শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

খালেদা জিয়ার জামিন

* কারামুক্তিতে বাধা নেই: মওদুদ
* জামিন আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হবে: এটর্নি জেনারেল
স্টাফ রিপোর্টার : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন  বেগম খালেদা জিয়াকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে এই চার মাসের মধ্যে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
খালেদা জিয়ার বয়স, শারীরিক অসুস্থতা, সাজার মেয়াদ, নিয়মিত বিচারিক আদালতে হাজিরাসহ বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে এই জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, উচ্চ আদালতের এই আদেশের ফলে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা বিএনপি চেয়ারপার্সনের মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই। আজ মঙ্গলবারই তিনি মুক্তি পাবেন। তবে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জানিয়েছেন, এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আজ মঙ্গলবার চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করবেন তারা।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের দণ্ড নিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। কারান্তরীণ হওয়ার ৩৩ তম দিনে তার জামিন আদেশ দিলেন সর্বোচ্চ আদালত।
আদালত তার জামিন আদেশে বলেছেন, ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা, সাজার পরিমাণ, নিয়মিত বিচারিক আদালতে হাজিরা এবং মামলার পেপারবুক এখনো প্রস্তুত না হওয়ায় জামিন মঞ্জুর করা হলো। একইসঙ্গে আগামী চার মাসের মধ্যে মামলার পেপার বুক প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়ে আদালত বলেছেন, পেপার বুক প্রস্তুত হয়ে গেলে যে কোনো পক্ষ শুনানির জন্য আপিল উপস্থাপন করতে পারবে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় ৩২টি আইনগত যুক্তি তুলে ধরে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় খালেদা জিয়ার জামিন  চেয়ে আপিল করেন তার আইনজীবীরা। এতে বলা হয়, আবেদনকারীর বয়স ৭৩ বছর। তিনি শারীরিকভাবে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। ৩০ বছর ধরে গেঁটেবাত, ২০ বছর ধরে ডায়াবেটিস ও ১০ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। এছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনের কারণে তার গিঁটে ব্যথা হয়, যা প্রচন্ড যন্ত্রণাদায়ক। এ কারণে হাঁটাহাঁটি না করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ রয়েছে। শারীরিক এসব জটিলতার বিষয় এবং সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে তার জামিন মঞ্জুরের আবেদন জানানো হয়। জামিন আবেদনে আরো বলা হয়, উপমহাদেশসহ দেশের উচ্চ আদালতসমূহে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে যে, যখন আসামী একজন নারী হন তখন তার অনুকূলে জামিন বিবেচনা করা হয়ে থাকে। যে মামলায় তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও জামিন আবেদনে তুলে ধরা হয়।
খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, জামিন মঞ্জুরের সময় আদালত বলেছেন- খালেদা জিয়া একজন বয়স্ক নারী। তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। ইতোপূর্বে এই মামলায় তিনি নিম্ন আদালত থেকে জামিন  পেয়ে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। তিনি জামিনের কোনো অপব্যহার করেননি। এ কারণেই জামিন দেয়া হয়েছে।
জামিন আদেশের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও এডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও মাহবুব উদ্দীন খোকন বলেন, এই জামিন আদেশের ফলে কারাগার থেকে মুক্তি পেতে খালেদা জিয়ার আর কোনো আইনি বাধা নেই।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, হাইকোর্টের আদেশের পর এখন খালেদা জিয়ার মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই। কতগুলো নিয়ম আছে, সেগুলো মেনে আদেশ কারাগারে পৌঁছালেই খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন। শিগগিরই তিনি আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন।
মওদুদ বলেন, সরকার পক্ষের ও অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরোধিতা সত্ত্বেও আদালত জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন। দুই দিনের জন্য জামিন আদেশ স্থগিত রাখতে অ্যাটর্নি জেনারেল আবেদন করেছিলেন। আদালত তা খারিজ করে দেন। তিনি আরো বলেন, নিম্ন আদালতের নথির ভিত্তিতে পেপারবুক তৈরির জন্য সময় লাগবে। এরপর খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন বিবেচনা করা হবে।
অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, হাইকোর্ট বেগম খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন। সরকার আর কোনো বাধা সৃষ্টি না করলে তিনি মুক্তি পাবেন। তার কারামুক্তিতে কোনো বাধা নেই। তিনি আরো বলেন, আমরা বলেছিলাম, উচ্চ আদালতের প্রতি এখনো জনগণের আস্থা রয়েছে। আদালত সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন।
তিনি জানান, এ আদেশের কপি নিম্ন আদালতে যাবে। সেখানে জামিন আদেশ হবে। সে আদেশ কারাগারে পৌঁছার পর খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বেরিয়ে আসবেন।
তবে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য এ বি এম ওয়ালিউর রহমান খান বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন আদেশ সই হওয়ার পর সেটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাবে। সেখানে সেটি গৃহীত হবার পর জামিননামা যাবে কারাগারে।
আদালতের শুনানি: গত রোববারই খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে আদেশের জন্য সোমবার দুপুর দুইটায় সময় নির্ধারণ করেছিলেন আদালত।  সে অনুযায়ী আইনজীবীরা আদালতে যান। বেলা সোয়া দুইটার দিকে আদালত কক্ষে দুই বিচারপতি আসেন। শুরুতেই বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চান, তাদের কিছু বলার আছে কি না। তখন জয়নুল আবেদীন বলেন, জামিন আবেদনের শুনানি তো শেষ হয়েছে। আমরা আদেশের জন্য অপেক্ষা করছি। যদি রাষ্ট্রপক্ষ কিছু বলে তাহলে আমরা জবাব দেব।
এ সময় এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেন, এ মামলাটি স্পর্শকাতর। বিচারিক আদালত খালেদা জিয়ার বয়স ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন। যেহেতু নিম্ন আদালতের নথি এসেছে সেহেতু আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেয়া হোক।
তিনি বলেন, এটি একটি দুর্নীতির মামলা। এখানে এতিমের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আত্মসাত হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের মামলার নজির তুলে এটর্নি জেনারেল বলেন, এরশাদ সাহেব সাড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন। আর খালেদা জিয়া মাত্র দুই মাস কারাগারে ছিলেন। অতএব তাকে জামিন দেয়া ঠিক হবে না।
এ সময় আদালত বলেন, তখন তার (এরশাদ) বয়স কতছিল? এটর্নি বলেন, বয়স ছিল ৬৫ বছর। আদালত বলেন, তিনি  তো এ সময় শারীরিকভাবে ফিট ছিলেন। তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে বিয়ে করেছেন। আল্লাহর রহমতে পুত্র সন্তানও লাভ করেছেন।
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ  জে মোহাম্মদ আলী বলেন, আগে খালেদা জিয়া অসুস্থ ছিলেন। এই অসুস্থতার কারণে তিনি হাঁটাচলা করতে পারেন নাই। এসময় একটি দুর্নীতির মামলায় সাত বছরের দ-প্রাপ্ত ব্যক্তিকে হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ জামিন দেয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন।
আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন ও মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশীদ আলম খান।
শুনানির সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমির খসরু মাহমুদ, ড. আব্দুল মঈন খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম , আব্দুল আউয়াল মিন্টু, আব্দুর রেজাক খান, সানাউল্লাহ মিয়া, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, ব্যারিস্টার বদরোদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার এহসানুর রহমান ও সগির হোসেন লিওনসহ বিপুল সংখ্যক আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমকর্মী।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দ-ের বিরুদ্ধে ২০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করেন তার আইনজীবীরা। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিচারিক আদালতের দ-ও স্থগিত চাওয়া হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের দেয়া জরিমানার আদেশও স্থগিত করা হয়। এদিন আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় জামিন চেয়ে খালেদা জিয়ার করা আবেদন ২৫ ফেব্রুয়ারি শুনানির জন্য রাখেন আদালত। আদেশে এ মামলায় বিচারিক আদালতের নথি তলব করে ১৫ দিনের মধ্যে তা হাইকোর্টে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দেয়া হয়। এদিন শুনানি শেষে আদালত বলেন বিচারিক আদালতের নথি আসার পর আদেশ দেয়া হবে। ১১ মার্চ খালেদা জিয়ার মামলার নথি বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে পৌঁছায়।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. আক্তারুজ্জামানের আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। একই আদালত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয় জনের সবাইকে মোট দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা অর্থদণ্ডে দন্ডিত করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