শনিবার ৩১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক!

আখতার হামিদ খান : সব অর্থনৈতিক সম্পর্কই একটা রাজনৈতিক আবহ নির্মাণ করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিছক অর্থনৈতিক ছিল না কোনোকালেই। বরং বরাবরই তা আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য ঘাটতি তিন বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়িয়েছে। চোরাচালান ইত্যাদির কল্যাণে অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ঘাটতি তিন থেকে চার গুণ বেশি হতে পারে বিশ্বব্যাংক সূত্রেরও অনুমান এমনটিই। নিছক বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্পর্কের বাইরেও যে পানি বণ্টনের নীতিমালা ভারত চীন  ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রত্যাশা করে, সেদিক দিয়েও অমিত্রসুলভ আচরণের জন্য বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিন্দিত। ফারাক্কা, তিস্তার পানি প্রবাহ প্রত্যাহারের পাশাপাশি সদ্য টিপাইমুখে বাঁধ দেওয়ার তোড়জোড় করার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্রে পড়ার আশঙ্কা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে ট্রানজিট প্রদানে বাংলাদেশের শাসকদের আগ্রহ ও জনগণের জন্য উত্তরোত্তর মাথাব্যথার কারণ দাঁড়িয়েছে। সীমান্তে নিয়মিত হামলা, গুলিবর্ষণ, বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা ও আহত করা, নারী নির্যাতন ইত্যাদির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিরুদ্ধে। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আবেগের ঊর্ধ্বে ভাবাটা প্রায়ই সম্ভব হয় না, ভারতের যৌক্তিক বিরোধিতা ও দেশে বহু ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী ভাবনাকেও উসকে দেয়। তাই আজ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে মেরুদ- সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য দরকার  উভয় দেশের সম্পর্কের পুনঃপুনঃ যৌক্তিক ব্যাখ্যা।
ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর চাকরি ও ভূসম্পত্তিপ্রীতি একটি আলোচিত বিষয়। শিল্পোদ্যোক্তার অনিশ্চিত জীবনের বদলে তারা চাকরির নিশ্চিত নিরাপত্ত বেশি পছন্দ করে, বাড়তি অর্থ জমিতে বিনিয়োগ করে, এমন পর্যবেক্ষণ সাহিত্যিক, সমাজবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে চালু আড্ডারও বিষয়বস্তু। এই অভিযোগ অসত্য নয় পুরোটা, তবে এর ঐতিহাসিক অবিচার হয়ে যায়। শুধু ঐতিহাসিক-সামাজিক কৌতুহলের জন্যই নয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বৈচিত্র্য বোঝার জন্যও এ ভূমিকাটি প্রয়োজন।
ভারতের প্রধান দুটি শিল্পাঞ্চল, যেখানে আধুনিক ভারতীয় পুঁজির জন্ম ও বিকাশ এবং যেখান থেকে তা অত্যত্র ছড়িয়েছে, সে দুটি অঞ্চল হলো বোম্বে এবং মাদ্রাজ উপকূল। অথচ কলকাতা এবং বোম্বে প্রেসিডেন্সি উভয়েই ভারতের আদিতম ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এলাকা হলেও দীর্ঘকাল কলকাতাই ছিল রাজধানী, বাংলা এলাকা ছিল ব্রিটিশদের সব রকম আয়ের প্রধানতম উৎস। তাদের বাণিজ্য কুঠির বেশির ভাগই বাংলায় স্থাপিত ছিল। মোগল আমলের শেষদিকে শুধু নয়, ব্রিটিশদের আগমনের পরও একটা বড় পর্যায় পর্যন্ত ভারতের মধ্যে শুধু নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লগ্নিকারক এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যেও বিশিষ্ট বেশ কয়েকজনের স্থায়ী আবাস ছিল বাংলা। অথচ অচিরেই বাংলা অঞ্চল বৃহৎ শিল্পোদ্যক্তাশূন্য হয়ে পড়ল। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, যেখান থেকেই বাংলার জমিদার শ্রেণীরও জন্ম।
১৭৯৩ সালে প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পেছনে ব্রিটিশ প্রভুদের দুটি প্রধান লক্ষ্য ছিল, এটি লর্ড কর্নওয়ালিস যেমনটি বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই ভূস্বামীদের আমাদের সহযোগী করে নিতে হবে। যে ভূস্বামী একটি লাভজনক সম্পত্তি নিশ্চিন্ত মনে ও সুখে-শান্তিতে ভোগ করতে পারে, তার মনে এটা কখনোই পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগতেই পারে না।’ অর্থাৎ এমন একটি জমিদার শ্রেণী ভারতে সৃষ্টি করা, যারা নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সহযোগী হবে। অপর লক্ষ্যটিও কর্নওয়ালিস এরই ভাষায়- ‘ভূমিস্বত্বকে নিরাপদ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এ দেশিদের হাতে যে বিরাট পুঁজি আছে, সেটাকে তারা অন্য কোনোভাবে বিনিয়োগ করার উপায় না দেখে ভূসম্পত্তি ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ব্যয় করবে।’
