বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

নেইমারকে নিয়ে শঙ্কা কাটছে না

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : চার বছর আগে বিশ্বকাপের কথা এখনও ভুলতে পারেনি ব্রাজিলিয়ানরা। ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে পিঠে আঘাত পেয়ে মাঠ ছাড়েন নেইমার। দলের সেরা তারকার অনুপস্থিতিতে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হেরে বিধ্বস্ত হয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এবার রাশিয়া বিশ্বকাপে সেই ক্ষত জুড়ানোর স্বপ্ন বুনছে পেলের দেশ। এই মিশনে প্রধান ভরসা নেইমারই। সেই কিনা আবারও গুরুতর চোটে পড়েছেন। ক্লাব দল পিএসজির হয়ে ফরাসী লীগ ওয়ানের ম্যাচে মার্শেইয়ের বিরুদ্ধে আঘাত পান সাবেক বার্সেলোনা তারকা। তার চোটা গুরুতরই বলে জানা গেছে। এখনও নিশ্চিত না হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম দাবি করেছে, গোড়ালির চোটে ছয় থেকে আট সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে চলে গেছেন নেইমার। অর্থাৎ দুই মাস ময়দানী লড়াইয়ে ফিরতে পারবেন না। এর ফলে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়ের স্বপ্নে বড় এক ধাক্কা খেতে হচ্ছে পিএসজিকে। কেননা শেষ ষোলোর দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি হবে তারা। আর প্রথম লেগে রিয়ালের মাঠে তারা হেরে এসেছে ৩-১ গোলে। এমন অবস্থায় শেষ আটে যেতে হলে অবিশ্বাস্য কিছু করতে হবে। এই কঠিন মিশনে এখন নেইমার খেলতে পারবেন না। তাই পিএসজি’র ভাগ্যে কি হয় সেটাই দেখার। চোট পাওয়ার মুহূর্তে নেইমারকে কাঁদতে দেখা গেছে। প্রথমে তো ভয় পাচ্ছিলেন সবাই, পা টা ভেঙে গেছে নেইমারের! সেক্ষেত্রে পুরো মওসুমের জন্য মাঠের বাইরে চলে যেতে হতো ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে।
জানা গেছে, পা মচকেছে নেইমারের। তার বাবা সিনিয়র নেইমার জানিয়ে দিয়েছেন ছয় থেকে আট সপ্তাহের আগে ছেলের ফেরার সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের উদ্ধৃতিতে জানা গেছে, সমস্যার পুরোপুরি সমাধান ও বিশ্বকাপ নিয়ে কোনরকম ঝুঁকি এড়াতে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেইমার। আর তাতে দুই মাসের মতো ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে মাঠের বাইরে থাকতে হবে। নেইমারের চোট নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিবৃবিতে পিএসজি জানিয়েছে, ‘আলট্রাসাউন্ড ও সিটি স্ক্যানের রিপোর্টে নেইমারের ডান গোড়ালিতে ইনজুরির মাত্রা নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তার পঞ্চম মেটাটারসেলে সূক্ষ্ম একটি চিড় ধরা পড়েছে।’ এই ধরনের ইনজুরিতে সাধারণত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে যে সময় লাগে সেই অনুযায়ী বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে নেইমারের খেলার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। মেটাটারসেলে ইনজুরি সাধারণত ভাল হতে প্রায় মাসখানেক সময় লাগে। গত মাসেই নেইমারের জাতীয় দলের সতীর্থ গ্যাব্রিয়েল জেসুস ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলতে গিয়ে মেটাটারসেলের ইনজুরিতে দুই মাস মাঠের বাইরে ছিলেন। ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ডেভিড বেকহ্যাম ও ওয়েন রুনি একই ধরনের ইনজুরিতে পড়ে ছয় সপ্তাহ বিশ্রামে ছিলেন। এখন ব্রাজিলের সমর্থকরাও নেইমারের দ্রুত সুস্থতার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন। বিশেষ করে ইনজুরির কারণে ২০১৪ সালে জার্মানির বিপক্ষে সেমিফাইনালে বিধ্বস্ত হবার ম্যাচটিতে নেইমারের অনুপস্থিতি এখনও ভুলতে পারেননি সেলেসাও সমর্থকরা।
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র সাড়ে তিন মাস বাকি। নেইমারের পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে দুই মাস লেগে গেলে বাকি সময়ে হয়তো ক্লাব দল পিএসজির হয়ে মাঠে নামবেন না তিনি। সেক্ষেত্রে ব্রাজিলের হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচে গা ঝালিয়েই হয়তো হেক্সা মিশনে নামবেন সময়ের অন্যতম সেরা তারকা। অর্থাৎ এখন যে অবস্থা, তাতে হয়তো বিশ্বকাপের আগে আর মাঠে ফিরছেন না নেইমার। তবে এমন অবস্থাতেও মনোবল হারাচ্ছেন না নেইমার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘বাধা আপনাকে থামাতে পারবে না। যদি একটি দেয়ালের সামনে পড়েন, হাল ছাড়বেন না। দেয়ালটা বেয়ে উঠার পথ খুঁজে বের করুন।’ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, নেইমার নাকি এই ইনজুরি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন। সব বাধা পেরিয়ে তিনি নাকি ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুনছেন।
ফুটবলই যে দেশের ধ্যান জ্ঞান, সেখানে বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ আসরে দেশসেরা খেলোয়াড়ের খেলা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলে পুরো দেশই আশাহত হবে, এটাই স্বাভাবিক। রাশিয়া বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নেইমারের ইনজুরি তাই যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ফুটবল পাগল ব্রাজিল। বিশেষ করে চার বছর আগে ঘরের মাঠে বিধ্বস্ত হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা সেলেসাওদের নিয়ে এবার বেশ আশাবাদী সমর্থকরা। নেইমারের ইনজুরি এতটাই পুরো দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে যে সাধারণ জনগণ তো বটেই সংবাদ মাধ্যমেও এটা নিয়ে তুমুল আলোচনার ঝড় বইছে।
