শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

দারিদ্র্র্যতা বিমোচন : বাস্তবায়ন ও কিছু প্রস্তাবনা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
দুনিয়ার ধনদৌলত ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন, “দেখ, তোমরাই তো তাহারা যাহাদিগকে আল্লাহ্র পথে ব্যয় করিতে বলা হইয়াছে অথচ তোমাদের অনেকে কৃপণতা করিতেছ। যাহারা কার্পণ্য করে তাহারা তো কার্পণ্য করে নিজেদেরই প্রতি। আল্লাহ্ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্থ। যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। এই পৃথিবীতে সত্য-জ্ঞানচক্ষু উন্মিলনের তাগিদ দিয়ে আল্লাহ্ আলো বলেন: “আর যে ব্যক্তি এইখানে অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথভ্রষ্ট”। আল্লাহ্ প্রদত্ত পরম সত্য-জ্ঞানহীন লোক ইহকালে আত্মা বিনষ্টকারী বলে ইহকাল ও পরকাল উভয়কালেই দরিদ্র, পার্থিব ধন-সম্পত্তি তার যাই থাক না কেন। মানুষের এই আধ্যাত্মিক দারিদ্র্যের প্রতি ইঙ্গিত করেই তার আল্লাহ্ বলেন: “যদি তোমরা বিমুখ হও, তিনি অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করিবেন; তাহারা তোমাদের মত হইবে না”। আল্লাহ্ পুণ্যাত্মার বিকাশপ্রাপ্ত, আধ্যাত্মিক চর্চা ও জ্ঞান সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত জাতির উপরই আস্থা রাখেন এবং তাদের পছন্দ করেন পারলৌকিক সম্পদহীন আড়ম্বরপূর্ণ পার্থিব জীবন যাপনকারী আত্মিক দরিদ্রের উপর নয়। তাই আল্লাহ্ বলেন: “যাহারা দুনিয়ার জীবনকে আখিরাতের চেয়ে ভালবাসে মানুষকে নিবৃত্ত করে আল্লাহর পথ হইতে এবং আল্লাহ্র পথ বক্র করিতে চাহে; উহারাই তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রহিয়াছে”।
বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য : ইসলামের দৃষ্টিতে বস্তুগত দরিদ্র ও দারিদ্র্য বিষয়ে আলোচনার আগে আমাদের সংসার বিরাগী বা যুহ্দ এবং আসলেও যারা বস্তুগতভাবে দারিদ্র্য তাদের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে।
প্রকৃত সংসার বিরাগী বা যুহ্দ : এ বিষয়ে ইমাম গাযালী র.-এর ভাষ্য হলো: “যে ব্যক্তি বদান্যতা বা দানশীলতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে অথবা পারলৌকিক সৌভাগ্য অন্বেষণ ভিন্ন অপরকোন পার্থিব উদ্দেশ্যে সংসার ত্যাগ করিয়াছে, তাহাকে প্রকৃত যাহিদ বা সংসার বিরাগী বলা যাইবে না। আবার, কেবল পারলৌকিক শান্তির বিনিময়ে ইহকাল বিক্রয় করা তত্ত্বজ্ঞানী মহাপুরুষগণের নিকট নিতান্ত দুর্বল তুচ্ছ ধরনের ‘যুহদ’ বা বৈরাগ্য। পূর্ণ ও প্রকৃত যাহিদ সেই ব্যক্তিকেই বলা যাইতে পারে, যিনি ইহলোকের ভোগ-বিলাসের প্রতি যেমন অমনোযোগী, তদ্রুপ পরলোকের চিরস্থায়ী ভোগ-বিলাস এবং সুখ-শান্তি হইতেও অমনোযোগী। অর্থাৎ তিনি পার্থিব সুখ-শান্তির বিনিময়ে পারলৌকিক শান্তি ভোগ করিতেও অনিচ্ছুক। .....