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে ব্রিটিশদের কাক্সিক্ষত ফলাফলই ঘটে। রামদুলাল দে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামগোপাল ঘোষসহ উনিশ শতকের প্রথম ভাগে যেসব বাঙালি পরিবার শিল্প-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পার্কিত ছিল তাঁদের প্রায় সবাই ব্রিটিশদের প্রতিকূল বাণিজ্যনীতি এবং অসম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা পাওয়ার বাসনায় এবং বৃহৎ ভূসম্পত্তির নিরাপদ আয়কে অনুকূল মনে করে অচিরেই উদ্যোক্তা থেকে জমিদারে পরিণত হয়।
ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ‘বাঙালি ভদ্রসমাজ’ বলে কথিত অংশের ভূসম্পত্তি-নির্ভরতা, বাণিজ্যের বদলে চাকরির পেছনে ছোটার মনোবৃত্তির লিখিত নিন্দা অসংখ্য, মৌখিক নিন্দা তার হাজার গুণ বেশি। কিন্তু এই কেরানিবৃত্তির যে একটা ঐতিহাসিক নির্মাণ আছে, সেটা অধিকাংশ সময়ই দৃষ্টির আড়ালে থাকে। কিন্তু সংক্ষেপে বলতে গেলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপটি বোম্বে এবং মাদ্রাজের সঙ্গে ভারতের বাকি অংশের এবং রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উদ্যোক্তা সৃষ্টি: আইয়ুবী শিল্পমালিকরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাদে যে মধ্যবিত্ত জমিদার ও পেশাজীবী শ্রেণী বাংলায় তৈরি হয়, তার একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাম্প্রদায়িকভাবে প্রধানত মাত্র চার জন ছিলেন আইসিএস। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের প্রতি ব্রিটিশদের বদান্যস্বরূপ প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, আইন পেশায় নিযুক্তদের বড় অংশ এবং অধিকাংশ মাড়োয়ারি হিন্দুদের ছিল একক প্রাধান্য। দেশবিভাগের সময় পূর্ববঙ্গে কোনো বাঙালি মুসলমানের মালিকানাধীন একটি বৃহদায়তন শিল্পও ছিল না। পাইকারি ব্যবসায় মুসলমানদের ভূমিকার একমাত্র নজির ছিলেন চট্টগ্রামের সওদাগররা। পাটের ব্যাপারী এবং আড়তদারিও ছিল মূরত বাঙালি হিন্দু এবং মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে। বিপুল দেশান্তর, দাঙ্গা ও দখলের পরও ১৯৫৯ সলের এক জরিপে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের মোট শিল্প পরিসম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ বাঙালি মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে, ৮.৫ শতাংশ বাঙালি হিন্দু এবং ২ শতাংশ মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত মাত্র একজন বাঙালি। মুসলমান ব্যবসায় শ্বশুরের টাকায় একটি কাপড়ের কলসহ কয়েকটি কারখানা স্থাপন করেছিলেন।
পাকিস্তানে আইয়ুব খানের আমলে শিল্প উন্নয়ন, করপোরেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় যে শিল্পপতি শ্রেনী গজিয়ে ওঠে, করপোরেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় যে শিল্পপতি শ্রেণী গজিয়ে ওঠে, নানা বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সুবাদে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাই অবাঙালি মুসলমান। পাকিস্তানে শিল্পপতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিতে এই শ্রেণীটি গড়ে তোলা হয়। তারা বোম্বে ও মাদ্রাজকেন্দ্রিক পুঁজিপতিদের মতো ব্যক্তি উদ্যোগ আর প্রতিযোগিতার ফলাফল নয়। খুব দ্রুতই এই নতুন পুঁজিপতিরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য, মহাজনি ও আড়তদারিতে হিন্দু প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যায়, যাঁরা পাকিস্তানের অনিরাপদ ও সাম্প্রদায়িক পরিবেশে তাঁদের সম্পদ যথাসম্ভব ভারতে স্থানান্তরিত করছিলেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর হিন্দু মালিকানাধীন ৫২টি