বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নিলীমা চৌধুরী ও রং নাম্বার অফিস

তাসনীম মাহমুদ : গেল ক’দিন আগের কথা। বসন্তের না শীত না গরম আবহাওয়া। ফুরফুরে মেজাজে ৪১৬/ক (মিথিলা কটেজ) বাড়ী থেকে বের হলেন নিলীমা চৌধুরী। বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে একটি খালি রিক্সা ডাকলেন। রিক্সাওয়ালা রিক্সা নিয়ে এলে ভদ্র মহিলা বললেন ২নং রোডের ৭১৬/খ রং নম্বার অফিসে যাব, যাবেন নাকি? রিক্সাওয়ালা সম্মতি জানালে নিলীমা রিক্সায় চড়ে বসলেন।চলি¬শোর্ধ বয়স ভদ্র মহিলার। কথাবর্তা এবং চাল-চলন যেন বিশ বছরের অপ্সরী’র মত। কিন্তু বেহায়াপনা বা অসঙ্গতিপূর্ণ আচার-আচারণ ও অশালিন পোষাক-পরিচ্ছদের বালাই নেই তার মাঝে। নিলীমা চৌধুরী গেল ছয় মাস আগে শিক্ষকতার মহান পেশা থেকে অবসর নিয়েছেন। রিক্সায় চড়তে চড়তে হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল সেই শিক্ষক জীবনের আনন্দ ঘন একটি দিনের কথা, যেদিন স্বার্থক মনে হয়েছিল তার শিক্ষাদানের মহান পেশাকে, স্বার্থক মনে হয়েছিল তার নিজেকেই। নিলীমার শিক্ষক জীবনের কথা...

সে তখন হৃদয়পুর ইন্টারমিডিয়েট কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান শিক্ষিকা । একদিন কলেজ শেষে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। হঠাৎ দূর থেকে দেখতে পেলেন দুটি ছেলে রাস্তার পাশের বড় ড্রেনের মধ্যে নেমে কি যেন উঠানোর চেষ্টা করছে। নিলীমা চৌধুরী এগিয়ে গেলেন ছেলে দুটির দিকে। ড্রেনের পঁচা পানি কাঁদার গন্ধ নিলীমাকে আঘাত করতে লাগল। তারপরো তিনি এগিয়ে গেলেন ছেলে দু’টির দিকে। সামনে গিয়ে দেখতে পেলেন ছেলে দু’টি আর কেউ নয়; তার-ই কলেজের ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আশরাফ-আফজাল। প্রিয় ম্যাডামকে দেখে ওরা সালাম দিল “আস্সালামু আলাইকুম” ম্যাডাম। ম্যাডাম সালামের জবাব দিয়ে জানতে চাইলেন এই পঁচা কাদা পানির ড্রেনে কি করছো তোমরা? উত্তরে আশরাফ বলল ম্যাডাম, এই যে দেখুন, এই কুকুর ছানাটি কখন থেকে যেন ড্রেনের মধ্যে পড়ে আধমরা হয়ে ঘেউ ঘেউ করছে। ছানাটি তোলার জন্যই আমরা ড্রেনে নেমেছি। ম্যাডাম বললেন,তাই বলে এই ড্রনের মধ্যে? উত্তরে আফজাল বলল, কেন ম্যাডাম আপনি-তো আমাদের মানব প্রেম-জীব প্রেম সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। আশরাফ বলল, ম্যাডাম এটা কুকুরের বাচ্চা হলেও আমরা আশরাফুল মাখলুকতের কাছে এদেরকি কোন অধিকার থাকে না? আফজাল বলল তাছাড়া ম্যাডাম মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব- কর্তব্য পৃথিবীর সব প্রাণীর জন্য,পৃথিবীর জন্য। আর এর জন্য ম্যাডাম শুধু পঁচা নর্দমাই নয়; বরং যে কোন পরিস্থিতিতে, যে কোন জায়গাতে আমাদের দায়িত্বকে কাজে লাগানো উচিত। আর আপনিই-তো একথা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। ওদের কথা শুনে ম্যাডাম হতভম্ব হয়ে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে ফেললেন আজ আমি একজন সার্থক শিক্ষিকা, এজন্য যে তোমাদের মতন সোনার টুকরো ছেলেদের আমি শিক্ষা দিতে পেরেছি। আজ আমি তোমাদের প্রতি এতটাই সন্তুষ্ট যে, আমার জীবনে এতটা তৃপ্তি-আনন্দ আমি আর কখনো পাইনি। নিলীমা চৌধুরীর চোখে আশরাফ আফজালের উজ্জল চেহারা, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ জল-জল করে উঠল।নিজের অজান্তে তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা লোনা জল। এরই মধ্যে রিক্সাওয়ালা বলে উঠল আপা, এই যে চইলা আইছি।

