বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

বায়ু দূষণে রাজধানীতে বেড়ে যাচ্ছে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা

ইবরাহীম খলিল : এবছর জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে প্রতিদিন পাঁচশ’ মানুষ অ্যাজমা তথা শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত বছরও এই সংখ্যা ছিল চারশ’। ছয়শ’ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে অ্যাজমা আক্রান্তের সংখ্যা। তাই আসন সংকুলান হচ্ছে না। চিকিৎসকরা বলছেন, অ্যাজমা এখন আর শীতকালীন রোগ নয়। বায়ু দূষণের কারণে সারা বছরই এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে শহরে বসবাসকারী শিশুদের অর্ধেকই শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীদের স্থান সংকুলান না হওয়ায় এই হাসপাতালকে দেড় হাজার শয্যায় উন্নীত করার জন্য ইতোমধ্যে আবেদনও করা হয়েছে। বায়ু দূষণ রোধে শিগগিরই জোরালো ব্যবস্থা না নিলে দেশে অ্যাজমা প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী-পুরুষ সমান হারে আক্রান্ত হচ্ছেন অ্যাজমায়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত হারে বাড়ছে। যদিও পঞ্চাশ শতাংশ শিশুর অ্যাজমা চিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়।
জাতীয়ভাবে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে আন্তর্জাতিক ও হাসপাতালের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের আলোকে এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলেন, দেশে প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ অ্যাজমায় আক্রান্ত। অর্থাৎ দেশের প্রায় ১৭ কোটি হিসেবে এক কোটি ৩৬ লাখ মানুষ শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে ভুগছে। আক্রান্তের এই সংখ্যা ১০ শতাংশ অতিক্রম করলে অ্যাজমা মহামারী হিসেবে গণ্য হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে ধুলায় ধূসর পুরো রাজধানী। ধুলার কারণে বায়ু দুষণ হচ্ছে দ্রুত। আর বায়ু দূষণের শিকার হয়ে প্রতিদিন শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী। বিশেষ করে নবজাতকের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৫ জন নবজাতকই এখন অ্যাজমা বা শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলেন, আক্রান্তের এই সূচক ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে ধুলা দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এখন সারাবছরই অ্যাজমায় আক্রান্ত হচ্ছেন নগরবাসী। অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে সৃষ্ট ধুলা আর ফিটনেসহীন গাড়ির ধোঁয়াতেই মূলত দূষিত হচ্ছে রাজধানীর বাতাস।
 বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ অ্যাজমা রোগে ভুগছেন। বাংলাদেশে এ সংখ্যা প্রায় ৮৫ লাখ। শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে এ রোগের ভয়াবহতা।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতের সময় সাধারণত বাতাসে দূষণের জন্য দায়ী ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার পরিমাণ বেড়ে যায়। রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় ছয় হাজার ইটভাটা দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী। শীতে এগুলো চালু হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামত বেড়ে যাওয়ায় বাতাস স্বাভাবিকভাবেই দূষিত হয়ে পড়ে।
বায়ুর বৈশ্বিক মানদ-কে অনুসরণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করে। বায়ুর মান মাত্রার সূচক ১০০-এর ওপরে উঠলে তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে। বায়ুতে ক্ষুদ্র বস্তুকণা ও চার ধরনের গ্যাসীয় পদার্থ পরিমাপ করে এ সূচক তৈরি করা হয়।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী, বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা বা ‘পিএম ২.৫’-এর মানমাত্রা হচ্ছে প্রতি কিউবিক মিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম। ‘পিএম ১০’ বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণার মানমাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৫ সালে রাজধানীতে পিএম ২.৫-এর গড় ছিল ৮১ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৬ সালে ছিল ৭৬ মাইক্রোগ্রাম। পিএম ১০-এর গড় ২০১৫ সালে ১৪৮ মাইক্রোগ্রাম ও ২০১৬ সালে আরও বেড়ে হয়েছে ১৫৮ মাইক্রোগ্রাম।
২০১৬ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের কেইস প্রকল্পের আওতায় ঢাকার বায়ু দূষণের উৎস ও ধরন নিয়ে একটি জরিপ হয়েছে। নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব এয়ার রিসার্চের মাধ্যমে করা ওই জরিপে দেখা গেছে, ঢাকার চারপাশে প্রায় এক হাজার ইটভাটায় নভেম্বরে ইট তৈরি শুরু হয়। এসব ইটভাটা বায়ু দূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী।
 বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা.গোলাম মাঈনউদ্দিন বলেন, আমাদের দেশে হাঁপানি মূলত একটি বংশগত রোগ। অথচ অতিমাত্রায় বায়ু দূষণের কারণে বংশে কারো এমন রোগ না থাকা সত্ত্বেও হাঁপানিতে আক্রান্ত হচ্ছে আমাদের দেশের শিশুরা। তিনি বলেন, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড থেকে শুরু করে মার্কারি, লেডের মতো ভারী পদার্থ বাতাসে মিশে যাচ্ছে। এগুলো ফুসফুসের পাশাপাশি হৃদরোগ, যকৃতের সমস্যা ও গর্ভবতী মায়েদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
এদিকে রাজধানীতে ধুলাজনিত রোগ ব্যাধির প্রকোপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনগুলো। তারা বলছেন,  শহরে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে অচিরেই ধুলা দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস লাইনের খোঁড়াখুঁড়ির সময় যাতে ধুলা দূষণ না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি রাখতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনিটরিং বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ধুলা দূষণ বন্ধে এলাকাভিত্তিক করণীয় নির্ধারণ জরুরি।
বায়ু দূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় সরকার নির্মল বায়ুর জন্য শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সেই টাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের বহুতল ভবন, সড়কে উন্নত মানের ফুটওভার ব্রীজ, অনেক কর্মকর্তার বিদেশ সফর হয়েছে। কিন্তু সরকারি ওই তথ্যপ্রমাণ করছে দূষণ কমেনি, বরং বেড়েছে। তিনি বলেন, দেশের বেশির ভাগ ইটভাটায় দূষণ নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রযুক্তি নেই। সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পগুলোর নির্মাণ কাজ করার সময় তাতে ধুলা নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম উদ্যোগ বা পানি পর্যন্ত ছিটানো হচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