বৃহৎ শিল্প এবং ২৫০টি বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করা হয়। এভাবে সাবেকি ব্রিটিশ, হিন্দু এবং মাড়োয়ারি আধিপত্যের বদলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত মুসলমানদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় বাংলা এলাকায়। এমনকি ১৯৬৯-৭০ সালেও মাত্র ৩৯ জন বাঙালি ১০ লাখ টাকার লাইসেন্সের মালিক ছিলেন। পাকিস্তান আমলে পাটসমেত পূর্ববাংলার অধিকাংশ কাঁচামাল ও নিশ্চিত বাজার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাত্ত পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্প মালিকদের সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এসব বারানভ এই সুবাদেই পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উপনিবেশ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কর এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত জনগণের অর্থ ভর্তুকি দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান এবং প্রধানত পাঞ্জাবকেন্দ্রিক পাকিস্তানি বুর্জোয়া শ্রেণী এভাবেই বিকশিত হয়।
তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ১৯৫৯ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে একটি গুরুত্বপুর্ণ বাঙালি শিল্পমালিক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটে। তাদের জন্ম এবং বিকাশ পুরোপুরিই রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও ঋণে। প্রধানত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের গাঁটছড়া বাঁধা একটি স্থানীয় বড়লোক শ্রেণী গড়ে তোলার চিন্তা থেকেই এই অংশটিকে জন্ম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে অনুগ্রহবঞ্চিত পেটি বুর্জোয়ারা নিজেদের স্বার্থেই এই শ্রেণী এবং শ্রেণীটির ¯্রষ্টা তদানীন্তন সরকারের বিরুদ্ধে চলে যায়। সুতরাং শুরু থেকেই এই শ্রেণীটির কোনো সামাজিক সমর্থন ছিল না এবং সরকারের অনুগ্রহ ব্যতিরেকে বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি ও সামর্থ্যরে কোনোটাই এদের ছিল না।’ তবে বুর্জোয়ারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে ভূমিকা রাখলেও বিক্ষুব্ধ পেটি বুর্জোয়া উকিল, শিক্ষক, পেশাজীবীর স্বার্থ ক্রমেই দানা বাঁধছিল প্রধানত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে।
বাংলাদেশ আমল
পাকিস্তান আমলে জন্ম নেওয়া পেটি বুর্জোয়া অংশটি দেশি বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ না হলেও তাদের বঞ্চনার আংশিক প্রতিশোধ নিয়েছিল বটে।  ১৯৬৯-৭০ সাল নাগাদ প্রধান ১৬টি শিল্পপতি পরিবারের সর্বমোট সম্পদ ছিল ৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির পাশাপাশি এদের টাকা। পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির পাশাপাশি এদের একটা বড় অংশের সম্পদ জাতীয়করণ করা হয়।
‘১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যেসব পাটকল, বস্ত্রকল এবং একটি চিনিকল জাতীয়করণ করা হয়, তার মোট মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৯১ কোটি আট লাখ টাকা।’ এই জাতীয়করণকৃত পরিসম্পদের ৪২ শতাংশ এসেছিল উপরোক্ত ১৬টি ব্যবসায়ী পরিবারের সম্পদ থেকে, বাকি ৫৮ ভাগ হলো পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। উল্লেখ্য, পশ্চিমা দেশগুলোর পুঁজি কিন্তু এই জাতীয়করণের আঘাত থেকে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। ‘জাতীয়করণ হওয়ার পর এই পরিবারগুলোর হাতে অবশিষ্ট ছিল ৩১ কোটি ৬০ লাভ টাকা, অর্থাৎ গড়ে পরিবার প্রতি এক কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।’ জাতীয়করণ হওয়ার আগে এদের মধ্যে সবেচেয় বড় এ কে খান গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১২টি, আনুমানিক সম্পদ ছিল সাড়ে সাত কোটি টাকা।