ইহলোকের বিনিময়ে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বেহেশ্ত পাইতে ইচ্ছুক না হইয়া উভয় জগতের বিনিময়ে কেবলমাত্র আল্লাহ্ তাআলাকে পাইতে চান এবং তাঁহারই দর্শন ও পরিচয়লব্ধ আনন্দে পরিতৃপ্ত থাকিতে উৎসুক হন। একমাত্র আল্লাহ তাআলার সত্তা ব্যতীত অন্য সমস্ত পদার্থই তাঁহাদের দৃষ্টিতে নিতান্ত তুচ্ছ এবং নগণ্য বলিয়া প্রতিপন্ন হয়। আল্লাহ্ তাআলার তত্ত্বজ্ঞানে যাহারা পরিপক্কতা লাভ করিয়াছেন কেবল তাহারাই এই শ্রেণীর ‘যাহিদ’ হইতে পারেন। এই শ্রেণীর সংসার বিরাগী লোক সাংসারিক ধনৈশ্বর্য হইতে পলায়ন না করিলেও ক্ষতি নাই; বরং তাঁহারা মাল-আসবাব পাইলেই গ্রহণ করিয়া থাকেন এবং নিজের জন্য কিছু না রাখিয়া যথাসময়ে যথাস্থানে ব্যয় করিয়া ফেলেন এবং উপযুক্ত প্রাপককে দান করিয়া থাকেন”। এ ধরনের ‘যাহিদ’-এর দৃষ্টান্ত উসমান রা. ও আয়েশা রা.। বিপুল ধন-ভা-ার হাতে পেয়েও উসমান রা. সমস্ত ধন উপযুক্ত প্রাপকের হাতে তুলে দিয়ে নিজে নিতান্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। আয়েশা রা. লক্ষ মুদ্রা হাতে পেয়ে সমস্ত মুদ্রাই দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছেন এবং রোযা ইফতারের পর নিজের আহারের জন্য একটি মুদ্রাও গোশ্ত ক্রয়ে ব্যয় করেন নি।
“ফলকথা সংসারের মোহ হইতে হৃদয়ের আকর্ষণ ছিন্ন করতঃ উহা হইতে সম্পূর্ণ অনাসক্ত ও নির্লিপ্ত থাকাই বৈরাগ্যের লক্ষণ। অর্থাৎ সংসারের অন্বেষণে ব্যস্তও হইয়া পড়িবে না কিংবা সংসার ত্যাগ করিয়া জঙ্গলের দিকে পলায়নও করিবে না; সংসারের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া সর্বদা সর্বক্ষেত্রে উহার প্রতিকূল আচরণও করিবে না কিংবা সন্ধিসুলভ মনোভাব লইয়া সংসারের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশিয়াও থাকিবে না। সংসারকে লোভনীয় জ্ঞানে ভালও বাসিবে না কিংবা বর্জনীয় জ্ঞানে শক্রুও মনে করিবে না”। এ পৃথিবীর জীবন যাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বনই করাই শ্রেয়। আল্লাহ্ বলেন: “এইভাবে আমি তোমাদিগকে এক মধ্যপন্থী জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি, যাহাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ হইবে”।
‘যাহিদ’ ব্যক্তিগণ শুধু শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম বস্তুই পরিহার করে চলেন না, আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের জন্য এমন কি হালাল বস্তু ভোগেও নিরাসক্ত হন। ইহকালে তাঁদের জীবনে “Oreligious motives are more intense than economic.” এবং মানুষের অর্থনৈতিক জীবনাচরণের পাশ্চাত্যের সনাতন অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা এখানে অচল। পার্থিব জীবনের প্রতি ‘যাহিদ’-এর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে যেয়ে ইমাম গাযালী র. বলেন: “মানব জাতি সংসাররূপ জেলখানায় আসিয়া বন্দী হইয়া পড়িয়াছে। এই জেলখানায় আপদ-বিপদ ও দুঃখ-কষ্টের অন্ত নাই। মানব জাতিকে এই বন্দীখানায় অবস্থানকালে অসংখ্য বিপদ-আপদ ভোগ করিতে হয়। উক্ত বিপদরাশির মধ্যে জীবন যাপনের জন্য মানবজাতি বিশেষ করিয়া ছয় প্রকার দ্রব্যের মুখাপেক্ষী হইয়া থাকে।  আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে জীবনধারণের এ পার্থিব তালিকা সর্বজনীন; কিন্তু সর্বজনীন এ বিষয়গুলোর ব্যবহারগত দৃষ্টিভঙ্গি একজন ‘যাহিদ’ অপরাপর সাধারণ মানুষ, যাদের অর্থনৈতিক জীবন ব্যাখ্যায় সনাতন অর্থনীতিকে বলা হয়: “Economics is a study of mankind in the ordinary business of life; it examines that part of individual and social action which is most closely connected with the attainment and with the use of the material requisites of wellbeing” এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পার্থিব জীবনে জীবনধারণের এ সর্বজনীন তালিকা একজন ‘যাহিদ’ কিভাবে ব্যবহার করেন এবং কোন দৃষ্টিতে দেখেন তা বিশ্লেষণ করলেই সাধারণ সংসারি মানুষ থেকে ‘যাহিদ’-এর পার্থক্য বুঝা যাবে
