বুধবার ০২ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

কে হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধান কোচ

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : আবারো জাতীয় দলের প্রধান কোচ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। সেখানে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে পুরনো নাম রিচার্ড পাইবাস। কারণ এরচেয়ে ভালমানের কোচ খুঁজলেও তা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। একজন ভালমানের কোচের কতটা প্রয়োজন এবার তা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। উড়তে থাকা বাংলাদেশ দল যেন দুই মাসেই নিজেদের মাটিতে নামিয়ে এনেছে। যার শুরুটা হয়েছিল বছরের শুরুর দিকে ত্রিদেশীয় সিরিজে। শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আসওে ফাইনালে খেললেও আরো একবারের মতো হতাম হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। এরপর লংকানদের বিপক্ষে টেষ্ট ও টোয়েন্টি-২০ সিরিজেও পরাজয়ের বেদঁনা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় লাল সবুজ প্রতিনিধিদের। অথচ এই দলটিই ২০১৬ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে তাদের মাটিতেই টেষ্ট ও ওয়ানডে সিরিজ ড্র কে এসেছিল। দেশের মাটিতে পরাশক্তিদের কাতারে নাম লেখানো দলটি এখন একটার পর একটা ম্যাচে পরাজিত হচ্ছে। ২০১৫ সালের পর থেকে যেভাবে প্রতিনিয়ত উন্নতির রাস্তায় ছিল বাংলাদেশ তার যেন কয়েখমাসেই উধাও হয়ে গেছে। যে খেলোয়াড়রা দেশে ও দেশের বাইরে খেলাটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল তারাই মাঠে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এটা যেন অনেকটাই অভিভাবকশূন্য বাংলাদেশের কথা বলছে। একজন কোচের কত বেশি প্রয়োজন তা যেন আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে সর্বশেষ সিরিজেও বাংলাদেশের কোচ ছিলেন চন্দিকা হাথুরুসিংহে। বনিবনা না হওয়ায় সিরিজের মাঝপথেই দেন পদত্যাগের ঘোষনা। সে সময় বিষয়টাতে অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। আবার কোন কোন পক্ষ থেকে তার এই চলে যাওয়াকে সাধুবাদও জানানো হয়েছিল। কিন্তু এটা যে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কতটা ক্ষতির কারণ হতে পারে সেটা বোঝা যায়নি। একজন কড়া ’হেড মাষ্টার’ হিসেবে পরিচিতি ছিলেন এই লংকান। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক বড় বড় অর্জনই তার নামের পাশে ছিল। সেই ক্রিকেট মস্তিস্কে পরিপূর্ণ মানুষটির মতোই আরো একজন কোচ বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশের ক্রিকেটকে সঠিক কক্ষপথে রাখতে যেন এর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু কবে হেড কোচ পাবে বাংলাদেশ, সেই উত্তর জানতে চাইলেও সহসাই তা হচ্ছে না। তবে বিসিবি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই কোচ নিয়োগ দিতে চাইছে। সেটা শ্রীলংকায় নিদাহাস ট্রফির আগে হলে আরো ভাল হয়। গত বছরের অক্টোবর থেকেই কোচ বিহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সম্প্রতি শেষ হওয়া ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট  ও টোয়েন্টি-২০ সিরিজেও তারা মাঠে নেমেছে কোচ ছাড়াই। আর এর ফল হাতেনাতেই পেয়েছে টাইগাররা। তবে এই অচলাবস্থা দ্রুতই কেটে যাবে বলে আশা বিসিবি’র মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান জালাল ইউনূসের। বাংলাদেশ দলের জন্য একজন প্রধান কোচ নিয়োগ দেয়া এখন সবচেয়ে বেশি জরুরী উল্লেখ করে জালাল ইউনুস বলেছেন, ‘জাতীয় দল যে একজন ভালমানের বিদেশী কোচের অভাববোধ করছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যেহেতু হেড কোচ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন আমাদের সবচেয়ে অগ্রাধিকার হল বাংলাদেশ টিমে একজন হেড কোচ অ্যাপয়েন্ট করা।’ হুট করে কোনো কোচকে নিয়োগ দেয়ার পক্ষে নয় বিসিবি। আর সেই কারণেই বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে বোর্ড বলে জানান মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান। তবে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন, ’তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোচ নিয়োগ দিতে চান। সেটা যদি শ্রীলংকার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় টোয়েন্টি-২০ সিরিজের আগে হয় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ দলে এখন একজন ভালমানের কোচের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন’। বিগত তিন বছর রীতিমতো আকাশে উড়ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। বিশেষ করে দেশের মাটিতে সাফল্য যেন নিয়মিতই ধরা দিচ্ছিল। হঠাৎই তাতে পারিবর্তন আসে। দেশের মাটিতে তিন ফরম্যাটেই সিরিজ হারের তেতো অভিজ্ঞতা কয়েক বছর পর হলো বাংলাদেশের। সেই অভিজ্ঞতাটা একটা নাড়া দিয়ে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলকে। এখন যতদ্রুত সম্ভব ঘুরে দাঁড়াতে চায় দল। আর এ লক্ষ্যেই সম্প্রতি প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু এবং টেস্ট ও টোয়েন্টি-২০ অধিনায়ক সাকিব আল হাসানসহ কয়েক জনকে নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সেই বৈঠক শেষে পাপন বললেন, তারা একমত হয়েছেন যে, দ্রুত একজন প্রধান কোচ খুঁজে বের করার বিকল্প নেই। যদিও একটু ধীরেচলো নীতি নিয়ে এ সিরিজ শুরুর আগে প্রধান কোচ নিয়ে একটু বিলম্ব করার কথা বলেছিলেন বোর্ড সভাপতি। শ্রীলংকার বিপক্ষে সিরিজটা শুরুর আগে টিম ম্যানেজমেন্ট ও তিন অধিনায়ক নিয়ে বসেছিলেন বিসিবি বস। ওরা তখন অনুরোধ করেছিল যে এ সিরিজে কোনো কোচের দরকার নেই। ওরা নিজেরাই সবকিছু নিয়ন্ত্রন করতে পারবে। যারা আছে তারাই হ্যান্ডেল করতে পারবে। ওরা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে ওরা আরো ভালো করবে। এটা শুনে সকলের কথা শুনে আগ্রহী হয়ে বিসিবি সিনিয়রদের উপর ভরসা রেখেছিলেন। কিন্তু সেটা কাজে আসেনি। এখন একজন কোচ সবকিছু দ্রুততম সময়ের মধ্যে বদলে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করছেন তারা। জানা গেছে, বাংলাদেশের জন্য যে ধরনের কোচ দরকার তেমন একজনকে নিয়োগ দিতে চাওয়াতেই দেরি হচ্ছে। নিদাহাস ট্রফির আগে ব্যাটিং কোচ হিসেবে মাইকেল বেভান ও নিল ম্যাকেঞ্জি বিবেচনায় আছে। তবে এত কম সময়ের মধ্যে কোনো কোচও হয়ত আনা সম্ভব হবে না। বায়োডাট দেখে, সাক্ষাৎকার নিয়ে তবেই চুড়ান্ত করতে হবে। আর বাংলাদেশে কাজ করার মতো কোচও থাকতে হবে। চন্ডিকা হাথুরুসিংহে চলে যাওয়ার পর অভিভাবকহীন হয়ে পড়া দলটি নতুন কোচ পাচ্ছে না সহসাই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মার্চের প্রথম সপ্তাহে শ্রীলংকায় বসতে যাওয়া ত্রিদেশীয় টোয়েন্টি-২০ টুর্নামেন্ট ‘নিদাহাস ট্রফি’তেও প্রধান কোচ ছাড়াই খেলতে যাবেন সাকিব-তামিমরা! হাথুরুসিংহে চলে যাওয়ার পর রিচার্ড পাইবাস, ফিল সিমন্স ও জিওফ মার্শ বাংলাদেশ দলের কোচ হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। পাইবাস ও সিমন্স এসে বিসিবিতে সাক্ষাৎকারও দিয়ে গেছেন। দুজনের