বুর্জোয়াদের প্রতি পেটি বুর্জোয়াদের প্রতিশোধের ধরন কী ছিল? পাকিস্তান আমলে ধনী হওয়ার সুযোগটি ছিল অতি সীমিতসংখ্যক বাঙালির জন্য, যাদের সুযোগ ছিল নানা যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বরাদ্দকৃত লাইসেন্স, পারমিট, ঋণ প্রভৃতি সংগ্রহ করার। রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে এবার বাঙালি পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী দ্রুত তাদের স্থালাভিষিক্ত হতে চাইল। পাকিস্তানির পরিত্যক্ত সম্পত্তি বা বাঙালি বড়লোকদের কলকারখানা সরাসরি দখল করাটা সম্ভব ছিল না বটে, সেই কাজটিই তারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সম্পাদন করল এই সম্পদকে সমাজতন্ত্রের নামে জাতীয়করণ করার মাধ্যমে।
১৯৭২ সাল থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সদ্যোজাত বাংলাদেশকে কিভাবে ভারতের প্রায় অর্থনৈতিক উপনিবেশে পরিণত করা হচেছ, তার নিয়মিত বর্ণনা ও প্রতিবাদ জারি রাখলেও ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েও তারা সংগত কারণেই উদ্বেগ প্রকাশ করছিল। বলা যায়, বাংলাদেমের শৈশবাবস্থাতেই যে নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে স্থাপিত হয়েছিল, তারই সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিকব্যবস্থাও দেশে জারি হয়েছিল। ছিল স্বৈরতান্ত্রিক, গোপনপ্রবণ এবং জনগণের অংশগ্রহনহীন। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। আওয়ামী লীগ মুলত ছিল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন খুদে বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক দল, স্বাধীনতার পর এরা রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধিতে, এর বাইরে ধনী হওয়ার প্রধান উপায় ছিল রিলিফসামগ্রী লুণ্ঠন, লাইসেন্স-পারমিটের একচেটিয়াকরণ এবং গ্রাম ও মফস্বলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসহ অপরের সম্পত্তি দখল। কারখানাগুলোতে সরাসরি কলকবজা পাচার থেকে শুরু করে বাড়তি মূল্যে যন্ত্রপাতি-কাঁচামাল সরবরাহ, অস্বাভাবিক কম দরে উৎপাদিত দ্রব্যাদির একচেটিয়া সরবরাহের অধিকার লাভ এবং সেই পণ্যাদি অস্বাভাবিক উচ্চ দরে জনগণের কাছে বিক্রি- এই ছিল সম্পত্তির মালিক হওয়ার সবচেয়ে লাভজনক উপায়।
কারখানা পর্যায়ে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দাম নির্ধারণ করাটা চক্রান্তমূলক ছিল না কি পারমিটধারীদের মুনাফা যথাসম্ভব উচ্চ করার ‘নিরীহ ধান্ধা’ তা বলা মুশকিল। কিন্তু এর ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। এভাবে কৃষক পর্যায়ে চাষিরা কতটা বঞ্চিত হতো, পরিশেষে দেশবাসী কত টাকায় পণ্যটি ক্রয় করত এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ বাংলাদেশে মধ্যস্বত্বভোগীরা ধাপে ধাপে জনগণের কতটা অর্থ পকেটস্থ করত, তার একটা ধ্রুপদী উদাহরণ পাওয়া যাবে ১৯৭৪ সালের লবণ কেলেঙ্কারির সময়।
৯ অক্টোবর দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত শ্রমিক লীগের এমপি আবদুল মান্নানের বক্তব্য অনুযায়ী ‘লবণের দুষ্প্রাপ্যতা সম্পর্কে সম্ভাব্য সব ধরনের খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে মজুমদাররা উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে দুই টাকা মণ দরে লবণ কেনে। মজুদদারদের জন্য অশোধিত লবণের সরকারি দাম ১৫ টাকা, আর শোধিত লবণের দাম ৫৫ টাকা। অশোধিত লবণের দাম ৪০ টাকা করা হলে বাজারে প্রচুল লবণ পাওয়া যাবে বলে মজুদদারের মত প্রকাশ করছেন।’
ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য প্রকল্প
১৯৭১ এর পর একদিকে যেমন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা উদ্যোক্তারা অনেকটাই রাজনৈতিক ক্ষমতাহীন ও দুর্বল হয়ে গড়েছিল, নতুন ক্ষমতাবানরাও শিল্পকারখানা সংশ্লিষ্ট ছিল না বলে অস্তিত্বশীল কারখানাগুলো লুণ্ঠনই তাদের প্রধান আয়ের পথ হয়ে দাঁড়াল। আবার বহির্বিশ্বে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষাবলম্বন করার কারণে পুঁজিবাদী দুনিয়ার প্রধান কেন্দ্রশক্তিগুলের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্বস্তিকর সম্পর্ক রুশ ‘বলয়ে অবস্থান করা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা গভীর গাঁটছড়া বাঁধানোর কাজটি দারুণভাবে সম্পন্ন করে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ’৭৫ সাল পর্যন্ত বাণিজ্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখা যাক।