অন্ন বা আহার্য দ্রব্য : আহার্য দ্রব্যের মধ্যে যারা চাল, গমের আটা, ময়দা, সুজি, চিকন চাউলের অন্ন আহার করে তারা সংসার বিরাগী নয়; তারা শরীরসেবী এবং আরামপ্রিয় বলে আখ্যায়িত। যে ব্যক্তি যত নিচুমানের খাদ্যে পরিতৃপ্ত থাকেন তিনি ততোধিক ‘যাহিদ’ বা সংসার বিরাগী। ‘যাহিদ’ ব্যক্তির আহার্য দ্রব্যের পরিমাণের তিনটি স্তর নির্ধারিত। কমের মধ্যে দৈনিক আনুমানিক এক পোয়া। মধ্যম, পরিমাণ দৈনিক অর্ধ সের এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ এক সের। এর মধ্যে যাঁরা সর্বোচ্চ পরিমাণ আহার্য গ্রহণ করেন, তারা সাধারণ পর্যায়ের ‘যাহিদ’। কিন্তু যারা এ সর্বোচ্চ পরিমাণের ঊর্ধ্বে আহার করেন, তারা উদরসেবী ও আরামপ্রিয়- ‘যাহিদ’ নন। ‘যাহিদ’ কি পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য সঞ্চয় করে রাখতে পারে তাও নির্ধারিত। এক বেলার খাদ্য সঞ্চয়ে রাখা উন্নত শ্রেণীর ‘যাহিদ’ বা পরহেযগারীর পরিচায়ক; এর অধিক খাদ্য সঞ্চয়কারী উন্নতস্তরের ‘যাহিদ’ নয়। ত্রিশ থেকে চল্লিশ দিনের খাদ্য যে সংগ্রহে রাখে সে মধ্যম শ্রেণীর ‘যাহিদ’। আর সর্বনিচু পর্যায়ের ‘যাহ্দি’ এক বছরের আহার সঞ্চয়ে রাখা। এক বছরের অধিক কালের জন্য খাদ্য সঞ্চয়কারী ‘যাহ্দি’ নয় কারণ সে এক বছরের অধিক কাল বাঁচার আশা রাখে।
“রসূলুল্লাহ্ স. নিজের পরিবারবর্গের জন্য এক বছরের খাদ্য সঞ্চয়পূর্বক তাঁহাদের হাতে সমর্পণ করিতেন। কেননা, তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করিতে পরিতেন না। কিন্তু তিনি নিজের জন্য রাত্রির আহার্যও দিবসে সংগ্রহ করিয়া রাখিতেন না”। রুটি বা অন্নের সাথে সিরকা বা শাক নিতান্ত নিচু মানের ব্যঞ্জন বলে তা উন্নত শ্রেণীর ‘যাহিদ’-এর খাদ্য। তৈল বা তৈল-পক্ক দ্রব্য মধ্যম শ্রেণীর ব্যঞ্জন। গোশত উৎকৃষ্ট শ্রেণীর ব্যঞ্জন এবং প্রবৃত্তির লোভনীয় খাদ্য যা অবিরত খেলে যাহিদ-এর উচ্চমান বিনষ্ট হয়। সপ্তাহে দুই একবার গোশত খাওয়া যেতে পারে। ‘যাহিদ’ ব্যক্তির পক্ষে দিন ও রাতের মধ্যে এক বেলার বেশি আহার করা সঙ্গত নয়। এক দিনে দু’বার আহার করলে যাহিদ-এর মান ধরে রাখা যায় না। ‘যুহ্দ’ বিষয়ে সম্যক্ ধারণা লাভের জন্য নবী করীম স. ও তাঁর সাহাবাদের জীবন প্রণালী অনুসরণই যথেষ্ট। আয়েশা রা. বলেছেন: রসূলুল্লাহ্ স.-এর পারিবারিক জীবনের অবস্থা কখনও কখনও এমন হইত যে, ক্রমাগত চল্লিশ দিন ধরিয়া তৈলের অভাবে তাঁহার গৃহে রাত্রিকালে প্রদীপ জ্বলিত না এবং খোরমা ও পানি ব্যতীত অন্যবিধ কোন পাকান খাদ্য আহার করিতে পাওয়া যাইত না।
পরিধেয় বস্ত্র : ‘যাহিদ’ ব্যক্তিকে কেবল একান্ত প্রয়োজনীয় পরিধেয় বস্ত্রেই পরিতৃপ্ত থাকতে হয়, এর বেশী নয়। সাধারণ শ্রেণীর ‘যাহিদ’-এর জন্য দু’টি লম্বা পিরহান, একটি টুপি, এক জোড়া জুতা এবং এর সাথে দু’টি পায়জামা ও একটি পাগড়িই যথেষ্ট।