 নিলীমা চৌধুরীর মধুর অতীতের স্মৃতি-ধ্যানখন ওখানেই ভাঙ্গল। রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া চুকিয়ে দিয়ে চোখ দু’টো মুছে নিয়ে রং নম্বর অফিসে গেলেন নিলীমা। আজ নিলীমার পেনশনের টাকা পাওয়ার কথা। তার মতো আরোও বেশ কয়েকজন এসেছে যারা পেনশনের টাকা তুলছেন। “রং নাম্বার” অফিসের পূর্ব ইতিহাস খুব ভাল হওয়ায় এ বছর নিরাপত্তার দায়িত্ব পড়েছে পুলিশের উপর। যেহেতু পুলিশ জনগণের সেবক;দায়িত্বে সদা সচেতন তাই পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করছে “রং নাম্বার” অফিসের নিরাপত্তা। নিয়মানুযায়ী নিলীমা চৌধুরী যাবতীয় কাগজ-পত্র জমা দিয়েছেন দায়িত্ব-প্রাপ্ত এক পুলিশ অফিসারের নিকট। অন্যান্যরাও যথারীতি কাগজ-পত্র জমা দিয়েছেন। নিয়মানুযায়ী নিলীমার-ই প্রথম টাকা পাওয়ার কথা। কিন্তু নিলীমা লক্ষ্য করলেন অনেকেই তার আগে টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। ব্যাপারটা নিলীমার কাজে ভাল লাগলো না।এ রকম পুলিশী হেফাজতে অনিয়ম হওয়ার কারণ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে নিলীমা বুঝতে পারলেন যে, পেনশনের টাকার বিশেষ একটি অংশ পুলিশকে ঘুষ না দিলে টাকা তোলা যাচ্ছে না। কি করবেন, সাত-পাঁচ নানান কথা ভাবছেন নিলীমা। ইতোমধ্যে অন্যরা সবাই কাজ সেরে চলে যা”ছে। অবশেষে এক পুলিশ অফিসারের নজর পড়ল নিলীমার দিকে। অফিসার এগিয়ে এসে মুচকি একটি হাসি দিয়ে প্রশ্ন করলেন কি ম্যাডাম পেনশনের টাকা কি তোলবেন না? নিলীমা বললেন, এর জন্যেই তো সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি। নিয়মানুযায়ী আমাকেই সবার আগে আপনাদের টাকা দেওয়ার কথা। পুলিশ অফিসার বললেন-টাকাতো আমরাও আপনাকে দিতে চাই কিন্তু...

একটু থেমে অফিসার আবার প্রশ্ন বললেন, ম্যাডাম আপনি কিছু বোঝেন না? নিলীমা বললেন, না বুঝলে কি আর এইখানে আসা! অফিসার কটুক্তির হাসি হেসে বললেন আপনার সঙ্গে কেউ আসেনি, মানে আপনার কোন বুঝমান-শিক্ষিত ছেলে, যারা অফিস-আদালতের ব্যাপার-স্যাপার বোঝে! গম্ভীর হয়ে গেলেন নিলীমা।তার মনের পটে ভেসে উঠল আশরাফ-আফজালের মত দায়িত্বপূর্ণ, নীতিবান সোনার ছেলে দুটোর কথা। 

অত:পর অফিসারকে বললেন, আমার তিনটি ছেলে আছে। পুলিশ অফিসার প্রশ্ন করলেন তা আপনার ছেলেরা কে কি করে? নিশ্চয় এদিক ওদিক দিয়ে বেশ কামাচ্ছে তাই না ম্যাডাম? উত্তরে নিলীমা বললেন হ্যাঁ তা কামাচ্ছে! তাহলে এবার শুনুন অফিসার আমার ছেলেরা কে কি করে। আমার একটি ছেলে ডাক্তার, একটি ইঞ্জিনিয়ার আর একটি ছেলে আমার বিয়ের আগেই  জন্মেছিল সেটি আপনারই মতো একজন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