এ হিসাবটি খুবই তাৎপর্যপুর্ণ। ১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল অতি নগণ্য। কিন্তু ১৯৭১ সারে পর পরই ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়। একদিকে বাংলাদেশ থেকে পাট, চামড়াসহ কাঁচামাল রপ্তানি ছিল রপ্তানি ক্ষেত্রের বড় অংশ, আমদানীকৃত অধিকাংশ সামগ্রী ছিল শিল্পপণ্য ও যন্ত্রাংশ। সেই সময়কাল কড়া সেন্সরশিপের মধ্যেও মওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক ‘হককথা’র এমন সব দুর্নীতির সংবাদ ছাপা হয়, সেখানে প্রায় অর্ধেক দামে নতুন জার্মান জাহাজ ক্রয় করা হয়েছিল।
‘৭৫ সালের পর যে শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে, জনগণের কাছ থেকে বৈধতা পাওয়ার জন্য তারা ব্যবহার করে দুটি প্রধান অস্ত্র। একটা ভারত ও সমাজতন্ত্র বিরোধিতা, অন্যটি ধর্ম। বলে রাখা দরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তির লুণ্ঠনের সঙ্গে স্লোগান ছাড়া আর কোনো কিছুতেই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বলয়ে ভারতের অবস্থান নিজস্ব মালিকগোষ্ঠীকে একটা নিরাপদ, প্রতিযোগিতাহীনতার সুবিধা প্রদান হলেও ভারত এ সব কিছুর মধ্য দিয়ে নিজেদের পুঁজিবাদী বিকাশকেই কিছুটা হলেও গতিশীল করতে সক্ষম হয়েছিল।
ভারতবিরোধী রাজনীতির সমীকরণ
গত সপ্তাহ দুয়েকের বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় সম্ভবত বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার আচমকা ভারতবিরোধী ‘কথার কামান বহর’ আকস্মিক নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সরকারি দলের বিরুদ্ধে ট্রানজিট, বাণিজ্য-ঘাটতি, রামপালেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয় প্রভৃতি প্রসঙ্গে তিনি জনগণকে সজাগ হওয়ার আহ্বান জানান। প্রসঙ্গগুলোর সত্য-মিথ্যার হিসাব এক, কিন্তু আরো জরুরি হলো, ভারতবিরোধী অনুভূতির তাসটি খালেদা জিয়া দেরি না করেই ব্যবহার করেছেন। অথচ মাত্র বিষয়ে প্রায় নীরব ছিলেন তিনি ও তাঁর দল। একই প্রসঙ্গগুলো যদিও আলোচিত হচ্ছ অনেককাল ধরেই।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ধারাবাহিকহতার প্রশ্নে গুরুতর কোনো পার্থক্য শাসক দলগুলো তাই দেখতে সক্ষম না হলেও বাংলাদেশে ভারত প্রশ্নটি নিছক অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ায়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রশ্নে যে গড় চিন্তাগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সমাজে হাজির দেখা যায়, সেগুলো মোটামুটি এমন:
মার্কিন ছায়া- ভারতকে প্রতিরোধ (গড়ে বিএনপি)
মার্কিন ছায়া- পাকিস্তান, মৌলবাদ প্রতিরোধ (গড়ে আওয়ামী লীগ)
ভারতীয় ছায়া- মার্কিনকে প্রতিরোধ (সাবেক মস্কোপন্থী বামপন্থী কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ, শেষ বিচারে আওয়ামী-বৃত্তে বন্দি)
চীনা+পাকিস্তানি ছায়া- ভারতকে প্রতিরোধ
প্রথম দুটি অংশই অধিক শক্তিশালী এবং অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল এবং উভয়েরই এই একটা মজার বৈশিষ্ট্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে এদের কেউ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ঠেকানোর আওয়াজ দেয়, একই শক্তির  বলে বলীয়ান হয়ে আরেক দল মৌলবাদবিরোধী হুঙ্কার ছাড়ে। এদেরই গৌণ-সহগামী একদল রুশ-ভারত মৈত্রীর ব্যাঙও ভারে আক্রান্ত থেকে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ আর মৌলবাদকে ঠেকাতে ভারতীয় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার মিথ্যাচারকে আঁকড়ে ধরে, আরেক দল ভারতকে প্রতিরোধ করার স্বপ্ন দেখে চীন আর পাকিস্তানের আশ্রয়ে। স্বাধীন এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে এদের সবাই সংগত কারণেই অক্ষম। পরের দুই দগ দৌণ বটে, কিন্তু প্রথম দুই দল জনগণকে দু-দুটো অর্ধসত্য দিয়ে বিভক্ত করে রেখেছে। আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের ব্যবসায় আর বিএনপির ভারতবিরোধীতায় তাই জনগণ উপায়হীনভাবেই ছোটাছুটি করে চলেছে, যতক্ষণ না তাদের মধ্য থেকেই দেশীয় উৎপাদিকা শক্তির মুক্তি ঘটানোর কর্মসূচি সংবলিত নতুন, পাল্টা শক্তির আবির্ভাব ঘটে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