“রসূলুল্লাহ্ স.-এর ইন্তিকালের পর আয়েশা রা. একখানা সূতীর মোটা তহ্বন্দ ও একখানি পশমী কম্বল বাহির করিয়া বলিয়াছিলেন-‘ইহাই রসূলুল্লাহ্ স. এর সাকুল্য পোশাক” হাদীসে উল্লেখ আছে- “যে ব্যক্তি জাঁকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণ পরিচ্ছদ পরিধান করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ্ তাআলার উদ্দেশ্যে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বনে তদ্রুপ পরিচ্ছদ পরিধান না করিয়া দীন-হীন পোশাক পরিধান করে, তবে তৎপরিবর্তে তাহাকে পরকালে বেহেশতের বিচিত্র কারুকার্যময় সুন্দর পোশাক ইয়াকুত প্রস্তর নির্মিত নৌকার মধ্যে বোধাই করিয়া দান করা আল্লাহ্র উপর তাহার প্রাপ্য দাবিরূপে অবধারিত হইয়া পড়ে”।
বাসগৃহ : ঝড়-বৃষ্টি ও শীত-গ্রীষ্ম থেকে আত্মরক্ষার জন্য বাসগৃহের প্রয়োজন হলেও সেটা এমন অস্থায়ী হওয়া উচিৎ যেন এই অস্থায়ী সংসারে যুহদ অবলম্বনে তা বাধার কারণ না হয়। যাহিদ ব্যক্তির জন্য বাড়ি অনাবশ্যক উঁচু বা প্রশস্ত ও জাঁকজমকপূর্ণ হলে তাঁরা জাহিদ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত থাকবেন না। মূলত, কেবল ঝড়-বৃষ্টি ও শীত-গ্রীষ্ম হতে আত্মরক্ষার জন্যই নিবাস নির্মিত হবে, ধনৈশ্বর্য ও জাঁকজমকের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য নয়। হাসান রা. বলেছেন- রসূলুল্লাহ্ স.-এর বাসগৃহগুলো এতটা উচ্চ ছিল যে, একজন মানুষ মেঝের উপর দাঁড়াইয়া হাত উঁচু করিলে গৃহগুলোর ছাদ স্পর্শ করিতে পারিত”। “যে ব্যক্তি আবশ্যকের অতিরিক্ত গৃহ নির্মাণ করিবে-কিয়ামতের দিন তাহাকে আদেশ করা হইবে, এই গৃহ মাথায় লইয়া দাঁড়াও। কিন্তু শীত-গ্রীষ্ম হইতে আত্মরক্ষার জন্য যত বড় গৃহের একান্ত প্রয়োজন তত বড় গৃহ নির্মাণ করিলে শাস্তি ভোগ করিতে হইবে না।
গৃহের আসবাবপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য : ‘যাহিদ’ হিসেবে ঈসা আ.-এর জীবন ধারণ পদ্ধতিই সর্বোত্তম। তিনি সঙ্গে একটি চিরুনি ও একটি পান-পাত্র রাখতেন। একদিন এক ব্যক্তিকে হাতের আঙ্গুল দিয়ে দাড়ি আঁচড়াতে এবং অঞ্জলি ভরে পানি পান করতে দেখে চিরুনি ও পানপাত্রটি বর্জন করেন। নবী করীম স. একটি চামড়রার তৈরি খোলের ভেতর খেজুর গাছের সরু আঁশ ভর্তি বালিশ ও একটি পশমী কম্বল রাখতেন। পশমী কম্বলটি দু’ভাঁজ করে তাঁর শয্যা রচনা হতো। একদিন নবী করীম স.-এর পাঁজরে খেজুর পাতার তৈরী চাটাইয়ের দাগ অঙ্কিত দেখে উমর রা. কাঁদতে কাঁদতে বললেন, রোম দেশের ‘কায়সার’ এবং পারস্য দেশের ‘কিসরা’ উপাধিধারী কাফের বাদশাহ্গণ আল্লাহ্র শত্রু হয়েও তাঁর প্রদত্ত ভুরি ভুরি নেয়ামতের মধ্যে ডুবে রয়েছে। আর আপনি আল্লাহ্ তাআলার বন্ধু এবং তাঁর প্রেরিত রসূল হয়েও এমন কঠিন দু:খ-কষ্ট ভোগ করছেন। তখন নবী করীম স. উমর রা.-কে সান্ত¡না দিবার জন্য বললেন: উমর! তুমি কি একথা শুনে সন্তুষ্ট হবে না যে, তাদের ভাগ্যে শুধু এই নশ্বর পৃথিবীর ধন-সম্পদই রয়েছে। আর আমাদের জন্য অবধারিত রয়েছে আখিরাতের অনুপম ও চিরস্থায়ী সম্পদ”। এখানে আলী রা.-এর একটি অমর উক্তি স্মরণীয়; তিনি বলেন: “মহা-প্রতাপাম্বিত প্রভু আমাদের ব্যাপারে ভাগ-বণ্টনের যে ফায়সালা করেছেন তাতে আমরা তুষ্ট। তিনি আমাদের জন্য রেখেছেন ইল্ম আর শত্রুদেরকে দিয়েছেন সম্পদ”।
