বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

তিতিক্ষার মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক অন্ধকারে ॥ রাতে বাতি জ্বলে না

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কে(ফ্লাইওভার) রাতের বেলায় বাতি জ্বলেনা। আড়ম্বরপূর্ণ উদ্বোধনের পর কয়েকদিন ওই উড়াল সড়কে বাতি জ্বলতে দেখা যায়। গত কয়েকমাস ধরে আর বাতি জ্বলছে না। ফলে সন্ধ্যার পর ওই উড়ালসড়কজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। যানবাহনের আলোয় কিছুটা সময় আলোর বিচ্চুরণ ঘটলেও ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত আলো আধারীর খেলায় মেতে থাকে উড়াল সড়কটি। এতে করে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটছে। আর নানা ধরনের অপরাধের আখড়ায় পরিণত হওয়ার আশংকাও রয়েছে।
অনেক তিতিক্ষার এই উড়াল সড়কটি উদ্বোধন করা হয়েছে গত বছরের ২৬ অক্টোবর। এটির জন্য অপেক্ষার সময় বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণের বেশি; উন্নয়ন কাজের সময়ে বিড়ম্বনা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। অবশেষে উদ্বোধনের পর পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয় মৌচাক-মগবাজার উড়াল সড়কটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই দিন দুপুরে গণভবন থেকে এর উদ্বোধন করেন। সে সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, দৈনিক ৫০ হাজার যানবাহন ৮ দশমিক ৭০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই উড়াল সড়ক ব্যবহার করতে পারবে। উদ্বোধন ঘোষণার কিছুক্ষণ পর বেলা ১টার দিকে নানা রঙের পতাকা আর লাল-সবুজ কাপড়ে সাজানো উড়াল সড়কের নানা প্রান্ত দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়। অনেকেই মোটরসাইকেলে করে, কেউ আবার পায়ে হেঁটে এটি ঘুরে দেখেন। কয়েকটি খোলা ট্রাকে মাইকে গান বাজিয়ে উড়াল সড়কটিতে চক্কর দেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সেদিন উড়াল সড়ক দেখতে আসা সাখাওয়াত হোসেন নামের স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেছিলেন, “আমরা এই এলাকার মানুষ অনেক কষ্ট করেছি। এখন চালু হয়েছে এতেই আমরা খুশি। কিছু পেতে হলে কিছু ত্যাগ তো স্বীকার করতেই হয়।”
কিন্তু এই ত্যাগ স্বীকারের পর ওই উড়াল সড়কটি পুরোদমে উদ্বোধনে যে আনন্দ পেয়েছিলেন ব্যবসায়ী সাখাওয়াত,তা ক‘দিন বাদেই ফিকে হয়ে যায়। তার আশংকা,আলোহীন ওই উড়াল সড়কে রাতের বেলায় হতাহতের মত কি জানি কি দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এও আশংকা,উড়াল সড়কটি না জানি কোন কোন অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়।
জানা গেছে,মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটি উদ্বোধন করা হয়েছে চার মাস আগে। এর মধ্যে মৌচাক অংশে ট্রাফিক সিগনালের বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়েছে তিনবার। এই তার চুরি হওয়ার কারণে উড়াল সড়কটির নতুন অংশের ট্রাফিক সিগনালগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তার সাথে রাতের বেলায় মৌচাক,মালিবাগ,রামপুরা,রাজারবাগ,শান্তিনগর অংশে বাতি জ্বলে না। তিনবার বৈদ্যুতিক তার চুরির কারণে এখন আর নতুন করে তার না লাগানোয় অন্ধকারে যানবাহন চলাচলের সময় ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত ২ মার্চ ট্রাফিক সিগনালের তার চুরির ঘটনা ঘটে।
প্রায় ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই উড়াল সড়কের বাস্তবায়ন কতৃপক্ষ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি )। প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক এলজিইডির তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার পাল রোববার সন্ধ্যায় দৈনিক সংগ্রামকে জানান,মগবাজার- মৌচাক উড়াল সড়কটির সর্বশেষ অংশ উদ্বোধনের পর গোটা উড়াল সড়কটি কায়কর হয়। এ প্রকল্পটি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে উদ্বোধনের পরই। এই প্রকল্পের ডিজাইন-ড্রয়িংসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাগজপত্র তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এর সফট কপিও তাদেরকে দেয়া হয়েছে। এখন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনই প্রকল্পটির দেখভাল করবে। তাদের ওপরে সব দায়িত্ব এমনিতেই বর্তায়।
সুশান্ত কুমার পাল বলেন,মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটির সর্বশেষ উদ্বোধনের পর প্রায়ই বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে যায়। এ যাবত তিনবার তার চুরি হয়েছে। প্রথম দু‘বার তার চুরির পরই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তারাই তাদের পক্ষ থেকে দু‘বার তার লাগিয়েছে তাদের খরচে। এখন আবার তার চুরির পর কে টাকা খরচ করে তার লাগাবে এ জন্য টানাপোড়েনের কারণেই তার লাগানো হচ্ছে না। তিনি জানান,প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী কতৃপক্ষ হিসেবে এলজিইডির দায়-দায়িত্ব প্রকল্প শেষেও শেষ হয়ে যায় নি। তাই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বলে প্রথম দু‘বার তার লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আর কত খেসারত দেবে ? তারপরও তারা সমস্যা সমাধানে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে চেষ্টা করছেন বলে জানান।
মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটির বাংলামোটর, মগবাজার, তেজগাঁও,মালিবাগ রেলগেইট,রামপুরা অংশ পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায়। আর বাকী অংশ মৌচাক,মালিবাগ মোড়,রাজারবাগ,শান্তিনগর অংশ পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায়।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো: আসাদুজ্জামান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন,প্রকল্পটির উদ্বোধনের পর এটি দুই সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে,তা সত্য নয়। তারা (এলজিইডি) আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রকল্পটি আটকে আছে। আমরা কি ভাবে বুঝে নেব,তা নিয়েই এখন চিঠি চালাচালি করা হচ্ছে, বৈঠকও হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমরা প্রকল্পটির যার যার অংশ বুঝে নেব।
উড়াল সড়কটি নির্মাণের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কনষ্ট্রাকশনের একটি সূত্র জানিয়েছে,উদ্বোধনের পরই সেটি এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন তারাই সব কিছু দেখভাল করবে। তবে নিয়ম অনুযায়ী আগামী জুন পর্যন্ত উড়াল সড়কের কাঠামোগত কোন ত্রুটি হয় কি না সেটি দেখবে তমা কনষ্ট্রাকশান।
সূত্রটি জানায়,উড়াল সড়কটি উদ্বোধনের সময় সিগনাল বাতির তাপর, লাইটের বৈদ্যুতিক তার লাগানো হয়েছিল। কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই তার চুরি হয়ে যায়। ফের লাগানো হলে গত ২১ ফেব্রুয়ারি তার চুরি হয়। সর্বশেষ,গত ২ মার্চ তার চুরি হয়ে যায়। এখন এ খাতে আর কোন বরাদ্দ নেই তমার। তাই বিষয়টি এলজিইডিকে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে,মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের মৌচাক অংশের দুটি স্থানে ৫টি ট্রাফিক সিগনাল বাতি লাগানো হয়েছে। তার চুরির আগে সেগুলোতে আলো জ্বলতে দেখা গেছে,সিগনাল মোতাবেক যানবাহন চলাচলও করেছে। এখন তার চুরির পর চার লেনের ওই মৌচাক অংশের ট্রাফিক সিগনাল চলছে হাতের ইশারায়।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে যখন এই উড়াল সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর কয়েক ধাপে তা বেড়ে ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এ প্রকল্পে সৌদি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্থায়ন করে। প্রতি মিটার নির্মাণে গড়ে ১৩ লাখ টাকা খরচ পড়ে বলে সরকাররের ভাষ্য।
মৌচাক-মগবাজার উড়াল সড়ক সোনারগাঁও, মগবাজার এবং মালিবাগ রেলক্রসিং অতিক্রম করেছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সাতটি মোড়- সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, ওয়্যারলেস গেইট, মৌচাক, মালিবাগ, রামপুরা এবং শান্তিনগরের ওপর দিয়ে গেছে। চার লেইনের এ উড়াল সড়কে ওঠা-নামার জন্য তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা, সোনারগাঁও হোটেল, মগবাজার, রমনা (হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল সংলগ্ন রাস্তা), বাংলামোটর, মালিবাগ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও শান্তিনগর মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে ১৫টি র‌্যাম্প।
ভূমিকম্প সহনীয় করার জন্য এ উড়াল সড়কে ‘পট বিয়ারিং’ এবং ‘শক ট্রান্সমিশন ইউনিট’ সংযোজন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কের মিডিয়ান বরাবর কলামের ওপর এ উড়াল সড়ক নির্মাণ করায় নিচের সড়কের উপযোগিতা কমবে না। এটির নির্মাণ কাজ করা হয়েছে তিন ভাগে। একটি অংশে রয়েছে সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত, আরেকটি অংশে শান্তিনগর-মালিবাগ-রাজারবাগ পর্যন্ত এবং শেষ অংশটি বাংলামোটর-মগবাজার-মৌচাক পর্যন্ত। এর মধ্যে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত অংশটি ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ উন্মুক্ত করা হয়। ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর এর ইস্কাটন-মৌচাক অংশ যান চলাচল উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। আর সোনারগাঁও হোটেলের দিকে নামার র‌্যাম্পটি গত ১৭ মে খুলে দেওয়া হয়।
ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও নাভানার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ‘সিমপ্লেক্স নাভানা জেভি’ এবং চীনা প্রতিষ্ঠান দ্য নাম্বার ফোর মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন ওভারসিজ কোম্পানি (এমসিসিসি) ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এর নির্মাণ কাজ করে।
দীর্ঘ অপেক্ষা আর স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের পর গত ২৬ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়  মৌচাক-মগবাজার উড়াল সড়ক।
ঢাকার কেন্দ্রভাগে অন্যতম ব্যস্ত এবং চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছয় বছর ধরে এই নির্মাণকাজের জন্য দারুণ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও চলতি পথের যাত্রীদের। বেহাল রাস্তার কারণে মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর এলাকার বিপণি বিতান ও দোকানপাটের ব্যবসায়ীরা হয়েছেন ক্ষতির শিকার। প্রতিদিন চলাচলের দুর্ভোগে পড়ে অনেকেই ওই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা নেওয়ায় স্থানীয় ভবনমালিকদেরও বিপাকে পড়তে হয়েছে।
নির্মাণ কাজ শুরু করার পরপরই এ উড়াল সড়কের নকশার ত্রুটি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন আসে সংবাদমাধ্যমে, যার সুরাহা এখনও হয়নি। বাঁ দিকে স্টিয়ারিংয়ের কথা মাথায় রেখে বিদেশী প্রকৌশলীর করা নকশায় নির্মিত এ উড়াল সড়কে ডানে যাওয়া বা রাইট টার্নের ব্যবস্থা না রাখা, ওঠা-নামার র‌্যাম্প জটিলতাসহ বেশ কিছু ত্রুটির কথা সে সময় বলেছিলেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