কেউই বিসিবির পছন্দসই ছিলেন না। এই দুজনই আবার নতুন চাকুরীতে যোগদান করেছেন। তাই নতুন কোচ পায়নি টাইগাররা। ফলে প্রধান কোচ ছাড়াই ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলেন সাকিব-মাশরাফিরা। এরপর শ্রীলংকা সিরিজও কেটেছেন কোচশূন্য অবস্থায়! দলে প্রধান কোচ না থাকায় ভুগছে স্বাগতিকরা। তাহলে ত্রিদেশীয় ও শ্রীলংকার বিপক্ষে হোম সিরিজে টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের ছায়ায় হেড কোচের দায়িত্ব সামলানো বিসিবির পরিচালক এবং সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদ সুজনকে কি বিদেশ সফরেও একই ভূমিকায় দেখা যাবে? নয়তো সহকারী কোচ রিচার্ড হেলসেলকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
হাথুরু চলে যাবার পর ভালমানের কোচের প্রত্যাশায় ছিলেন বিসিবি। তারা নাকি ভালো কোচদের কাছাকাছিই পৌঁছাতে পারছেন না! যাকেই তারা টার্গেট করেন, তিনিই নাকি কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান জাস্টিন ল্যাঙ্গারকে খুব করে পেতে চেয়েছিল বিসিবি। কিন্তু তিনি নাকি কথা বলতেই রাজি হননি। বর্তমানে তিনি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া রাজ্য দল ও বিগ ব্যাশের পার্থ স্কোচার্সের কোচ। এজেন্ট মারফত তার কাছে বিসিবি কর্তারা প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলেন, প্রস্তাব শোনা মাত্র নাকি তিনি জানিয়ে দেন, অস্ট্রেলিয়ার বাইরে কাজ করার কোনো ইচ্ছা এ মুহূর্তে তার নেই। জানা গেছে, ২০১৯ বিশ্বকাপের পর ড্যারেন লেহম্যান আর অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের কোচ থাকছেন না। লেহম্যানের পূর্বসূরি হিসেবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নাকি ল্যাঙ্গারকে পছন্দ। সে কারণে তিনি এখন অন্য কোনো জাতীয় দলের দায়িত্ব নিতে চাইছেন না। বিসিবি প্রথম টার্গেট করেছিল ইংল্যান্ডের সাবেক কোচ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারকে। কিন্তু সাবেক এ জিম্বাবুইয়ান পাশ্চাত্য জীবনযাপন ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে রাজি নন। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি এখন ইসিবি’র (ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড) ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর অব এলিট কোচিং’ পদে কাজ করছেন। কাউন্টি দলের কোচদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি ইসিবির একাডেমিও দেখাশোনা করেন তিনি।
অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার না করার পর বিসিবি কোচ চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয় ডিসেম্বরে। তাদের আহ্বানে বেশ ক’জন সাড়া দিয়েছিলেন। এর মধ্যে রিচার্ড পাইবাস ও ফিল সিমন্স ঢাকায় এসে সাক্ষাৎকারও দিয়ে যান। পাইবাস জানুয়ারির শেষ দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের একাডেমির দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। আর সিমন্স ডিসেম্বরেই আফগানিস্তান জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। এ দু’জনের মধ্যে সিমন্সকে ক্রিকেটারদের পছন্দ ছিল। বিসিবির আবার তাকে পছন্দ নয় বলে জানা গিয়েছিল। এখন নতুন কাকে কোচে হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে সেটি হয়তো দ্রুততম সময়ের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট যত দ্রুত একজন বিদেশী কোচকে নিয়োগ দিতে পারবে ততই দলের জন্য মঙ্গলজনক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