“হেমস প্রদেশের শাসনকর্তা উমায়র ইবনে সা’দ উমর ইবনুল-খাত্তাব রা.-এর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলে তিনি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন: তোমার ব্যক্তিগত ভান্ডারে পার্থিব আসবাবপত্র কি কি আছে? তিনি বললেন, একটি লাঠি আছে, উহার উপর ভর দিয়া চলি এবং তাদ্বারা সর্প ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণীকে আঘাত করি। একটি চামড়ার থলি আছে, উহাতে খাদ্য দ্রব্যাদি রাখি। একটি পাত্র আছে, উহাতে আহার্য রাখিয়া আহার করি, আবার প্রয়োজন হইলে উহাতে পানি মস্তক ও বস্ত্রাদি ধৌত করি। আর একটি ঘটি আছে, তাহাতে পানীয় রাখিয়া পান করি। আবার প্রয়োজনবোধে উহা দ্বারা উযু-গোসলও করিয়া থাকি। এই কয়েকটি পদার্থই আমার গৃহ-সামগ্রীর মধ্যে আসল। এতদ্ব্যতীত আর যে কয়েকটি পার্থিব সামগ্রী আমার অধিকারে রহিয়াছে তাহা ইহাদের আনুষঙ্গিক”। নবী করীম স. নিজ অধিকারে কোন স্বর্ণ-রৌপ্য রাখতেন না এবং যারা এসব অধিকারে রাখত, এমন কি নিজ সন্তান হলেও তা পছন্দ করতেন না। দরিদ্রদের মাঝে তা বিলিয়ে দিতেন এবং অপরকেও অনুরূপ করতে আদেশ করতেন।
বিবাহ করা : সাহাল তাস্তীরা, সুফ্ইয়ান ইবনে উয়াইনাহ্ প্রমুখের মতে বিবাহের সাথে বৈরাগ্য বা অবৈরাগ্যের কোন সংশ্রব নেই। এর প্রমাণ রসূলুল্লাহ্ স. ছিলেন মানব জাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ‘যাহিদ’ এবং তিনি ছিলেন সমগ্র জগদ্বাসীর মহান শিক্ষক। তা সত্ত্বেও তিনি স্ত্রী গ্রহণ করা পছন্দ করতেন ও তাঁদেরকে খুব ভালবাসতেন। বিয়ের ফলে বংশ রক্ষা এবং আল্লাহ্র বান্দা ও নবী করীম স.-এর উম্মত সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পথ প্রশস্ত ও মানুষ হিসেবে নিজেকে পবিত্র রাখা সম্ভব হয়। নবী করীম স. বিয়ের বহু ফযীলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: “তোমরা প্রেমময়ী, অধিক সন্তানসম্ভবা নারীকে বিয়ে করবে। কারণ আমি তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের উপর গর্ব করবো”। ’ তিনি আরো বলেন: “যে ব্যক্তি পূত: পবিত্র অবস্থায় আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাত করতে চায় সে যেন স্বাধীন নারীর প্রণয়বদ্ধ হয়। আমি নামায আদায় করি, ঘুমাই, রোযা রাখি আবার ইফতারও করি এবং নারীদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার আদর্শ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল সে আমার দলভুক্ত নয়”। এ ছাড়াও রসূলুল্লাহ স. ঘোষণা করেন: “যখন তুমি বিয়ে করলে তখন অর্ধেক দীন পূর্ণ করলে; এর অর্থ হলো, বিয়ে মানুষকে যৌনতা, ব্যভিচার, সমকাম থেকে ফিরিয়ে রাখে, যা এ পৃথিবীর অর্ধেক পাপ”। অত:পর অবশিষ্ট অর্ধেকের জন্য সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহ্রও তাগিদ আছে: “তোমাদের মধ্যে যাহারা ‘আয়্যিম’ তাহাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যাহারা সৎ তাদেরও”। আল্লাহ্ আরো বলেন: “আর তাঁহার নিদর্শনাবলীর মধ্যে রহিয়াছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন তোমাদের সঙ্গিনীদিগকে যাহাতে তোমরা উহাদের নিকট শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য ইহাতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রহিয়াছে”। ইমাম গাযালী র.