বিধা নেই। তিনি আরও বলেন, বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতির জন্য তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের আন্দোলনে দেশের মানুষ যেমন সাড়া দেয়নি, তেমনি আগামী নির্বাচনেও তাদের প্রত্যাখ্যান করবে। তিনি বলেন, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেশে বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। আর এ জন্যই দেশের মানুষ বিএনপির আন্দোলনের ডাকে কোনো সাড়া দিচ্ছে না। তারা জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে দেশি বিদেশি শক্তির সহায়তায় দেশকে অস্থিতিশীল করে আগামী নির্বাচনকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র করছে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দেশে আর কখনও আসবে না। আন্দোলনের নামে মানুষকে পুড়িয়ে যারা হত্যা করে, জনগণ আর তাদের গ্রহণ করবে না। কাদের বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ বিএনপিকে আর চায় না। আগে যারা বিএনপি সমর্থন করতো, তারাও এই দলটির নেতিবাচক রাজনীতির জন্য বিএনপি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বিএনপির শত শত নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবুজ সঙ্কেত না দেয়ার জন্য তাদের দলে নেয়া হচ্ছে না। বিএনপিতে এখন ভাটা চলছে। সেনা ছাইনিতে জন্ম নেয়া এই দলটিতে আর কখনও জোয়ার আসবে না। ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু বক্তব্য আর কথামালার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জন্য কাজও করে।
এর আগে এই ওবায়দুল কাদেরই বিএনপি সম্পর্কে বলেছিলেন যে, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলেও এই দলের রয়েছে বিপুল জনসমর্থন। তাদের খাটো করে দেখা ঠিক হবে না। তিনি আরও বলেছিলেন যে, বিএনপি ক্ষমতায়ও আসতে পারে। আর বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে আওয়ামী লীগাররা অসৎ পথে যেসব টাকা পয়সা রোজগার করেছেন, সেগুলো ভোগ করতে পারবেন না। দেশ ছেড়ে তাদের পালাতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই ওবায়দুল কাদের এত শক্তি কোথায় পেলেন? শুধু শক্তিই পেলেন না, তিনি বললেন, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। অর্থাৎ বিএনপিকে আমরা এমনভাবে খাঁচায় বন্দী করেছি যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করা হবে। এটা শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা।
আওয়ামী লীগ মনে করছে যে, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী রেখে তাকে যদি নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করা যায়, তা হলেই কেল্লা ফতে। আবার বিএনপি জানিয়ে দিয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবে না। এ দিকে ইউরোপ আমেরিকাসহ সারা বিশ্ব সরকারকে বলছে যে, ২০১৮ সালের নির্বাচন হতে হবে সকলের অংশগ্রহণমূলক। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য বলছেন যে, যথাসময়ে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সে নির্বাচনে কেউ যদি অংশ না নেয়, তা হলে সরকারের কী করার আছে! আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচনে সকল দলের অংশ গ্রহণ বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচন নিয়েও একই কথা বলেছিল গোটা দুনিয়া। শুধু ভারতের জোরে সে সব পরামর্শ উপেক্ষা করেছিল সরকার। সে সময় ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকার অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে ঐ একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচনকে সমর্থন করেছিল। শুধু তাই নয়, নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে অংশগ্রহণ করানোর জন্য ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল দিল্লি। এরশাদের ওপর কী ধরনের চাপ ভারত সৃষ্টি করেছিল, সে কথা তিনি ফাঁস করে দিয়েছিলেন। তারপরও এরশাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যখন রাজি হলেন না, তখন তাকে জোর করে সিএমএইচ-এ আটক রেখে নমিনেশন পেপারে তার সই নেয়া হয়েছিল। এরশাদ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের চিঠি দিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনে। কমিশন সে চিঠি আমলে নেয়নি। এভাবে সেবার সরকার নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখানোর চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যেমন বারবার বলছে যে নির্বাচন হতে হবে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। আর সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার ১০ কোটি ডলার বরাদ্দও করেছে। ইতিমধ্যে ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আর এ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। মার্কিন সরকারের মতে বাংলাদেশে স্বৈরশাসন জাঁকিয়ে বসেছে। এই সরকারের গত প্রায় ১০ বছরের শাসনে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে গেছে। শেয়ার বাজারে সরকারি কারসাজিকাররা লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়েছে। গুম-খুন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দ্রব্যমূল্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্যাস বিদ্যুৎ জ্বালানির দামও নাগালের বাইরে। এতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। জানা গেছে, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এই বলে সতর্ক করেছে যে, ভারতে যেন আওয়ামী লীগের সমর্থনে বাংলাদেশে নাক না গলায়। এখন পর্যন্ত ভারত সেটা মেনে চলছে। মেনে চলতে হচ্ছে, কারণ চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উত্তেজনাকর। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ভারতের জন্য প্রয়োজনীয়।
সরকারের আরও একটা পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয়। আর তা হলো, বিএনপি নেতাদের ওপর মামলা হামলা নির্যাতন চালিয়ে বিএনপিতে ভাঙন সৃষ্টি করা। আওয়ামী লীগ চাইছে, সেই খ-িত দলের একাংশ যোগ দিক এরশাদের জাতীয় পার্টিতে। তাতে একথা বলা সহজ হবে যে, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিজেদের অতীতের দিকে তাকালে দেখতে পাবে যে, শেখ মুজিবুর রহমানের বেদনাদায়ক মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ অনেক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেসব খ-িত অংশ টিকে থাকতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা এসে যখন দলের হাল ধরেন, তখন আওয়ামী লীগ আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। এক-এগারোর সরকারের সময় বিএনপির মান্নান ভূঁইয়া গং এবং আওয়ামী লীগের রাজ্জাক আমু তোফায়েল সুরঞ্জিত নতুন সংস্কারের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। তারা কেউই সফল হননি। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগই টিকে আছে। সুতরাং সরকারের এই পরিকল্পনাও সফল হবে না।
তা হলে ওবায়দুল কাদের কীভাবে বললেন যে, আগামী নির্বাচনে তাদের বিজয় এখন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তবে কি ওবায়দুল কাদেররা ভাবছেন যে, ২০১৪ সালের মতো পছন্দমতো কিছু নাম ঘোষণা করে তারা বলবেন যে, জিতে গেছি, জিতে গেছি? ২০১৪ সালে তো তাই করেছিল সরকার। ১৫৩টি আসনে তারা কেবল নাম ঘোষণা করেছিল। সেসব আসনে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করেনি। অর্থাৎ সে নির্বাচনকে নির্বাচন বলেই মনে করেনি সম্ভাব্য প্রর্থীরা। কমপক্ষে ৫০টি কেন্দ্রে একজন লোকও ভোট দেয়নি। এমন কি ১৪ দলের পোলিং এজেন্টরাও না। তা হলে কিসের সুবাদে ওবায়দুল কাদের বলছেন যে, তাদের অনুকূলে নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র? নাকি ভাবছেন সামরিক- বেসামরিক আমলাতন্ত্র তারা দলীয়করণ করেছে, পুলিশ প্রশাসনে চরম দলীয়করণ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন তাদের কব্জায়। বিচার বিভাগ অনুগত। সব মিলিয়ে তাদের বিজয় অবধারিত। আর বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে, তা হলে তো সোনায় সোহাগা। আর সে কারণেই খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। চেষ্টা চলছে তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার। খালেদা জিয়াকে বড় ভয়। সরকারের আশা ২০১৪ সালের মতো একটি নির্বাচন করার। তবে ওবায়দুল কাদের সাহেবকে বলতে চাই, ২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি ২০১৮ সালে নাও ঘটতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