স্থানীয় রেডিও ব্যান্ড নিউজ এফএম’এর এক ধারাভাষ্যকার তো বলেই ফেলেছেন, ‘ আমরা আমাদের বিশ্বকাপ হারিয়ে ফেলেছি।’ গুরুতর ইনজুরিতে বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলারের এখন বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ব্রাজিলিয়ানরা প্যারিসের ক্লাবটি নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয়, তাদের পুরো দৃষ্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে। এবার যে রেকর্ড ষষ্ঠবারের শিরোপা ঘরে তোলার মিশনে ব্রাজিল লড়াইয়ে নামতে যাচ্ছে। বাছাইপর্বে প্রথম দল হিসেবে দুর্দান্ত ফর্মে থেকে বিশ্বকাপের টিকেট পাওয়া ব্রাজিলকে নিয়ে অন্যরকম এক উদ্দীপনা কাজ করেছে।
এদিকে ভেঙে যাওয়া ডান পায়ে সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে নেইমারের। বেলো হরিজন্তের ম্যাটের ডেই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলারের। অস্ত্রোপচার করেন ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের চিকিৎসক রডরিগো লাসমার। পিএসজির প্রতিনিধি হিসেবে এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ক্লাবের চিকিৎসক জেরার্ড সালিয়েন্ট।অস্ত্রোপচারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেইমারের পাশে আরও ছিলেন তার মা নাডিন ও বোন রাফায়েলা। রিও ডি জেনিরোয় যে বাসায় নেইমার বিশ্রামে থাকবেন, সেখানে তার ব্যক্তিগত হেলিপ্যাড, জিম, টেনিস কোর্ট, এমনকি একটি জেটিও আছে। অর্থাৎ এখন রিও ডি জেনিরোয় বিলাসবহুল বাড়িতে শুরু হবে নেইমারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। যেখানে ব্রাজিল জাতীয় দলের ফিজিওথেরাপিস্ট রাফায়েল মার্টিনির তত্ত্বাবধানে থাকবেন তিনি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আপাতত ছয় সপ্তাহের আগে কিছুই বলা যাবে না সুস্থ হতে কত সময় লাগবে। তবে বিশ্বকাপের আগে পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী তারা। যে কারণে চলতি মওসুমে ক্লাবের হয়ে আর মাঠে নামা হবে না নেইমারের। পায়ে অস্ত্রোপাচার শেষে চিকিৎসক রডরিগো লাসমার বলেন, সুস্থ হয়ে ওঠাটা নির্ভর করে খেলোয়াড়ের শারীরিক সক্ষমতার ওপর। ছয় সপ্তাহের মধ্যে আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব। তার বিবর্তন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে সুস্থতা ফিরে পাওয়ার সময়। পিএসজির প্রতিনিধিত্বকারী ফরাসী চিকিৎসক জেরার্ড সালিয়েন্ট নেইমারের মাঠে প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে বলেন, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে অনুশীলনে ফিরতে নেইমারের অন্তত ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এই সময় অতিবাহিত হওয়ার আগে আসলে বিস্তারিত তথ্য জানানো কঠিন। সালিয়েন্ট জানান, একঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় লেগেছে নেইমারের পায়ে অস্ত্রোপাচার করতে। এরপর পুরো বিকেলটাই তিনি হাসপাতালের বিছানায় কাটিয়েছেন। সে সময় ট্রয়েসের বিপক্ষে পিএসজির লীগ ওয়ানের ম্যাচটি দেখেছেন টেলিভিশনে।
ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার এখন সবসময়ের জন্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। বার্সিলোনা থেকে পিএসজিতে আসার পর এটি আরও বেড়েছে। এমন খবরও রটেছে, ফরাসী ক্লাব পিএসজি ছেড়ে নেইমার নাকি রিয়াল মাদ্রিদে যেতে পারেন। এমন সময়ে নেইমারকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন রিয়াল কোচ জিনেদিন জিদান। ব্রাাজিলিয়ান সুপারস্টারকে অসাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে আখ্যা দিয়ে জিদান বলেছেন, তাকে সবাই ভালবাসে। সে (নেইমার) এমন একজন খেলোয়াড় যে সবাইকে মাতিয়ে রাখে। পুরো ফুটবল বিশ্বই তার খেলা পছন্দ করে, কারণ সে একজন অসাধারণ খেলোয়াড়। এর বেশি কিছু নয়।
মেসির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে এসেছেন নেইমার। সেখানে গিয়ে এখন পর্যন্ত খুব বেশি সুবিধা করে উঠতে পারেননি। ১৯৯ মিলিয়ন ইউরোর বিশ্বরেকর্ডে প্যারিসে পাড়ি দেয়ার পর খুব বেশি ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি নেইমারের ক্যারিয়ারে। বরং প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনে যাওয়ার পরপরই এডিনসন কাভানির সঙ্গে অন্তর্কোন্দলে জড়িয়ে বেশ সমালোচিত হয়েছেন। এখন আবার যোগ হয়েছে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।
বার্সিলোনার সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গের শাস্তি হিসেবে ১০০ মিলিয়ন ইউরো গুনতে হবে। ২০১৩ সালে বার্সিলোনায় যোগ দেয়ার পর ক্লাবটির সভাপতি জোসেফ মারিয়া বার্টোমেউ নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ১০০ মিলিয়ন ইউরো আয় করবেন। পাশাপাশি চুক্তিতে এটাও উল্লেখ ছিল, যদি তিনি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন তবে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