-এর মতে, বিয়ে করলে যদি স্ত্রীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আল্লাহ্ তাআলাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে এমন ব্যক্তির পক্ষে বিয়ে না করাই ভাল। কিন্তু বিয়ে না করলে ঐ ব্যক্তির যদি ব্যভিচারে বা এ জাতীয় গুরুতর পাপে লিপ্ত হওয়ার ভয় আছে বলে মনে হয়, তবে এ পরিস্থিতিতে ‘যুহদ’-এর পরিচয় হল তার পক্ষে এমন অনাকর্ষনীয়া গুণবতী সক্ষম নারীকে বিয়ে করা যে তাকে দৈহিকভাবে পরিতৃপ্ত ও ব্যভিচার মুক্ত রেখে একাগ্র মনে আল্লাহর ইবাদতে সহায়তা করবে”।
ঐশ্বর্য ও মান-সম্মান : ধনৈশ্বর্য ও মান-সম্মান, এ দু’টির লোভ সংসার জীবনে বিষের মতো ক্ষতিকর ও মারাত্মক; তবে এ দু’টি থেকে একান্ত প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্রহণ করা বিষ অপহারক মহৌষধের মতো কাজ করে এবং ঐ পরিমাণ ধন ও মান সাংসারিক ভোগবিলাসের মধ্যে গণ্য হয় না। একান্ত প্রয়োজনীয় পরিমাণ ধন ও মান আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মিক পরিশুদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে পারলৌকিক হিতকর বিষয়গুলোর অন্তভূক্ত বলে গণ্য। তবে পুণ্যার্জনের লক্ষ্যে দান খয়রাতের সময় আল্লাহ্ নিজের নিতান্ত প্রয়োজনের দিকেও লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেন: “তুমি তোমার হস্ত তোমার গ্রীবায় আবদ্ধ করে রেখ না এবং তা সম্পূর্ণ প্রসারিতও করো না, তা হলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে পড়বে।” আল্লাহ্ বলেন: “হে মুমিনগণ! তোমাদের ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদিগকে আল্লাহ্র স্মরণে উদাসীন না করে, যাহারা উদাসীন হইবে তাহারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।” নবী করীম স. বলেন: “যাহাকে আল্লাহ্ তাআলা দয়া করিয়া ইসলামের পথ দেখাইয়াছেন এবং অভাব মোচনের পরিমাণ ধন দান করিয়াছেনু, আর সে ব্যক্তিও উহাকে পরিতৃপ্ত রহিয়াছে-এমন ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান”।
‘যুহদ’ প্রসঙ্গের সারার্থ: মানুষ পার্থিব জীবনের ভোগ-বিলাস ও লোভনীয় বিষয়াদির চিন্তা ও আকর্ষণ হতে নিজের মনকে মুক্ত করে নির্লিপ্ত ও নির্বিকার হওয়ার অভ্যাস করলে, পরিণামে সে এমন সৌভাগ্য লাভ করতে পারে যে, ইহলোক ত্যাগ করে পরলোক গমন কালে তার মন দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট থাকবে না এবং দুনিয়ার মায়ায় এর প্রতি বার বার ফিরে ফিরে তাকাবে না। যে ব্যক্তি দুনিয়াকে নিজ শান্তি ও আরাম-আয়েশের স্থায়ী আবাস মনে করে, সে ব্যক্তিই দুনিয়া ছেড়ে যাবার কালে দুনিয়ার প্রতি ফিরে ফিরে তাকায়। দেহের বন্ধনের কারণে দেহ সেখানে থেকে যেতে চায়, আর মৃত্যুকালে আক্ষেপ করে বলে- ‘জীবন এত ছোট কেনে’! আবু সুলাইমান দারানী র.-এর কাছে এক লোক জিজ্ঞেস করেছিল আল্লাহ্ তাআলা যে বলেন: “সেদিন উপকৃত হইবে কেবল সে, যে আল্লাহ্র নিকট আসিবে বিশুদ্ধ (সালীম) অন্তঃকরণ লইয়া”। কেমন অন্ত:করণ বা হৃদয়কে ‘সালীম’ হৃদয় বলা যাইবে? উত্তরে তিনি বলেন, “যে হৃদয়ে আল্লাহ্ তাআলা ভিন্ন অন্য কোন পদার্থের স্থান নাই, সে হৃদয়কে ’সালীম’ ও সুস্থ হৃদয় বলা যাইবে।”
এই যেখানে ‘যুহদ’-এর পার্থিব জগতের জীবন দর্শন সেখানে বলদর্পী পাশ্চাত্যের পার্থিব জগতের বস্তুগত সাফল্যের নিরিখে গড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের বস্তুগত-দর্শন সকল যুগের জন্যই নেহায়েতই বালখিল্য এবং অচল। বস্তবাদী পাশ্চাত্যের প্রভাবে আজকের বাস্তবতায় হয়তো এ জীবন অকল্পনীয়, তবে এই হলো আদর্শ জীবন, যেমন অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাজারে আদর্শ অকল্পনীয় ‘পূর্ণ-প্রতিযোগিতা’-অবাস্তব হলেও যার আলোচনা আমরা করি। ‘যুহদ’ ব্যক্তিগণ দরিদ্র নন, তাঁদের অবস্থান দারিদ্র্য বিষয়ক আলোচনার ঊর্ধ্বে; কারণ যাঁর স্বভাবে মহত্ত্ব আছে দারিদ্র্য তাঁকে দরিদ্র করতে পারে না।
বস্তুগতভাবে দরিদ্র : ইসলামী পরিভাষায় বস্তুগতভাবে দরিদ্র সেই ব্যক্তি, যার নিজের নানাবিধ পার্থিব অভাব মোচনের মত অর্থ-সম্পদ নেই এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ-সম্পদ উপার্জনের সামর্থ্যও নেই। তবে দারিদ্র্যের ব্যাপক অর্থ বুঝতে হলে, ধনী কে তা আগে বুঝতে হবে। ধনী তিনিই যাঁর কোন কিছুর অভাব নেই এবং যিনি কারো মুখাপেক্ষীও নন। এই অর্থে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কেউ ধনী নন। মানব, দানব, ফেরেশ্তা, শয়তান বা আর যা কিছু সৃষ্টি জগতে বিদ্যমান, তাদের কারোই নিজ অস্তিত্ব ও স্থায়িত্ব তাদের নিজ ক্ষমতা বলে হয়নি এবং সে সব তাদের আয়ত্তেও নেই। তারা সবাই পরমুখাপেক্ষী এবং দরিদ্র। আল্লাহ্ বলেন- “আল্লাহ্ অভাবমুক্ত এবং তোমরা অভাবগ্রস্ত”। “এবং তাঁহার সমতুল্য কেহই নাই”। “তোমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, দয়াশীল। তিনি ইচ্ছা করিলে তোমাদিগকে অপসারিত করিতে এবং তোমাদের পরে যাহাকে ইচ্ছা তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করিতে পারেন, যেমন তোমাদিগকে তিনি অন্য এক সম্প্রদায়ের বংশ হইতে সৃষ্টি করিয়াছেন”। আয়াতটিতে ‘গণীমত’ অর্থাৎ ধনীর ভাবার্থ এই বুঝানো হয়েছে যে, “যিনি ইচ্ছা করিলে পৃথিবীস্থ সমস্ত কিছুই ধ্বংস করিয়া দিয়া তদস্থলে যাহা ইচ্ছা তাহাই সৃজন করিতে পারেন। ইহাতে বুঝা যাইতেছে, একমাত্র আল্লাহ্ তাআলা ভিন্ন যাবতীয় সৃষ্ট পদার্থই ফকির” অর্থাৎ দরিদ্র-পার্থিব ধন-সম্পদ যার যাই থাক না কেন। মানুষ পার্থিব জীবনে বহুবিধ অভাবের সম্মুখীন। ধন-সম্পদের অভাবও তাদের একটি। অন্যান্য যাবতীয় পদার্থের অভাব যেমন দারিদ্র, অর্থ-সম্পদের অভাবও তেমন দারিদ্র্য।
দু’কারণে মানুষ নির্ধন হয় : প্রথমত, কোন ব্যক্তি হয়তো স্বেচ্ছায় ধন ত্যাগ করে-এ প্রকার ব্যক্তি ‘যাহিদ’ এর পর্যায়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, কোন ব্যক্তির হয়তো ধন হাতে আসে না-এ প্রকার লোক ফকির বা দরিদ্র। বস্তুতঃ ধন-সম্পদে অভাবী লোকই দরিদ্র। এ প্রকার অভাবী লোক তিন শ্রেণীর হতে পারে: (১) ধন নেই, কিন্তু ধন উপার্জনের জন্য যারপর নাই তৎপর-এরা লোভী শ্রেণীর দরিদ্র। (২) যে দরিদ্র ব্যক্তি রিক্ত হস্ত হওয়া সত্ত্বেও ধন লাভের স্পৃহাকে সম্পূর্ণ দমন করে ফেলেছে, কেউ দান করলেও গ্রহণ করে না এবং ধন হাতে রাখাকে সর্বান্তকরণে ঘৃণা করে-এ ব্যক্তি ‘যাহিদ’। এঁদের বিষয়ে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। (৩) যে দরিদ্র ব্যক্তি ধন উপার্জনের জন্য চেষ্টা করে না, কিন্তু চেষ্টা বিনা ধন হাতে এলে তা ফেলে দেয় না, কেউ দান করলে গ্রহন করে কিন্তু না দিলেও সন্তুষ্ট থাকে-এ ব্যক্তি আপন অবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট দরিদ্র। শরীয়তের বিধান মতে সকল শ্রেণীর দরিদ্র লোকই দারিদ্র্যের সুফল ভোগ করবে, এমন কি লোভী দরিদ্র হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও যদি ধন লাভে বঞ্চিত হয়ে দরিদ্র থেকে যায় সে-ও দারিদ্র্যের সুফল ভোগ করবে।
দারিদ্র্যের ফযীলত : আল্লাহ্ বলেন: “এই সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরগণের জন্য”। আল্লাহ্ তা’আলার কাছে ফকির বা দরিদ্রদের মর্যাদা এত উচ্চ যে, তিনি এই আয়াতে দরিদ্রদেরকে মুহাজিরদের অগ্রবর্তী করেছেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি নিজের দরিদ্র অবস্থার প্রতি এতটাই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত যে, কেউ কিছু দিলেও তা গ্রহণ করে না এবং ধন-সম্পদকে ঘৃণা করে, এ সব লোক ধনী লোকের পাঁচ শত বছর আগে বেহেশতে যাবে। আর যারা ধনোপার্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও ধনী হতে পারেনি, এই শ্রেণীর লোভী দরিদ্রলোক সৎভাবে মৃত্যুবরণ করলে ধনী লোকের চল্লিশ বছর আগে বেহেশতে যাবে। “রসূলুল্লাহ্ স. বলেছেন: আমার প্রিয় দুইটি পেশা আছে, যে ব্যক্তি উক্ত পেশাদ্বয়কে ভালবাসে সে যেন আমাকেই ভালবাসে। আমার সেই পেশা দুইটির একটি দরিদ্রতা, অপরটি জিহাদ”। নবী করীম স.-কে  উদ্দেশ্য করে আল্লাহ্ যা বলেন তার সারমর্ম এই: “হে মুহাম্মদ! আপনি দুনিয়া এবং দুনিয়াদারদের পার্থিব সৌন্দর্যের প্রতি নজর দেবেন না; এই পার্থিব সম্পদ তাদের বিপদের কারণ হবে। আল্লাহ্ তাআলার কাছে আপনার জন্য যা রক্ষিত আছে তা অতি উৎকৃষ্ট ও চিরস্থায়ী”।
নবী করীম স. বলেছেন: “আমাকে বেহেশ্ত দেখান হইয়াছিল। দেখিলাম-বেহেশ্তবাসীদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণীর লোক। দোযখও আমাকে দেখান হইয়াছিল। তথায় দেখিলাম, অধিকাংশ দোযখীই ধনী শ্রেণীর লোক। আমি বেহেশ্তে স্ত্রীলোকদের সংখ্যা খুব অল্প দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম: স্ত্রীলোকরা কোথায়? উত্তর আসিল: দুইটি রঙ্গিন পদার্থ অর্থাৎ স্বর্ণ এবং যাফরান তাহাদিগকে বেহেশ্ত হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছে”। নবী করীম স. আরো বলেন: “আল্লাহ্ তাআলা যখন মানুষকে অতিমাত্রায় ভালবাসেন, তখন তাদের উপর নানাবিধ বিপদ-আপদ চাপাইয়া দেন। আর যাহাদিগকে পূর্ণমাত্রায় অত্যন্ত ভালবাসেন তাহাদিগকে ‘একতেনা’ করেন। সাহাবীগণ ‘একতেনা’ শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিয়াছিলেন: ‘কাহারও ধন-সম্পদ সমূলে বিনষ্ট করিয়া দেওয়া এবং পরিজনকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করিয়া ফেলাকে ‘একতেনা’ বলা হয়”।
আলী রা. বলেন: রসূলুল্লাহ্ স. বলেছেন- “যে সময় মানুষ ধন-সম্পদ সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করিবে, দালান-কোঠা-ইমারত নির্মাণে উৎসাহিত থাকিবে এবং দারিদ্র্যদিগকে শত্রুর ন্যায় মনে করিবে, তখন আল্লাহ্ তাআলা জনসমাজে চারি প্রকার ‘বালা’ (আপদ-বিপদ) প্রেরণ করিবেন- (১) দুর্ভিক্ষ, (২) রাজশক্তির অত্যাচার (৩) বিচারকদের পক্ষপাতমুলক আচরণ, (৪) কাফের ও শত্রুদের দৌরাত্ম”। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